ইসলাম পূর্বযুগে একজন বাদশাহ ছিল। তার ছিল এক জাদুকর। সে শেষবয়সে উপনীত হলে বাদশাহকে বলল, আমি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়েছি, আপনি আমার কাছে একজন বালককে পাঠান, যাকে আমি আমার জাদুবিদ্যা শিখিয়ে যাব। তার কথামতো জাদুবিদ্যা শিক্ষা দেওয়ার জন্য বাদশাহ তার কাছে একজন ছেলে পাঠায়।
তখন বালক ওই জাদুকরের কাছে আসা-যাওয়া শুরু করে। প্রতিদিন আসা-যাওয়ার পথে বালকের একজন পাদ্রীর সাথে দেখা হতো। বালকও ওই পাদ্রীর কাছে বসত এবং তার কথায় সে মুগ্ধ হতো। এভাবে সে প্রায়ই পাদ্রীর কাছে যেত এবং কথাবার্তা শুনত।
এদিকে এ কারণে বাদশাহের জাদুকর প্রতিদিনই তাকে প্রহার করত। এ বিষয়ে বালক পাদ্রীর কাছে নালিশ দিলে পাদরি বলল, জাদুকর যদি তোমার সাথে ঝামেলা করে, তাহলে তুমি তাকে বলবে যে, বাড়ি থেকে দেরি করে আসতে বলেছে। আর যদি তুমি তোমার বাড়ির ব্যাপারে আশঙ্কা করো, তাহলে বলবে, জাদুকর আমাকে দেরি করে ছুটি দিয়েছে।
এভাবেই চলতে থাকে।
একদিন বালক দেখতে পায় যে, রাস্তায় মানুষের চলার মাঝে বিশাল এক হিংস্র প্রাণী বসে আছে। সেটা মানুষের চলাচলের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থা দেখে বালক মনে মনে বলতে লাগল, আজকে জানতে পারব যে, জাদুকর সত্য নাকি পাদ্রী? তখন সে একটি পাথর হাতে নিয়ে বলতে লাগল, হে আল্লাহ, যদি জাদুকরের ধর্মের চেয়ে পাদ্রীর ধর্ম বেশি পছন্দনীয় হয়, তাহলে এর মাধ্যমে এই হিংস্র প্রাণীটাকে শেষ করে দিন, যাতে লোকজন চলাচল করতে পারে। এই বলে একটি পাথর নিক্ষেপ করে। বালকের পাথর নিক্ষেপের কারণে ওই হিংস্র প্রাণীটি মারা যায়।
লোকজনও আবার চলাচল শুরু করে। এরপর সে পাদ্রীর কাছে এসে ব্যাপারটি খুলে বললে পাদ্রী বলে, বৎস, আজ থেকে তুমি আমার থেকেও শ্রেষ্ঠ। তুমি অনেক উপরে পৌঁছে গেছো, যা আমি দেখতে পাচ্ছি। অচিরেই তোমাকে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে, তখন কিন্তু আমার কথা বলা যাবে না।
তারপর বালক আল্লাহর আদেশে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে সুস্থ করতে লাগল। বিভিন্ন লোকদের বিভিন্ন রোগ ভালো করতে লাগল। সে সময় বাদশাহর মন্ত্রীদের একজন অন্ধ হয়ে যায়। তখন সে অনেক হাদিয়া-উপহার নিয়ে বালকের কাছে এসে বলল, আমাকে তুমি সুস্থ করতে পারলে, এই সব সম্পদ তোমার হয়ে যাবে। বালক বলল, আমি তো কাউকে সুস্থ করতে পারি না, আল্লাহ তার বান্দাদের সুস্থ করেন। তুমি যদি আল্লাহর ওপর ঈমান আনো, তবে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করব, আল্লাহ তোমাকে সুস্থ করবেন। তখন ওই মন্ত্রী আল্লাহর ওপর ঈমান আনলে আল্লাহ তাকে সুস্থ করে দেন। মন্ত্রীসাহেব সুস্থ হয়ে অন্যান্য দিনের মতো বাদশাহের দরবারে উপস্হিত হয়। বাদশাহ মন্ত্রীকে দেখে বলে, কে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে দিল? সে বলল, আমার রব আল্লাহ। এ কথা শুনে বাদশাহ বলল, আমি ছাড়া কি তোমার কোনো রব-প্রভু আছে? সে বলল, তিনি তো আমার ও আপনার সবারই রব। বাদশাহ তাকে বন্দি করে শাস্তি দিলে মন্ত্রী বালকের কথা বলে দেয়।
