নানা প্রতিবন্ধকতা, অনিশ্চয়তা কাটিয়ে অবশেষে শুরু হয়েছে বাঙালির প্রাণের উৎসব অমর একুশে বইমেলা। প্রতিবছর ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকে মেলা শুরু হলেও এবার দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বিলম্বে মেলা শুরু হলো। কোনো বিরতি না দিয়ে মেলা চলবে ১৫ মার্চ পর্যন্ত। গত বৃহস্পতিবার উদ্বোধানী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিয়মের কিছুটা ব্যত্যয় ঘটলেও বইমেলার আবেদন বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি।
অমর একুশে বইমেলাকে তিনি আমাদের মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের অবিনাশী স্মারক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমরা মনে করি, প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন।
বাঙালি চেতনার অহংকারের নাম একুশ। ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে বাঙালি।এই ইতিহাস বিশ্বে বিরল। বাঙালির স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামের সূচনাও হয়েছে এই চেতনার হাত ধরেই। এই চেতনা ছড়িয়ে দিতে বাংলা একাডেমি প্রতিবছর অমর একুশে বইমেলার আয়োজন করে থাকে। বই কেনাবেচা ছাপিয়ে এই মেলা এখন বাঙালির আবেগে পরিণত হয়েছে।
উদ্বোধনী বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, ‘অমর একুশে বইমেলা কেবল কেনাবেচার মেলা নয়, এটি আমাদের মেধা ও মননের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বায়ান্নর ভাষাশহীদদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে আজকের এই মেলা। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার দেশকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়।’ তবে পরিতাপের বিষয় হলো, আমরা একুশের চেতনা কতটা ধারণ করতে পারছি? সর্বত্র বাংলা ভাষার প্রচলনের কথা শুধু সভা-সেমিনারে বলা হলেও কার্যত সবখানে প্রভাব বেড়েছে ভিনদেশি ভাষার। একই সঙ্গে সমাজে পাঠাভ্যাসের চিত্রও অত্যন্ত হতাশাজনক।
প্রধানমন্ত্রী আক্ষেপ করে বলেন, ‘১০২টি দেশের পাঠাভ্যাস জরিপে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭। আমাদের নাগরিকরা বছরে গড়ে মাত্র তিনটি বই পড়েন।’ বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম বেশির ভাগ সময় ডিজিটাল ডিভাইসে ডুবে থাকে, দিন দিন তারা বই বিমুখ হয়ে পড়ছে। প্রধানমন্ত্রী এই চিত্র পাল্টানোর তাগিদ দিয়েছেন। পাশাপাশি অমর একুশে বইমেলাকে ‘আন্তর্জাতিক বইমেলা’ হিসেবে ভাবার কথাও বাংলা একাডেমিকে নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর এসব বক্তব্য আশা-জাগানিয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নানা সীমাবদ্ধতায় আটকে আছে দেশের প্রকাশনা ব্যবসা। পুস্তক ব্যবসায়ীরা সারা বছর চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকেন এই মেলার দিকে। লেখকরাও অপেক্ষায় থাকেন। এর যেমন ইতিবাচক দিক রয়েছে, তেমনি নেতিবাচক দিকও কম নেই। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো মেলানির্ভর হওয়ায় সারা বছর নতুন বইয়ের দেখা মেলে না। আবার মেলার সময় মানসম্পন্ন বইয়ের পাশাপাশি প্রচুর মানহীন বইও পাঠকের সামনে হাজির করা হয়। এতে ভালো বইয়ের পাঠকের হাত পর্যন্ত পৌঁছার সম্ভাবনা অনেকটা কমে যায়।
এ ছাড়া বইয়ের দাম নিয়েও পাঠকমহলে সব সময় অসন্তোষ দেখা যায়। এবার শুরু থেকেই প্রকাশকরা বলে আসছিলেন, মেলায় কেনাবেচা হবে না। তাই অনেক প্রকাশক মেলায় অংশগ্রহণে অনীহা দেখান। শেষ পর্যন্ত মেলা কর্তৃপক্ষ স্টল বরাদ্দের অর্থ সম্পূর্ণ মওকুফ করার শর্তে তাঁরা মেলায় অংশ নেন। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রকাশকরা এবার পাঠকের জন্য বাড়তি ছাড়ের কথা ভাবতে পারেন।
বইমেলা অনেক বড় আয়োজন। রাজধানীর সর্বস্তরের মানুষ তো বটেই, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও একুশে বইমেলায় যোগ দেন। মেলা ঘিরে লেখক-প্রকাশক-পাঠকদের অনন্য মেলবন্ধন তৈরি হয়। তাই মেলা সফল করতে সংশ্লিষ্ট সব মহলের আন্তরিকতা প্রয়োজন। সমাজে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে ভালো বইয়ের প্রচার বাড়াতে হবে, সচেতন হতে হবে অভিভাবকমহলকেও। প্রকাশনাশিল্পে খরা কাটাতে সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই সমাজে জ্ঞান বিকাশের পথ সুগম হবে।