শীত যাই যাই করছে। তবুও এই হালকা শীতে সকালের ঘুম ভেঙে অফিসে যেতে সবার মতো সজীবেরও প্যারা লাগে। তার ওপর লোকাল বাসে যাওয়া আরেক প্যারা।
এমনিতেই সজীব মোটা, এমন মোটা মানুষের পক্ষে লোকাল বাসে উঠে কোথাও যাওয়া খুব বিব্রতকর। কোনোমতে বাসে উঠতে পারলেও বসতে গেলে তাকে তার স্বাস্থ্যের জন্য পাশের মানুষটি মুখটা বেকিয়ে রাখে। যদি ভাগ্য অধিক খারাপ থাকে আর দাঁড়িয়ে যেতে হয়; তখন একেকটা মানুষ বাসের চিপা দিয়ে তাকে পার হয়ে যায়। তখন বাজে মন্তব্য করে।
সদ্য নতুন চাকরি হওয়ার ফলে এখন সজীব পারে রিকশা দিয়ে অফিসে যেতে। কিন্তু সে তার ভাগ্যকে একটা সুযোগ দিতে চায়। এত বিরক্তির মাঝে কি সেই সুযোগ?
তখন সজীব ভার্সিটির শেষ সেমিস্টারে। এরপরই ইন্টার্নশিপ। তখন টাকা-পয়সার অভাবে বাধ্য হয়ে লোকাল বাসে চড়তে হয়।
তখনো সপ্তাহের ব্যস্ততম সকালে অনেক ঠেলাঠেলি করে একটা লোকাল বাসে উঠেছে। উঠেই পেছনে চলে যাচ্ছে যেন কম ঠেলাঠেলি হয়।
পেছনে যেতে দেখে বামপাশের সিটে এক ‘অবাক করা সুন্দরী’ বসা। তার পাশের সিটটিও খালি। কিন্তু তখনই সজীব নিজের ইমোশনে কন্ট্রোল টেনে নিলো। সে বসলে আরও চাপাচাপি হবে। উল্টো মেয়ে মানুষ; কী থেকে কী হয়? তাই ভেবে দাঁড়িয়ে রইলো।
‘আপনি চাইলে বসতে পারেন।’ মেয়েটি বলে উঠলো।
সজীবও বসে পড়লো কিন্তু তাদের মাঝে প্রায় অনেক ফাঁক। সজীবের মোটা শরীর প্রায় পুরোটাই বাইরে।
‘আরেকটু এদিকে চেপে আসুন, নয়তো পড়ে যাবেন।’
‘আসলে মোটা মানুষ তো, আপনার সমস্যা হতে পারে।’
‘সমস্যা নেই।’ মেয়েটি হালকা হাসলো-
সেদিন থেকে শুরু। এরপর থেকে প্রায় দেখা হতো বাসে। কখনোবা পাশে বসার সুযোগ হতো। কখনো দূরে দাঁড়িয়ে হালকা হাসি বিনিময় অথবা কখনো তার পাশে সিট খালি হলে দূর থেকে ‘এই যে শুনছেন’ বলে সজীবকে পাশে বসাতো। সম্পর্কটা বন্ধুত্বে রূপ নিলো, যখন দেখলো মেয়েটি নিজেই দুই সিটের ভাড়া দিয়ে তারপর সজীবকে বসালো। সেদিন জানতে পারলো, মেয়েটির নাম রুপা, পড়ছে সাংবাদিকতার শেষবর্ষে।
এমন করে চলছিল বেশ। হঠাৎ একদিন রুপা গায়েব। এক সপ্তাহ ধরে বাসে আসছে না। কী কারণে যে রুপার ফোন নাম্বার নিলো না, তা ভাবতেই আফসোস হচ্ছে। তারপর শুরু হলো বিকেলের শিফটে সজীবের পরীক্ষা। এরপর ঢুকে গেল ইন্টার্নশিপে। তাও অন্য জায়গায়। তবুও এখনো মনে পড়ে রুপাকে। তাই তো গ্রাজুয়েশন শেষ করে যখন একই রাস্তায় অফিসে যাওয়ার সুযোগ পেলো; তখন রিকশায় যাওয়ার বদলে লোকাল বাসে যায়। যদি একটিবার রুপার সাথে দেখা হয়। নিজের ভাগ্যকে আরেকটা সুযোগ দিতে চায়।
আজও কষ্ট করে তিনটা বাসে ওঠার চেষ্টা করে পারেনি সজীব। পরের বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। তখন দেখলো একটি স্কুটি তার সামনে এসে দাঁড়ালো। স্কুটি থামিয়ে হেলমেট খুলে মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল, ‘উঠুন আপনাকে পৌঁছে দিই।’
সজীব রুপাকে সামনে দেখে যেন আকাশ থেকে পড়লো। মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্কুটির পেছনের সিটে বসলো। বসেই বলল সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত কথা, ‘কিছু মনে না করলে আপনার মোবাইল নাম্বারটা দেবেন?’
রুপাও বলে ফেললো, ‘আরেকবার হারালে আমার নখ দিয়ে গুঁতো দিয়ে ভুঁড়ি ফাটিয়ে ফেলবো।’
‘আরে কী সাংঘাতিক!’ সজীব হেসে উত্তর দিলো।
‘সাংঘাতিক না সাংবাদিক। সাংবাদিক রুপার স্কুটিতে এখন থেকে রোজ ভ্রমণ আপনার জন্য বাধ্যতামূলক করা হলো।’
‘জো হুকুম ম্যাডাম।’
দু’চাকার বাহনে চড়ে দুটি শরীর শহরের কোলাহলপূর্ণ বাতাস ভেদ করে সামনে এগিয়ে চলছে। তাদের মনে চলছে দারুণ প্রশান্তির বাতাস।