বাদশাহের কাছে ওই বালককে উপস্থিত করা হলে বাদশাহ তাকে বলে, হে প্রিয় বৎস! তোমার জাদু এ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, তুমি অন্ধ ও কুষ্ঠরোগীকেও সুস্থ করতে পারো। বালক বলল, আল্লাহ সুস্থ করেন, আমি তো কাউকে সুস্থ করতে পারি না। বাদশাহ রেগে বালককে কঠোর শাস্তি দেয়। তখন বালকও ওই পাদ্রীর কথা বলে দেয়। পাদ্রীকে ধরে আনা হয়। তাকে বলা হয়, তুমি তোমার দ্বীন থেকে ফিরে এসো। সে অস্বীকার করলে তার মাথা নিচে রেখে কেটে টুকরো করে ফেলা হয়। তারপর বালকটিকে ধরে এনে বলা হয়, তুমি তোমার দ্বীন থেকে ফিরে এসো। সে-ও অস্বীকার করে। তখন জালিম বাদশাহ তার কিছু চ্যালাদের হাতে তাকে দিয়ে বলে, তোমরা তাকে অমুক পাহাড়ে নিয়ে যাবে, সেখানে তোমরা সবাই আরোহণ করবে। এরপরে তাকে তার ধর্ম থেকে ফিরে যেতে বলবে, যদি ফিরে আসে, তাহলে তো ভালো। অন্যথায় পাহাড়ের চূড়া থেকে তাকে নিচে ফেলে দেবে। তারা তাকে নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠল। বালক তখন আল্লাহর কাছে দোয়া করল, হে আল্লাহ, যেভাবে চান তাদের থেকে আপনি আমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। সাথে-সাথে পাহাড় কম্পন করতে লাগল। তারা পাহাড় থেকে ছিটকে পড়ল। আর বালক হেঁটে হেঁটে বাদশাহর কাছে চলে এলো। এটা দেখে বাদশাহ তাকে প্রশ্ন করল, তোমার সাথিরা কোথায়? সে বলল, আল্লাহ আমাকে তাদের চক্রান্ত থেকে রক্ষা করেছেন।
এবার বাদশাহ বালককে আবার কিছু লোকদের হাতে দিয়ে বলল, তোমরা তাকে নিয়ে নৌকায় চড়ে মাঝসমুদ্রে নিয়ে যাবে। তারপর সে যদি তার দ্বীন (ধর্ম) থেকে ফিরে আসে তবে ভালো। অন্যথায় তোমরা তাকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দিয়ে আসবে। তারা তাকে সমুদ্রে নিয়ে গেলে বালক আল্লাহর কাছে দোয়া করে বলল, হে আল্লাহ! যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে আমাকে এই চক্রান্ত থেকে রক্ষা করুন। সাথে-সাথে নৌকাটি তাদের-সহ উলটে গেল। ফলে তারা সকলেই পানিতে ডুবে গেল। আর বালক হেঁটে হেঁটে বাদশাহর কাছে চলে এলো। এটা দেখে বাদশাহ তাকে আবার প্রশ্ন করল, তোমার সাথিরা কোথায়? সে বলল, আল্লাহ আমাকে তাদের চক্রান্ত থেকে রক্ষা করেছেন।
এবার বালক ওই জালিম বাদশাহকে বলল, আমার কথা তুমি না শুনলে আমাকে কখনও হত্যা করতে সক্ষম হবে না। বাদশাহ বলল, সেটা আবার কী? বালক বলল, একটি বিশাল ময়দানে সবাইকে একত্রিত করো। তোমরা আমাকে একটি কাঠের শূলে চড়িয়ে আমার তীরদানি থেকে একটি তীর নিয়ে ধনুকের মধ্যে রেখে যদি বলো, ‘এই বালকের রবের নামে নিক্ষেপ করলাম’, তাহলে তোমরা আমাকে হত্যা করতে সক্ষম হবে।
বাদশাহ তার কথামতো একটি বিশাল মাঠে সব লোকদের সমবেত করে। বালককে কাঠের শূলে চড়ানো হয় এবং একটি তির নিয়ে ধনুকের মধ্যে রেখে ‘এই বালকের প্রভুর নামে’ বলে নিক্ষেপ করে। তীর বালকের কানের এক অংশে গিয়ে লাগে। তখন বালক তীর লাগার স্থানে হাত রাখলে সে মারা যায়। এ দৃশ্য দেখে রাজ্যের লোকজন বলে উঠে, আমরা এ বালকের রবের ওপর ঈমান আনলাম। আমরা এ বালকের প্রভুর ওপর ঈমান আনলাম। আমরা এ বালকের আল্লাহর উপর ঈমান আনলাম।
এ খবর বাদশাহকে জানানো হয়, আপনি বিষয়টা খেয়াল করেছেন! যে ভয় আপনি করেছিলেন, তা-ই হয়েছে। লোকেরা বালকের রবের ওপর ঈমান এনেছে। এটা শুনে বাদশাহ তখন সব রাস্তার মাথায় গর্ত খনন করার আদেশ দেয়। বাদশার কথা মত গর্ত খনন করা হয় এবং আগুনও জ্বালানো হয়। এরপরে বাদশাহ আদেশ জারি করে ‘যে ব্যক্তি বালকের ধর্ম ত্যাগ না করবে, সে এই আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে। কিংবা তাকে বলবে, সে যেন আগুনে ঝাপ দেয়। তখন ঈমানদার লোকেরা বাধ্য হয়ে আগুনে ঝাঁপ দিতে শুরু করে। কিন্তু একজন মহিলা আগুনে ঝাঁপ দিতে ভয় করছিল। এটা দেখে দুধের শিশু তাকে (মাকে) বলল, হে আম্মাজান! সবর করুন, আপনি তো সত্য দ্বীনের (ধর্মের) ওপর প্রতিষ্ঠিত আছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৭৫১১, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ২৩৯৩১)