Home সম্পাদকীয়সরকারের তিন অগ্রাধিকার

সরকারের তিন অগ্রাধিকার

Muktochinta Online
০ comments ১০ views

ড. মাহফুজ পারভেজ

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় একটি নতুন সরকারের সূচনালগ্নে অর্থনীতি, ভূ-রাজনীতি ও আইনশৃঙ্খলা-এ তিনটি ক্ষেত্রকে আলাদা করে দেখার সুযোগ খুবই সীমিত। কারণ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা, কৌশলগত অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার ওপর। আর উন্নয়ন অর্থনীতির আলোচনায় বলা হয়, টেকসই অগ্রগতি তখনই সম্ভব, যখন প্রবৃদ্ধি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর থাকে এবং শাসনব্যবস্থা জবাবদিহিমূলক হয়। এ তাত্ত্বিক কাঠামোকে সামনে রেখে বাংলাদেশের নবতর প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, নতুন সরকারের দায়িত্ব কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং কাঠামোগত রূপান্তরেরও। এসব চ্যালেঞ্জ শুরুতেই মোকাবিলা না করা হলে ভবিষ্যতে নানারূপ সমস্যা ও সংকটের কারণ হতে পারে। বিশেষত, একটি ক্রান্তিকালীন পরিস্থিতি পেরিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে সাফল্য ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে এসব চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নতুন সরকারের সামনে নেই বললেই চলে।

তিনটি ক্ষেত্রের মধ্যে সবচেয়ে আগে ও সবিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আসে অর্থনীতি প্রসঙ্গ। অর্থনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নানা সংকট ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। দারিদ্র্য হ্রাস, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের সম্প্রসারণ-সব মিলিয়ে দেশটি একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির উদাহরণ হিসাবে প্রশংসিত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক অস্থিরতা, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের সংকট ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে, যা সামাজিক অসন্তোষের জন্ম দেওয়ার অন্যতম পূর্বশর্ত। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হলে আমদানি ব্যাহত হয়, শিল্প উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়ে। রপ্তানিতে তৈরি পোশাক খাতের অতিনির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে; বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে গেলে তার সরাসরি অভিঘাত পড়ে জাতীয় আয়ে।

সুতরাং নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, একদিকে ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণ করা। করব্যবস্থায় সংস্কার, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন-এসব পদক্ষেপ ছাড়া কাঠামোগত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

ভূ-রাজনীতির প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি এমন এক ভূখণ্ডে অবস্থিত, যা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একদিকে রয়েছে ভারত, যার সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর; অন্যদিকে রয়েছে চীন, যা অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও কৌশলগত সহযোগিতার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার করছে। এ দুই শক্তির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপের মতো আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যকার আন্তঃসংযোগ ও সম্পর্কও বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী তত্ত্ব বলছে, ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোকে বড় শক্তির প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে ভারসাম্য কৌশল অবলম্বন করতে হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই কোনো এক পক্ষের প্রতি অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়া নয়, বরং বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গা সংকট, যেখানে মিয়ানমার থেকে আগত বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে; কিন্তু এর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপ দীর্ঘমেয়াদে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা নতুন সরকারের জন্য অপরিহার্য।

আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি কেবল অপরাধ দমন নয়, বরং রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ‘আইনের শাসন’ ধারণা অনুযায়ী, রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান আইনের অধীন থাকবে এবং নাগরিকরা সমানভাবে ন্যায়বিচার পাবে-এ নিশ্চয়তা না থাকলে উন্নয়ন টেকসই হয় না। রাজনৈতিক মেরুকরণ, সহিংসতা, সাইবার অপরাধ এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা-এসব সমস্যা সমাজে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। যখন মানুষ ন্যায়বিচার পায় না বা আইন প্রয়োগে বৈষম্য অনুভব করে, তখন রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে যায়। বিনিয়োগকারীরাও স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ খোঁজে; তাই আইনশৃঙ্খলার অবনতি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে। নতুন সরকারের জন্য তাই চ্যালেঞ্জ হলো, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পেশাদারত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও দক্ষতা বাড়ানো এবং মানবাধিকার রক্ষায় সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়া। প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও ডিজিটাল অপরাধ মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধিও নবগঠিত সরকারের সামনে একটি বাস্তব অগ্রাধিকার।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো-এ তিন ক্ষেত্রকে আলাদা ইস্যু হিসাবে না দেখে একটি সমন্বিত কাঠামোর অংশ হিসাবে দেখা জরুরি। অর্থনৈতিক সংকট সামাজিক অস্থিরতা বাড়ায়, যা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায়; আবার রাজনৈতিক অস্থিরতা বা কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই নতুন সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে কতটা সমন্বিত কৌশলে তারা অর্থনৈতিক সংস্কার, কৌশলগত কূটনীতি ও সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে তার ওপর। জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া, নীতি প্রণয়নে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা-এসবের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জকে সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব।

