Home সম্পাদকীয়ইরানে যৌথ হামলার কারণ

ইরানে যৌথ হামলার কারণ

Muktochinta Online
০ comments ১২ views

ড. মাহফুজ পারভেজ

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ হামলা কারণকে আপাতত অনেকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। এটি হতে পারে ইরানের শাসনব্যবস্থার ওপর চাপ কিংবা আঞ্চলিক শক্তি নিয়ন্ত্রণের পশ্চিমা কৌশল। উদ্দেশ্য যাই হোক, ঘটনাটি একটি বড় আকারের সংঘাত ও যুদ্ধাবস্থার ইঙ্গিতবাহী। যার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্য, পশ্চিম ও দক্ষিণ এশিয়া ছাড়িয়ে বিশ্বের নানা ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এবারের যৌথ সামরিক হামলা গত আট মাসে দ্বিতীয় সমন্বিত আঘাত। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষায়, এটি “অসমাপ্ত কাজ”-এর ধারাবাহিকতা। ঘোষিত লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং তেহরানের নেতৃত্বের ওপর সর্বাত্মক চাপ প্রয়োগ। কিন্তু এই বক্তব্যের আড়ালে রয়েছে আরও ঝুঁকিপূর্ণ এক উচ্চাকাঙ্ক্ষা—শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনকে উসকে দেওয়া। এটা বিশ্বের দেশে দেশে সরকার বদলের এক সহিংস ও আগ্রাসী হস্তক্ষেপের নিকৃষ্ট দৃষ্টান্তও বটে।

পশ্চিমাদের এই কৌশলগত হিসাব গভীর অনিশ্চয়তায় ভরা। গত দুই বছরে—বিশেষ করে জুনের হামলার পর—ইরানের সামরিক অবকাঠামো ও আঞ্চলিক প্রক্সিগুলো দুর্বল হয়েছে বটে, কিন্তু ইসলামী প্রজাতন্ত্র কতটা টেকসই—সে প্রশ্ন এখনো খোলা। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা বা রাজনৈতিক সদিচ্ছা তেহরানের আছে, তা অস্পষ্ট নয়। তবে একথা নিশ্চিত—এ পর্যায়ে উত্তেজনা বাড়লে তার পরিণতি হবে অনিশ্চিত।

যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নতুন হামলাগুলোকে আগের উদ্যোগের ধারাবাহিকতা হিসেবে তুলে ধরেছেন—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থামানো এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নস্যাৎ করা। আট মিনিটের ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে তিনি আরও এগিয়ে গিয়ে ইরানিদের নিজেদের সরকারের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়ানোর প্রকাশ্য আহ্বান জানান। “এটি বহু বছরের কৌশলগত অস্পষ্টতা থেকে সরে আসা,”—নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই তেহরানে শাসন পরিবর্তনের পক্ষে সওয়াল করে আসছেন, তাঁর দাবি ইরানের ধর্মতান্ত্রিক সরকার আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা জন্ম দেয়। ট্রাম্প এখন সেই লক্ষ্যেই একমত বলে মনে হচ্ছে।

তবে ইতিহাস বলে, বাইরের চাপ দিয়ে ভেতরে ক্ষমতার পালাবদল ঘটানো নিয়ে সংশয়ী হওয়াই যুক্তিযুক্ত। বিদেশি শত্রুদের শাসন পরিবর্তনের দাবি সহজেই “পতাকার চারপাশে ঐক্যবদ্ধ হওয়া” প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, যেখানে অসন্তুষ্ট নাগরিকেরাও শাসনের পক্ষে দাঁড়িয়ে যায়। ইরানি রাষ্ট্রের জটিলতা ও স্থিতিস্থাপকতা অনেক বেশি এবং ইরানের শাসনব্যবস্থা ভীষণ অজনপ্রিয়। স্থবির অর্থনৈতিক নীতি ও ঘরোয়া দুর্নীতিপূর্ণ সিদ্ধান্ত, বিদেশি নিষেধাজ্ঞার চাপ, আর গত বছরের বিক্ষোভকারীদের হত্যাকাণ্ড—সব মিলিয়ে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ ক্ষুব্ধ। অনেকেই এই ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর এবং বহু বছরের ক্ষমতায় থেকে ক্লান্ত এক মতাদর্শ হিসেবে দেখেন।

