মানবজীবনের সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে পারস্পরিক ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং একে অপরের কল্যাণ কামনার মধ্যে। আর ইসলাম সমাজের প্রতিটি মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার শিক্ষা দেয়। তাই একজন প্রকৃত মুমিন কখনোই স্বার্থপর হতে পারে না। সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে, অন্যের জন্যও তা কামনা করে—এটাই তার ঈমানের পরিচয়।
কেননা অন্যের কল্যাণ কামনা করা শুধু একটি নৈতিক গুণ নয়, বরং এটি ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১০) তাই একজন মুমিন অন্য মুমিনের কল্যাণে কাজ করবে, তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হলে তা দূর করার চেষ্টা করবে। এটাই প্রকৃত ভ্রাতৃত্বের দাবি।
নবীরা শুধুমাত্র হিদায়াতের দাওয়াত দিয়েছেন তা নয়। বরং তারা পুরো জাতির কল্যাণ কামনা করেছেন এবং সদুপদেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘(আমি তোমাদের প্রতিপালকের পয়গাম পৌঁছাই এবং) তোমাদের সদুপদেশ দিই।
(সুরা : আরাফ, আয়াত : ৬২) অন্য আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা হুদ (আ.) এর কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমি তোমাদের হিতাকাঙ্ক্ষী, বিশ্বস্ত।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৬৮)
এখানে নবীদের দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে—তারা মানুষের কল্যাণ কামনা করে আন্তরিকভাবে উপদেশ দিতেন। এটি আমাদের জন্যও অনুসরণীয় আদর্শ।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, দীন আসলে আন্তরিকতা ও কল্যাণ কামনার নাম। একজন মুমিনের অন্তরে অন্যের জন্য শুভকামনা না থাকলে তার ঈমান পূর্ণতা পায় না।
মহানবী (সা.) বলেন, ‘দ্বীন হলো কল্যাণ কামনা করার নাম।’ আমরা (সাহাবারা) বললাম, কার জন্য? তিনি বললেন, ‘আল্লাহ, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসুল এবং মুসলমানদের শাসক ও সাধারণ জনগণের জন্য।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ১৯৬) এই হাদিস প্রমাণ করে যে, কল্যাণ কামনা করা শুধু একটি গুণ নয়; বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কল্যাণ কামনা থাকা জরুরি।
সাহাবায়ে কেরাম (রা.) রাসুল (সা.)-এর কাছে যেসব প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতেন, তার মধ্যেও অন্যের কল্যাণ কামনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। জারির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুল (সা.)-এর কাছে সালাত কায়েম করা, জাকাত দেওয়া এবং সকল মুসলিমের জন্য কল্যাণ কামনা করার ওপর বাইআত গ্রহণ করেছি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৫৭) এ থেকে বোঝা যায়, অন্যের কল্যাণ কামনা করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়; বরং এটি ইসলামের মৌলিক আমলের অংশ।
একজন মুমিনের ঈমানের পূর্ণতা নির্ভর করে তার অন্তরের অবস্থার ওপর। সে নিজের জন্য যা চায়, অন্যের জন্যও তা চাওয়ার মানসিকতা থাকা জরুরি। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তা তার ভাইয়ের জন্য পছন্দ করবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১৩)
এসব আয়াত ও হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, অন্যের কল্যাণ কামনা করা একজন মুমিনের অনন্য বৈশিষ্ট্য এবং ঈমানের অপরিহার্য অংশ। এটি শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কাজ, আচরণ এবং অন্তরের আন্তরিকতায় প্রকাশ পায়। অতএব, আমাদের উচিত প্রতিনিয়ত নিজেদের মধ্যে এই গুণটি লালন করা—অন্যের জন্য ভালো চাওয়া, তাদের উপকারে এগিয়ে আসা এবং আন্তরিকভাবে নাসিহা প্রদান করা। কারণ, এ গুণ একজন মানুষকে প্রকৃত মুমিন হতে সাহায্য করে।