Home স্বাস্থ্যগর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের রোজা

গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের রোজা

গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের প্রয়োজন বাড়তি পুষ্টি ও পানি। তাই কিছু ক্ষেত্রে রোজা রাখা তাঁদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীদের রোজা পালনে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। এ নিয়ে লিখেছেন ডা. নাশফিয়া তাহসিন খান

Muktochinta Online
০ comments ১০ views

চলছে পবিত্র মাহে রমজান। এই মাসে বয়ঃপ্রাপ্ত প্রত্যেক মুসলমানের জন্য রোজা ফরজ। গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রে রোজা পালনে রয়েছে কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি। তবে এ সময়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করলে রোজা রাখতে কোনো সমস্যা হবে না।

প্রতিটি মায়ের প্রধান কর্তব্য নিজের ও সন্তানের সঠিক যত্ন নেওয়া এবং সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। গর্ভাবস্থায় যদি কোনো স্বাস্থ্যগত জটিলতা সৃষ্টি না হয়, স্তন্যদানকারী মা যদি
সুস্থ থাকেন এবং মা ও শিশুর যদি কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি না হয়, তবে অবশ্যই তাঁরা নিশ্চিন্তে রোজা রাখতে পারবেন। তবে মনে রাখা জরুরি, রোজা রাখতে হলে অবশ্যই পর্যাপ্ত সাহরি ও ইফতারি গ্রহণ করতে হবে। রোজার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করাও জরুরি।

ঝুঁকিতে রয়েছেন যাঁরা

রোজা পালনের ফলে যদি মা অথবা শিশুর স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কা থাকে, সে ক্ষেত্রে এ বিষয়ে ইসলামি বিধানে ছাড় রয়েছে। যেসব মায়ের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তশূন্যতা, পুষ্টিহীনতা, বমি, মাথা ঘোরা, পানিশূন্যতা, রক্তপাত, ফ্লুইড ডিসচার্জ অথবা প্রস্রাবের ইনফেকশনের মতো সমস্যা রয়েছে—চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে তাঁদের রোজা পালন করা উচিত নয়। এ ছাড়াও যেসব কারণে রোজা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে—

►  গর্ভের শিশু নড়াচড়া না করলে বা কমিয়ে দিলে।

►  শিশু পর্যাপ্ত দুধ না পেলে

►  শিশুর কোনো প্রকার শারীরিক জটিলতা বা পুষ্টির অভাব থাকলে।

►  মায়ের গর্ভের অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের পরিমাণ কম থাকলে।

►  স্তন্যপানকারী শিশুর ওজন কম থাকলে।

এসব ক্ষেত্রে মায়ের রোজা না রাখাই উত্তম। এতে রয়েছে স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা

কখন বুঝবেন রোজা ভঙ্গ করতে হবে

যে ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত রোজা ভঙ্গ করা মা ও শিশুর জন্য উত্তম—

►  মাথা ঘোরানো বা ঝিমুনি দেখা দিলে।

►  হঠাৎ অতিরিক্ত দুর্বল বোধ করলে।

►  চোখে হঠাৎ অন্ধকার বা ঝাপসা দেখলে।

►  কোনো কারণে রক্তপাত হলে।

►  গর্ভের পানি ভেঙে গেলে।

►  গর্ভে শিশুর নড়াচড়া কমে গেলে।

►  যদি ডায়াবেটিস থাকে, সে ক্ষেত্রে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে গেলে অথবা হাইপোগ্লাইসেমিয়া দেখা দিলে।

►  রক্তচাপ হঠাৎ বেড়ে গেলে।

►  প্রেসার কমে গেলে/হাইপোটেনশন হলে।

►  বমি হলে।

যা খাবেন

রোজায় মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টিকর ও সুষম খাবার খাওয়া জরুরি—

►  ভাত, রুটি, ওটস, মাছ, মুরগি, ডিম, ডাল, শাক-সবজি ও ফলমূল।

►  পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি (দু-তিন লিটার) ও তরল খাবার।

►  ইফতারসামগ্রী : খেজুর, ডাবের পানি, ঘরের শরবত, সালাদ, বাদাম, স্যুপ, কাস্টার্ড ইত্যাদি।

►  বেশি ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত ঝাল মসলাযুক্ত খাবার পরিহার করতে হবে। বেশি চা ও কফি খাওয়া যাবে না।

►  গর্ভবতী মা আনারস, কামরাঙা ও পেঁপে খাওয়া পরিহার করবেন।

স্তন্যদানকারী মায়েদের প্রয়োজন বুকের দুধ বাড়াতে সাহায্য করে এমন খাবার গ্রহণ করা। যেমন—

►  খেজুর, কলা, লাউ, কালিজিরা, দই, মিষ্টিকুমড়া ও ডিম খেতে হবে।

►  আয়রন, ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ প্রোটিনজাতীয় খাবার গ্রহণ জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে লালশাক, পালংশাক, লাল মাংস, দুধ, দই ও পনির।

পানি পানে গুরুত্ব

বিশেষত স্তন্যদানকারী মায়েদের প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত দু-তিন লিটার পানি পান করতে হবে ইফতারের পর থেকে সাহরির সময় পর্যন্ত। এতে মায়ের ইউরিনারি ইনফেকশন ও পানিশূন্যতার আশঙ্কা কমবে। কোনোভাবেই সাহরি করা বাদ দেওয়া যাবে না। ইফতারে ক্যাফেইনযুক্ত উত্তেজক পানীয় বাদ দিতে হবে।

জরুরি ওষুধ গ্রহণ

চিকিৎসকের পরামর্শে যদি কোনো স্তন্যদানকারী মা ও গর্ভবতী নারীর ইনহেলার, অক্সিজেন ও নাকের ড্রপ গ্রহণ করতে হয়, তবে রোজা ভাঙবে না। কিন্তু নাকের ড্রপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, যাতে ওষুধ গলা বা মুখে না পৌঁছে। যদি মুখে ওষুধ পৌঁছে, সে ক্ষেত্রে তা ফেলে দিতে হবে।

যদি কোনো স্বাস্থ্যগত জটিলতার চিকিৎসায় জরুরি ভিত্তিতে ওষুধ গ্রহণের পরামর্শ দেন চিকিৎসক, সেটি অবহেলা করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, প্রয়োজনে কাজা রোজা পালন করা যাবে, কিন্তু শিশু বা মায়ের স্থায়ী ক্ষতি অপূরণীয়।

বিশ্রাম

গর্ভবতী মা ও স্তন্যদানকারী মা পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশ্রাম নেবেন। এতে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যগত জটিলতার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা কমবে। রোজা রেখে কোনো অবস্থায় কায়িক পরিশ্রম করা যাবে না। দিনের কিছু সময় ঘুমাতে হবে এবং রাত জাগা পরিহার করতে হবে যতটা সম্ভব।

বিশেষ দ্রষ্টব্য

জন্মের পর থেকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধু বুকের দুধ পান করাতে হবে। সন্তান যাতে পর্যাপ্ত দুধ পায়, সেটি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। দুগ্ধদানে সমস্যা হলে রোজা না রাখাই উত্তম এবং পরবর্তী সময়ে কাজা রোজা আদায় করা যেতে পারে। রোজা রাখার জন্য অনেকে বুকের দুধের বদলে সম্পূরক শিশু খাদ্য খাওয়ান, শিশুর ছয় মাস বয়সের আগে যা কোনোভাবেই করা যাবে না।

লেখক : কনসালট্যান্ট

সেবা ডায়াগনস্টিক সেন্টার

You may also like

Leave a Comment