Home ধর্মপরিশুদ্ধ অন্তর লাভের চারটি কার্যকর উপায়

পরিশুদ্ধ অন্তর লাভের চারটি কার্যকর উপায়

Muktochinta Online
০ comments views

মানুষের জীবনের সবচেয়ে সূক্ষ্ম অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অন্তর। বাহ্যিক আচরণ, কথা ও কর্ম—সবকিছুর নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র এই হৃদয় বা ক্বালব। তাই ইসলামে আত্মশুদ্ধির মূল আলোচনাও আবর্তিত হয় অন্তর বা ক্বালবকে ঘিরে। কোরআনুল কারীমে ঘোষণা করা হয়েছে, “সেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো উপকারে আসবে না; কেবল সে-ই সফল হবে, যে আল্লাহর কাছে আসবে পরিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে। (সুরা শু‘আরা, আয়াত : ৮৮-৮৯)।

এই পরিশুদ্ধ অন্তর কিভাবে গড়ে ওঠে; তা নিয়ে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-ফাওয়ায়িদ-এ গভীর ও হৃদয়স্পর্শী কিছু উপমা দিয়েছেন।

প্রথমত, তিনি বলেন, অন্তরও অসুস্থ হয়, যেমন দেহ অসুস্থ হয়; আর এর আরোগ্য হলো তাওবা ও আত্মসংযমে। গুনাহ মানুষের হৃদয়ে অন্ধকার সৃষ্টি করে।রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “বান্দা যখন একটি গুনাহ করে, তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। সে যদি তাওবা করে, তা মুছে যায়; আর যদি বাড়াতে থাকে, দাগও বাড়তে থাকে।” (তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৩৪)। ইবনুল কাইয়্যিম ব্যাখ্যা করেন, গুনাহে অভ্যস্ত অন্তর ধীরে ধীরে অসাড় হয়ে যায়; তাই দ্রুত তাওবা ও নফসকে নিয়ন্ত্রণ করাই এর চিকিৎসা (আল-ফাওয়ায়িদ, ১/১৪৩)।

দ্বিতীয়ত, তিনি বলেন, অন্তরে মরিচা পড়ে, যেমন আয়নায় মরিচা পড়ে; আর তা ঝকঝকে হয় আল্লাহর যিকরে। কুরআনে এসেছে, “বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়েছে।” (সুরা আল-মুতাফফিফিন, আয়াত : ১৪)। আল্লাহর স্মরণ হৃদয়কে জীবন্ত রাখে। পবিত্র কোরআনের ভাষায়, “জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে। (সুরা আর-রা‘দ, আয়াত : ২৮)।

ইমাম ইবন কাসির (রহ.) এ আয়াতের তাফসিরে বলেন, সত্যিকারের প্রশান্তি ও স্থিরতা আসে আল্লাহর যিকর ও তাঁর প্রতি আস্থার মাধ্যমে। যিকর হৃদয়ের আয়নাকে স্বচ্ছ করে, যাতে হিদায়াতের আলো স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়।

তৃতীয়ত, ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, অন্তর উলঙ্গ হয়ে যায়, যেমন দেহ উলঙ্গ হয়; আর এর সৌন্দর্য হলো তাকওয়া। বাহ্যিক পোশাক মানুষকে আড়াল করে, কিন্তু অন্তরের পোশাক হলো আল্লাহভীতি। কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, “আর তাকওয়ার পোশাক—এটাই শ্রেষ্ঠ।” (সুরা আল-আ‘রাফ, আয়াত : ২৬)। ইমাম কুরতুবী (রহ.) লিখেছেন, এই ‘লিবাসুত তাকওয়া’ হলো অন্তরের এমন গুণ, যা মানুষকে পাপ থেকে রক্ষা করে এবং মর্যাদা দান করে। বাহ্যিক চাকচিক্য নয়; তাকওয়াই অন্তরকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে।

চতুর্থত, তিনি বলেন, অন্তর ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত হয়, যেমন দেহ হয়; আর এর খাদ্য-পানীয় হলো আল্লাহকে জানা (মা‘রিফাত), তাঁর প্রতি ভালোবাসা (মহব্বত), তাঁর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল), তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন (ইনাবা) এবং তাঁর ইবাদতে নিবেদিত থাকা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, “যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহকে সর্বাধিক ভালোবাসে।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৬৫)। আবার তিনি বলেন, “আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তাঁর জন্য তিনিই যথেষ্ট।” (সুরা আত-তালাক, আয়াত : ৩)। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম তাঁর অন্য গ্রন্থ মাদারিজুস সালিকিন-এ উল্লেখ করেন, হৃদয়ের প্রকৃত জীবন হলো আল্লাহর পরিচয় ও প্রেমে নিবিষ্ট থাকা; এ ছাড়া অন্তর অপূর্ণ ও অশান্ত থাকে। (আল-ফাওয়ায়িদ ১/১৪৩)

এই চারটি উপমা আমাদের শেখায় যে, হৃদয়ের যত্ন নেওয়া ঈমানের অপরিহার্য অংশ। আমরা শরীরের অসুখে চিকিৎসা করি, আয়না ময়লা হলে পরিষ্কার করি, ক্ষুধা-তৃষ্ণা পেলে খাবার খুঁজি; কিন্তু অন্তরের অসুখ, মরিচা ও ক্ষুধার কথা কতটা ভাবি? অথচ কিয়ামতের দিনে আল্লাহর কাছে মূল্যায়িত হবে এই অন্তরই।

আজকের ব্যস্ত ও বিভ্রান্ত সময়ের প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রয়োজন নিয়মিত আত্মসমালোচনা, আন্তরিক তাওবা, যিকরের চর্চা ও তাকওয়ার অনুশীলন। অন্তরকে জীবন্ত রাখতে হলে তাকে তার প্রকৃত খাদ্য দিতে হবে। 

আসুন, আমরা অন্তরের দিকে ফিরে তাকাই। দেহের যত্ন যেমন নিই, তার চেয়ে বেশি যত্ন নিই হৃদয়ের। হয়তো এই ছোট্ট সচেতনতাই আমাদের জীবনের দিক পাল্টে দিতে পারে। আর অন্তরকে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে।

মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে সহিহ বুঝ ও আমল করার তাওফিক দান করুন। 

লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

You may also like

Leave a Comment