অবাধ যোগাযোগ নিশ্চিতের লক্ষ্যে ৩৪ বছর আগে চালু হয়েছিল ওয়ার্ল্ডওয়াইড ওয়েব তথা ইন্টারনেট। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ কাজেও ব্যবহৃত হয়েছে এটি, ফলে বিভিন্ন দেশের সরকার ইন্টারনেটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর হতে বাধ্য হয়েছে। ২০২৩ থেকে ইন্টারনেট ব্যবহারে সরকারী হস্তক্ষেপের হার বাড়তে শুরু করে। নানাবিধ অজুহাতে ইন্টারনেট বন্ধ রেখেছে অনেক দেশের সরকার।
বাংলাদেশ ও ইরানেও ইন্টারনেটসেবা বন্ধ রাখার ঘটনা ঘটেছে। তবে শাটডাউনের মতো চরমপন্থা সব দেশের সরকার গ্রহণ করে না। আড়িপাতা, ব্যবহারকারীদের তথ্য সংগ্রহ ও শর্তারোপের মতো পলিসি গ্রহণের মাধ্যমে করা হয় বেশির ভাগ সেন্সরশিপ। বিগত বছরগুলোতে এমন অদৃশ্য সেন্সরশিপের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
অদৃশ্য সেন্সরশিপ কী?
আজকের ইন্টারনেট বলা যায় পুরোটাই অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানের পলিসি দ্বারা পরিচালিত। মেটা, এক্স, গুগল, মাইক্রোসফট, রেডিট ও অ্যামাজনের কনটেন্ট পলিসি এবং অ্যালগরিদম ইন্টারনেট ট্রাফিকের বেশির ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। এটাকেই অনেকে বলছে অদৃশ্য সেন্সরশিপ।
শুরুতে ইন্টারনেট ছিল পুরোপুরি বিকেন্দ্রীভূত।
নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে ২০০৭-০৮ সাল পর্যন্ত নিজস্ব ওয়েবসাইট তৈরি করার চল ছিল। যোগাযোগের জন্য ইন্টারনেট রিলে চ্যাট আর মতামত প্রকাশের জন্য বিভিন্ন ফোরামের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। এ ধরনের সেবা ব্যবহার বা ওয়েবসাইট তৈরির জন্য পরিচয় যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা ছিল না। এতে গোপনীয়তা বজায় থাকার পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের মতামত প্রকাশেও ছিল না কোনো বাধা। এর ফলে দ্রুতই ইন্টারনেটে প্রতারণা ও উগ্রবাদ প্রচারের উত্থান শুরু হয়।
সময়ের সঙ্গে নিজস্ব ওয়েবসাইট ও ব্লগের বদলে ব্যবহারকারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রোফাইল তৈরি শুরু করে, ফোরামের বদলে আলাপ-আলোচনার স্থানও হয়ে ওঠে ফেসবুক বা তৎকালীন টুইটার। নিজের সাইটের বদলে ইউটিউব বা টিকটকে এখন সবাই ভিডিও আপলোড করছে। গণমাধ্যমগুলোও আজ বেছে নিচ্ছে এসব প্ল্যাটফর্ম। অর্থাৎ, ইন্টারনেটের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে অল্প কিছু সংস্থার পলিসি এবং সে অনুযায়ী সাজানো অ্যালগরিদম। এ ছাড়াও সরকারি পর্যায়ে ডিএনএস ব্লকিং, জাতীয় পর্যায়ে ফায়ারওয়াল প্রয়োগ, আইপি ব্ল্যাকলিস্টিং এবং ব্যবহারকারীদের তথ্য বিশ্লেষণের জন্য ডিপ প্যাকেট ইন্সপেকশন সিস্টেম ব্যবহার করে বেশ কিছু দেশ।
এ ধরনের নিয়ন্ত্রণকে অদৃশ্য সেন্সরশিপ বলা হয়। এটিকে ঢালাওভাবে মন্দ বলা বা সমালোচনা করা অনুচিত। অবৈধ কর্মকাণ্ড, উসকানিমূলক কনটেন্ট প্রচার, ভুয়া সংবাদ অপপ্রচার ঠেকানো অত্যন্ত জরুরি। শিশু-কিশোরদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে অবশ্যই কনটেন্ট মডারেশন প্রয়োজন।
প্রশ্নবিদ্ধ আইনি কাঠামো
