Home স্বাস্থ্যরমজানে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ

রমজানে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ

Muktochinta Online
০ comments ১১ views

শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পুনর্গঠনের চমৎকার উপায় হতে পারে রোজা রাখা।  তবে রোজা রাখলে আপনা-আপনিই দেহের মেদ ঝরে বাড়তি ওজন কমে যাবে এমন ধারণা ভুল। ঈদের পোশাক কেনার সময় অনেকেই আবিষ্কার করেন, রমজান শেষে দেহের ওজন উল্টো বেড়ে গেছে। বাস্তবতা হলো, শুধু পরিকল্পিত খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমেই রোজা রেখে ওজন কমানোর পাশাপাশি দেহের সব পুষ্টির চাহিদা পূরণ করেও সুস্থ থাকা যায়।

এই পদ্ধতিতে দেহের ওজন যেমন ধীরে ধীরে কমে যাবে, তেমনি রুটিনমাফিক জীবন পরিচালনায় মানসিক স্বাস্থ্যেরও উন্নতি ঘটবে।

রোজায় কেন বাড়ে দেহের ওজন

রোজা রাখলে দিনের দীর্ঘ সময় উপবাস করতে হয়। প্রতিদিন উপবাসের ফলে শরীরের গ্লাইকোজেন ভাণ্ডার কমে যায়। গ্লাইকোজেন ফুরিয়ে এলে শক্তির জন্য দেহের সঞ্চিত চর্বি ব্যবহার শুরু হয়।এভাবেই কমে দেহের ওজন। এই প্রক্রিয়ায় বাদ সাধে ইফতারে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ। ইফতারের প্রচলিত ভাজাপোড়া ও মিষ্টিজাতীয় খাবারগুলো দেহের চর্বি ভেঙে শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়া নষ্ট করে। ইফতারের পরপরই রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হঠাৎ বেড়ে দেহে ইনসুলিনের মাত্রা বাড়ে এবং অতিরিক্ত শক্তি চর্বি হিসেবে জমা হয়।

ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ করবেন যেভাবে

একটি খেজুর খেয়ে ও এক গ্লাস পানি পান করে ইফতার শুরু করুন। ইসবগুলের চিনিবিহীন শরবত অথবা কচি ডাবের পানি পান করা যেতে পারে। উচ্চ আঁশ ও প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার; যেমন—ছোলা, ফলমূল, টক দই বা ডালের স্যুপ খাওয়া যেতে পারে। এতে রক্তে শর্করার ভারসাম্য বজায় থাকবে এবং দ্রুত পেট ভরবে। মুখরোচক ভাজাপোড়া খাবার সপ্তাহে এক দিন খাওয়া যেতে পারে।

ইফতারের দু-তিন ঘণ্টা পর গ্রহণ করুন রাতের খাবার। প্লেটের অর্ধেক নিন সবজি, এক-চতুর্থাংশ রাখুন প্রোটিন (মাছ, মুরগি, ডাল বা ডিম) এবং এক-চতুর্থাংশ রাখুন জটিল শর্করাজাতীয় খাবার (লাল চালের ভাত, আটার রুটি বা ওটস)। এতে দেহের প্রয়োজনীয় ভিটামিন, মিনারেল, প্রোটিন ও ফাইবারের চাহিদা পূরণ হবে এবং অতিরিক্ত ক্যালরিও এড়ানো যাবে।

সারা দিনের শক্তির জন্য সাহরিতে চাই সুষম খাবার। সাহরির সময় শুধু ভাত বা দুধ-কলা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ে, অল্প সময়ের মধ্যে সেটি কমেও যায়।  ফলে সারা দিন দুর্বলতা কাজ করে। সাহরির খাদ্যতালিকায় রাখুন জটিল কার্বোহাইড্রেট (লাল চালের ভাত বা চিড়া, লাল আটার রুটি বা ওটস বা চম্পা কলা), প্রোটিন (ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল, দুধ ও দই), স্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার (ছয় ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখা বিভিন্ন ধরনের বাদাম বা চিয়াবীজ) এবং সবজি রাখুন। এতে দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকবে, দেহের ক্লান্তি কমবে এবং অতিরিক্ত ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

পর্যাপ্ত পানি পান করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইফতার থেকে সাহরি পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ১০ থেকে ১২ গ্লাস পানি পান করুন। চিনি বা কৃত্রিম মিষ্টিযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলুন। এতে দেহের বিপাকক্রিয়া সক্রিয় থাকবে এবং অপ্রয়োজনীয় খাবার গ্রহণের ইচ্ছা কমবে।

শরীরচর্চা

সুস্থ থাকতে শরীরচর্চা অব্যাহত রাখা জরুরি। রমজান মাসে পরিবর্তন হবে শুধু ব্যায়ামের সময়। যাঁদের কোনো শারীরিক জটিলতা নেই, তাঁরা ইফতারের ২৫ থেকে ৩০ মিনিট আগে হাঁটতে পারেন, পাশাপাশি ইফতারের এক ঘণ্টা পর ৩০ মিনিট ব্যায়াম করা যেতে পারে। এরপর আদায় করবেন তারাবির নামাজ। সে সময়ও কিছু ক্যালরি পুড়বে। একইভাবে ভোরে সাহরি গ্রহণের এক ঘণ্টা আগে ৫০ থেকে ৬০ মিনিট ব্যায়াম করা যাবে। শারীরিক জটিলতা এড়াতে রোজা রেখে অভুক্ত অবস্থায় ব্যায়াম করবেন না। এতে দেহে পানিশূন্যতা ও হঠাৎ করে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নেমে যেতে পারে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য

ওজন কমাতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন। পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ করলে দেহের পেশি সংরক্ষিত হবে এবং মেটাবলিজম সচল থাকবে। রোজায় যদি শুধু কার্বোহাইড্রেটজাতীয় খাবার গ্রহণ করা হয়, তাহলে পেশি ক্ষয় হতে পারে এবং ওজন কমলেও তা স্বাস্থ্যকর হয় না। তাই প্রতি বেলায় খাবারের তালিকায় প্রোটিন রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন। নিয়মিত ঘুমানোও জরুরি। ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে অপর্যাপ্ত ঘুম।  মনে রাখতে হবে, রমজানে লক্ষ্য হওয়া উচিত দেহে ‘স্মার্ট ক্যালরি ডেফিসিট’ তৈরি করা। অর্থাৎ দেহে প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগান দিয়ে সামান্য ক্যালরি ঘাটতি রাখা। এতে প্রতি সপ্তাহে ধীরে ধীরে ওজন কমবে, শরীর দুর্বল হবে না। যাঁদের ক্লিনিক্যাল ওবিসিটি, অতিরিক্ত ওজনসহ অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ রয়েছে, তাঁরা অবশ্যই অভিজ্ঞ পুষ্টিবিদের পরামর্শে খাবার তালিকা মেনে চলবেন। মনে রাখতে হবে, সবার পুষ্টি চাহিদা ্এক নয়।

রমজান আমাদের শেখায় সংযম। যদি খাদ্য নির্বাচন ও পরিমাণে সংযম প্রয়োগ করা যায়, তাহলে রমজানই হতে পারে সুস্থভাবে ওজন কমানোর আদর্শ সময়। সঠিক পরিকল্পনায় রোজা শুধু আত্মার পরিশুদ্ধিই নয়, শরীরের ভারসাম্যও ফিরিয়ে আনতে পারে।

লেখক : সিনিয়র ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ান

বাংলাদেশ সাইকিয়াট্রিক কেয়ার ক্লিনিক

ও বায়োজিন কসমেসিউটিক্যালস

You may also like

Leave a Comment