ইসলামে ইলম বা জ্ঞান অর্জনকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় সমুন্নত করবেন। আর তোমরা যা করো আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত।’ (সুরা : মুজাদালা, আয়াত : ১১)
এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায় যে মহান আল্লাহর দরবারে জ্ঞানের আলাদা মর্যাদা রয়েছে।
কোনো ব্যক্তির মধ্যে ঈমানের পাশাপাশি দ্বিনি জ্ঞান থাকলে সে অন্য মুমিনদের ওপর মর্যাদাপ্রাপ্ত হয়। এটা আমার কথা নয়, এটা মহান আল্লাহর কথা। পবিত্র কোরআনের অন্য একটি আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলো, যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান? বিবেকবান লোকরাই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৯)
জ্ঞান হলো আলো, যা হৃদয়কে আলোকিত করে।
আর মহান আল্লাহ দ্বিনি জ্ঞানার্জনের সৌভাগ্য তাদেরই দেন, তিনি যাদের কল্যাণ চান। মুয়াবিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বিনের জ্ঞান দান করেন। আল্লাহই দানকারী আর আমি বণ্টনকারী। এ উম্মত সর্বদা তাদের প্রতিপক্ষের ওপর বিজয়ী থাকবে, আল্লাহর আদেশ আসা পর্যন্ত আর তারা বিজয়ী থাকবে। (বুখারি, হাদিস : ৩১১৬)
দ্বিনি জ্ঞান মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। ইবাদতের স্পৃহা জাগ্রত করে। কুফর, শিরক ও বিদআতের মরীচিকা থেকে সতর্ক হতে সাহায্য করে। তাই তো মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে জ্ঞান বৃদ্ধির দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সুতরাং আল্লাহ মহান, যিনি সত্যিকার অধিপতি; তোমার প্রতি ওহি সম্পূর্ণ হওয়ার পূর্বে তুমি কোরআন পাঠে তাড়াহুড়া কোরো না এবং তুমি বল, হে আমার রব, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন। (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ১১৪)
তা ছাড়া দ্বিনের মৌলিক জ্ঞান অর্জন করাও প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ। আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে একটি হাদিসে এসেছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ। অপাত্রে জ্ঞান দানকারী শূকরের গলায় মণিমুক্তা ও সোনার হার পরানো ব্যক্তির সমতুল্য (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২২৪)
তাই দোয়ার পাশাপাশি নিজেকে ইসলামের মৌলিক জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত রাখাও মুমিনের দায়িত্ব। জ্ঞানার্জনের পথে হাঁটলে মহান আল্লাহর রহমত পাওয়া যায়। মহান আল্লাহ জ্ঞানার্জনের পথে অগ্রসর হওয়া ব্যক্তির জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২২৫)
জ্ঞানে বরকত অর্জনের শর্ত
ক. ইখলাস বা আল্লাহর সন্তুষ্টি : জ্ঞান শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে। লৌকিকতা বা খ্যাতির উদ্দেশে ইলম অর্জন করলে তা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হয়। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, এক ব্যক্তি ইলম শিক্ষা করেছে, লোকদের শিক্ষা দান করেছে এবং কোরআন পাঠ করেছে। তাকে আনা হবে, তাকে তার নিয়ামতগুলো স্মরণ করাবেন, সে তা স্বীকার করবে। তাকে বলা হবে, এর জন্য তুমি কী আমল করেছ? সে বলবে, আমি ইলম শিক্ষা করেছি, অন্যকেও শিক্ষা দিয়েছি, আর তোমার সন্তুষ্টির জন্য কোরআন পাঠ করেছি। তিনি (আল্লাহ তাআলা) বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ; বরং তুমি ইলম শিক্ষা করেছিলে এ জন্য যেন তোমাকে আলিম বলা হয়। আর কোরআন পাঠ করেছিলে, যেন তোমাকে কারি বলা হয়; তা বলা হয়েছে। এরপর তার সম্বন্ধে আদেশ করা হবে, আর তাকে মুখের ওপর হেঁচড়িয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (নাসায়ি, হাদিস : ৩১৩৭)
খ. আমল বা অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগ : ইলম অনুযায়ী আমল না করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এ জন্য মহানবী (সা.) উপকারী নয় এমন জ্ঞান থেকে আশ্রয় চাইতেন। (নাসায়ি, হাদিস : ৫৪৭০)
কারণ যারা ইলম অনুযায়ী আমল করে না, কিয়ামতের দিন তাদের কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে। (বুখারি, হাদিস : ৩২৬৭)
গ. প্রচার ও প্রসার : ইলম বা জ্ঞানের সবচেয়ে বরকতপূর্ণ দিক হলো কেউ যদি তা ইখলাসের নিয়তে প্রচার করে, তাহলে অন্ততকাল এর সওয়াব অব্যাহত থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সাত ব্যক্তির কাছে মৃত্যুর পরে কবরে তাদের আমলের সওয়াব চালু রাখা হয়। তারা হচ্ছে, (১) যে ব্যক্তি ইলম শিক্ষা দেয়, (২) অথবা নহর খনন করে, (৩) অথবা কূপ খনন করে, (৪) অথবা ফলদার (খেজুরগাছ) বৃক্ষ রোপণ করে, (৫) অথবা মসজিদ তৈরি করে, (৬) অথবা বই-পুস্তক রেখে যায়, (৭) অথবা এমন সন্তান রেখে যায় যে তার মৃত্যুর পর তার জন্য মাগফিরাত কামনা করে। (আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, হাদিস : ১১৪)
অতএব, কেউ যদি ইখলাসের সঙ্গে ইলম অর্জন করে, সে অনুযায়ী নিজেও আমল করে এবং তা প্রচার-প্রসার করে সেও অনন্তকাল এর সওয়াব পেতে থাকবে ইনশাআল্লাহ। একইভাবে কেউ যদি ইলমের প্রচার-প্রসারে সহযোগী হয়, সে-ও এর সওয়াব অনন্তকাল পেতে থাকবে ইনশাআল্লাহ।