বিগত দুই বছরে সেন্সরশিপের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে মানবাধিকার কর্মীরা চিন্তিত। বিশ্বের ১৬টিরও বেশি দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে বয়স যাচাইয়ের সরকারি বাধ্যবাধকতা নিয়ে তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন। সরকারি পরিচয়পত্র ছাড়া ওয়েবসেবা ব্যবহার করা যাবে না এমন আইন খোদ যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যে পাস হয়েছে। যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার সরকারও এ ধরনের আইন প্রয়োগের আলোচনা করছে। বয়স যাচাই করে ওয়েবসেবা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার পলিসির ফলে অপব্যবহার কমবে, অপ্রাপ্তবয়স্কদের মানসিক স্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব পড়বে না। প্রতারকচক্র ও অন্যান্য সাইবার অপরাধ থেকেও তারা নিরাপদ থাকবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট, যুক্তরাজ্যের অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রের কিডস অনলাইন সেফটি অ্যাক্টের ফলে এসব দেশে ব্যবহারকারীদের পরিচয়পত্র যাচাই করতে বাধ্য হচ্ছে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম। জনপ্রিয় ফোরাম ও যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম ‘ডিসকর্ড’ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ব্যবহারকারীদের পরিচয় যাচাইয়ে ফেস স্ক্যানের মতো গোপনীয় বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করার।
ব্যবহারকারীদের পরিচয়, বায়োমেট্রিক তথ্য ও প্ল্যাটফর্মগুলোতে তারা কী করছে, সেসব তথ্য এভাবে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। আইনগতভাবে ওয়ারেন্ট ছাড়া নাগরিকদের ওপর এমন নজরদারি কোনো প্রতিষ্ঠান করতে পারে না।
ইন্টারনেটের দুনিয়ায় কোনো রাজনৈতিক সীমারেখা নেই। ইউরোপে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানের সেবা বাংলাদেশে বসে ব্যবহার করা সম্ভব। কিন্তু ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন। অর্থাৎ অন্যান্য দেশের নাগরিকদেরও তথ্য এভাবে সংগ্রহ করছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
এআইয়ের প্রভাব
জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মগুলো এখন আপত্তিকর কনটেন্ট শনাক্ত করছে এআইয়ের মাধ্যমে। এতে বেড়েছে ভুল শনাক্তের হার। গণহারে ভুয়া রিপোর্ট দাখিল করে এআই মডারেটরকে সহজেই ফাঁকি দেওয়া যায়। তাই ভুয়া প্রোফাইল ব্যবহার করে বা রিপোর্ট করার ক্যাম্পেইন চালিয়ে অসাধুচক্ররা রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল বন্ধ করে দেওয়া বা কনটেন্ট ব্যান করে থাকে। ভুল শনাক্তের ক্ষেত্রে অনেক সময় আপিল করেও লাভ হয় না।
সংকীর্ণ ইন্টারনেট
অ্যালগরিদমের মারপ্যাঁচ, এআই মডারেশন এবং কঠোর আইনের ফলে অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীরা এখন মূলধারার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। ম্যাস্টোডন, ব্লু স্কাই, সাবস্ট্যাক বা ফ্লোটপ্লেনের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে ঝুকঁছেন তারা। সংখ্যালঘু মতাদর্শের কনটেন্ট ক্রিয়েটররা সরে যাওয়ায় মূলধারার প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদমে পক্ষপাতিত্ব সৃষ্টি হয়েছে। অনেক ব্যবহারকারী রেডিট বা এক্সে প্রতিনিয়ত পোস্ট করছে ‘ইন্টারনেট আগের মতো নেই’। ঘুরেফিরে একই ধরনের বিষয়বস্তুর কনটেন্ট সবখানে পোস্ট হচ্ছে, বিতর্কিত মতাদর্শ প্রকাশের স্থান কমে আসছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ইন্টারনেট আর সর্বজনীন নেই।