কিন্তু ভঙ্গুর মানেই ভেঙে পড়ার কাছাকাছি—তা নয়। ইরানি শাসনব্যবস্থা এখনো স্থিতিস্থাপক এবং তাদের হাতে বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), বাসিজ মিলিশিয়া, এবং বিস্তৃত গোয়েন্দা কাঠামো—সবগুলোরই রাষ্ট্র অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থ রয়েছে। এরা কেবল নিরাপত্তা বাহিনী নয়; বর্তমান অবস্থাবস্থায় তাদের নিজস্ব ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক বিনিয়োগও আছে।

অনুমান ভিন্ন হলেও, কিছু বিশেষজ্ঞ বলেন—প্রায় ৩০ শতাংশ ইরানি সরাসরি শাসনব্যবস্থা বা সংশ্লিষ্ট শিল্পে কাজ করেন। সত্য হলো, অন্তত ৩০ শতাংশ মানুষ জীবিকার জন্য শাসনের ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া, শাসন পতন হলে কে ক্ষমতায় আসবে—সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ঐকমত্য নেই। ফলে শাসন পরিবর্তন হলে বহুস্তরীয় শাসন কাঠামোর কারণে ভয়াবহ ক্ষমতার লড়াই শুরু হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আবার এটাও মনে রাখা দরকার যে, ইরানি জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী এবং প্রায়ই অবমূল্যায়িত। অনেক ইরানি তাদের শাসন অপছন্দ করেন; কিন্তু আমেরিকা বা ইসরায়েলের নির্দেশে শাসন পরিবর্তন তাঁরা নাও চাইতে পারেন। ট্রাম্পের এই আহ্বান সহজেই হস্তক্ষেপ হিসেবে ধরা পড়তে পারে এবং কঠোরপন্থীদের ষড়যন্ত্রতত্ত্বকে আরও জোরদার করতে পারে।

এ কারণেই কৌশল হিসেবে শাসন পরিবর্তন কার্যকর হবে না। কেবল বিমান হামলা চালিয়ে কোনো শাসনকে উল্টে দেওয়ার মতো অস্ত্র বা মতাদর্শের সমাবেশ সম্ভব নয়। শাসন পরিবর্তনের জন্য প্রায় সব সময়ই ভেতরের গণমোবিলাইজেশন দরকার হয়—যা বাইরে থেকে পূর্বানুমান বা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

শাসনের ওপর চাপের পাশাপাশি সামরিক লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা। ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে “অনেক নিচে নামিয়ে আনা” হবে—যেসব ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে আঘাত হানতে সক্ষম, এমনকি দীর্ঘপাল্লার ও কথিত অতিধ্বনক ক্ষেপণাস্ত্রও। ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি—যা যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) নামে পরিচিত—ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা প্রক্সি মিলিশিয়াদের অন্তর্ভুক্ত করেনি। সমালোচকেরা এটিকে চুক্তির বড় ত্রুটি বলেছেন। তবে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন অবকাঠামো গুটিয়ে নেওয়া সহজ নয়। ইরান তাদের স্থাপনাগুলো বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে, গোপন ও শক্তপোক্ত করেছে।

পক্ষান্তরে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে—তাদের ওপর হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনা ও মিত্রদের ওপর “চূর্ণবিচূর্ণ” প্রতিশোধ নেওয়া হবে। অতীতে ইরানের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে পরিমিত ছিল। কিন্তু সীমা অতিক্রম করলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। যুদ্ধ দ্রুত শেষ না হয়ে দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