অতএব, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অর্থনীতি, ভূ-রাজনীতি ও আইনশৃঙ্খলা-এ তিন ক্ষেত্রের ভারসাম্যপূর্ণ ও বিচক্ষণ ব্যবস্থাপনাই রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও অগ্রযাত্রার প্রধান শর্ত। নতুন সরকারের জন্য এটি কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; বরং একটি ঐতিহাসিক দায়, যার সফল বাস্তবায়ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথ নির্ধারণ করবে ও নতুন সরকারের সফলতার বুনিয়াদ তৈরি করবে।

তাই উপসংহারে বলা যায়, গণতান্ত্রিক রূপান্তর কেবল ক্ষমতার হাতবদল নয়; এটি রাষ্ট্রচিন্তা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর এক মৌলিক পুনর্গঠন। নির্বাচন আয়োজন বা সরকার পরিবর্তন গণতন্ত্রের দৃশ্যমান অংশ হলেও এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে-রাষ্ট্র কতটা কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক কাঠামো নির্মাণ করতে পারছে তার ওপর। প্রয়োজনীয় শাসনতান্ত্রিক সংস্কার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্র বাহ্যিকভাবে টিকে থাকলেও ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন নীতিনির্ধারণে অনিশ্চয়তা, প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনআস্থার সংকট এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ সুশাসনের ভিত নড়িয়ে দেয়।

বিভিন্ন সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখায়-প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীনতা একে অপরকে শক্তিশালী করে অবক্ষয়ের চক্র তৈরি করে। যখন অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকে না, তখন সামাজিক অসন্তোষ বাড়ে; যখন আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গুর হয়, তখন বিনিয়োগ ও উন্নয়ন ব্যাহত হয়; আর যখন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আস্থা কমে যায়, তখন গণতন্ত্রের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ফলে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সফলতা নির্ভর করে এ তিন স্তম্ভকে একসঙ্গে সুসংহত করার ওপর।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মানে শুধু প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি নয়-বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা। ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারসাম্যপূর্ণ ও বিচক্ষণ কূটনীতি অপরিহার্য, যাতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মধ্যে থেকেও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে। পাশাপাশি কার্যকর ও নিরপেক্ষ আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা নাগরিক আস্থা, মানবাধিকার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত। এ তিন ক্ষেত্র পরস্পর সম্পর্কযুক্ত-একটির দুর্বলতা, অন্য দুটিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

নতুন সরকারের দায়িত্ব তাই কেবল নীতিনির্ধারণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাষ্ট্রীয় আস্থা পুনর্গঠন, প্রতিষ্ঠানগুলোকে পেশাদার ও স্বাধীন করে তোলা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ এবং সামাজিক সংহতি জোরদার করা। এটি একটি ঐতিহাসিক দায়-কারণ, এ সময়ের সিদ্ধান্ত ও সংস্কার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং নাগরিক স্বাধীনতার পরিধি নির্ধারণ করবে।

অতএব, গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে সফল করতে হলে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রগঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। সুশাসন, ন্যায় ও ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলা গেলে এ রূপান্তর কেবল একটি রাজনৈতিক অধ্যায় হয়ে থাকবে না; বরং তা জাতির টেকসই উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও মর্যাদাপূর্ণ অগ্রযাত্রার স্থায়ী ভিত্তি হিসাবে ইতিহাসে চিহ্নিত হবে।

প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ : চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)

You may also like

Leave a Comment