এমতাবস্থায়, জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভালি নাসর লিখেছেন, ইরান “আমেরিকার মনোবল ক্ষয় করতে দীর্ঘ ক্ষয়যুদ্ধকে স্বাগত জানাতে পারে।” দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হতাহতের বোঝা ও অর্থনৈতিক ব্যয় বহনের ইচ্ছাকে কঠিন করে তুলবে। তদুপরি ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, মার্কিন বাহিনীর হতাহত হওয়া তিনি উড়িয়ে দিচ্ছেন না। এর পাশাপাশি, সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে বিভ্রান্ত থাকবে। দ্রুত বিজয় ট্রাম্পের ভাবমূর্তি শক্ত করবে; দীর্ঘ যুদ্ধ তা ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এ ছাড়া, ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার মতো অর্ধেক পদক্ষেপ নিয়ে দুর্বল দেখাতে চান না। আবার আফগানিস্তান বা লিবিয়ার মতো দীর্ঘ জটিলতায়ও জড়াতে চান না। লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে উৎখাতের পর দেশটি বিশৃঙ্খলায় ডুবে যায়—শহর, মিলিশিয়া ও গোত্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে; আজও যুদ্ধবাজরা নিয়ন্ত্রণের জন্য লড়ছে। ওয়াশিংটনে কেউই ইরানকে “আরেকটি বিশাল লিবিয়া” হতে দেখতে চায় না। ইরানের জনসংখ্যা লিবিয়ার দশ গুণ।

ফলে হামলাগুলোতে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসের লক্ষ্য থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি। নতুন হামলায় একই উদ্দেশ্য ছিল কি না, নাকি কিছু অনিশ্চয়তা রেখে দেওয়া হয়েছে—তা স্পষ্ট নয়। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর এখনো নিশ্চিত নয়, আর ইরান দেখাতে চাইছে যে তারা যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম। নেতানিয়াহু আরও চরম পদক্ষেপের পক্ষে থাকলেও, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসলে ওয়াশিংটনের হাতেই। আশঙ্কা রয়েছে—ইরানি শাসনের স্থিতিস্থাপকতা এবং তাদের সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্স ধ্বংস করা কতটা কঠিন—তা তারা পুরোপুরি অনুধাবন নাও করতে পারে।

প্রথম হামলা শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাহরাইন ও কুয়েতে লক্ষ্যবস্তুতে ইরানের আঘাতের খবর দেখায়, পরিস্থিতি কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলো ইতিমধ্যে তাদের নাগরিকদের আশ্রয় নিতে সতর্ক করছে। এ ঘটনা এমন এক নাজুক বৈশ্বিক পরিণতি ডেকে আনতে পারে যা মারাত্মক এক জুয়া। এটি কেবল প্রতীকী কোনো অভিযান নয়। যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল হামলা এক উচ্চঝুঁকির বাজি। ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি দুর্বল করা এক কথা; শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। দুইট পথ বা লক্ষ্য থেকে এটি ভয়াবহভাবে ভুল পথে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বহু বছরের আঞ্চলিক যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, এবং ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সঙ্কটে জড়িয়ে পড়তে পারে। এমনকি বোমাবর্ষণকে তারা সফল বললেও, শাসন টিকে গেলে লিবিয়ার চেয়েও বড় মাত্রার বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে।

কেউ নিশ্চিত নয়, ইরানের সরকার টিকে থাকবে কি না? নাকি তারা পাল্টা লড়াইয়ে নামবে? বর্তমান এই সংঘাত হয়তো এক ক্ষুদ্র খণ্ডযুদ্ধ হিসেবে ইতিহাসে থাকবে—অথবা ২০২০–এর দশকের সবচেয়ে বড় মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি করবে, যার অভিঘাতে কেবল মাধ্যপ্রাচ্যই নয় বিশ্বের এক বিশাল মানচিত্র, যাকে মুসলিম দুনিয়া বলা যায়, সেখানে এক সুদূরপ্রসারী পালাবদলের সূচনা ঘটবে।

লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীকিত বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওন্যাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

You may also like

Leave a Comment