Home সম্পাদকীয়পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক এতো বৈরী কেন

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক এতো বৈরী কেন

Muktochinta Online
০ comments views

সাঈদ বারী

দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সীমান্ত উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি হামলা, জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগ এবং শরণার্থী ইস্যু আবারও এই প্রশ্নকে সামনে এনেছে যে কেন এই দুই দেশের সম্পর্ক এত বৈরী? বিষয়টি কেবল সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান বা কোনো একক ঘটনার ফল নয়; বরং ইতিহাস, ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা সংশয়, জাতিগত পরিচয় ও আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতার সমন্বয়ে দীর্ঘদিনের এক জটিল বাস্তবতা।
এই বৈরিতার সবচেয়ে গভীর শিকড় রয়েছে সীমান্ত প্রশ্নে। ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন যে সীমারেখা টেনে দেয়, সেটিই পরে পরিচিত হয় ডুরান্ড লাইন নামে। এই রেখা পশতুন অধ্যুষিত অঞ্চলকে বিভক্ত করে, যার একটি অংশ বর্তমান পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত। আফগানিস্তানের অনেক শাসক ও রাজনৈতিক শক্তি ঐতিহাসিকভাবে এই সীমান্তকে বৈধ বলে মানতে চাননি। তাদের যুক্তি, এটি ছিল ঔপনিবেশিক আরোপিত এক রাজনৈতিক সীমারেখা, যা জাতিগত বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে আঁকা হয়েছিল। অন্যদিকে পাকিস্তান রাষ্ট্র তার ভৌগোলিক অখ-তার প্রশ্নে এই সীমান্তকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বলে মনে করে। ফলে সীমান্ত প্রশ্নটি দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী অবিশ্বাসের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমান্তে বেড়া নির্মাণ, সেনা মোতায়েন, সীমান্ত পারাপারে কড়াকড়ি- এসব পদক্ষেপ প্রায়ই উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয় এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যেও পারস্পরিক বিরূপ মনোভাব তৈরি করে।

নিরাপত্তা ও জঙ্গিবাদ সম্পর্কিত অভিযোগও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বিষাক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগান ভূখ-ে অবস্থান করে পাকিস্তানবিরোধী জঙ্গি সংগঠনগুলো হামলা চালায়। বিশেষ করে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে ইসলামাবাদের উদ্বেগ বহুবার প্রকাশ পেয়েছে। পাকিস্তান মনে করে, এই গোষ্ঠীর সদস্যরা সীমান্তের ওপারে নিরাপদ আশ্রয় পায় এবং সেখান থেকে হামলার পরিকল্পনা করে। অপরদিকে আফগানিস্তানের অভিযোগ, পাকিস্তান প্রায়ই সীমান্ত লঙ্ঘন করে সামরিক অভিযান চালায়, যা তার সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ কূটনৈতিক আস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করেছে এবং দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী সন্দেহের পরিবেশ তৈরি করেছে।

এখানে তালেবান প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। আফগানিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তালেবান একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে। অতীতে তালেবানকে নিয়ে পাকিস্তানের নীতিকে অনেকেই কৌশলগত গভীরতা অর্জনের প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদল এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই কৌশল নিজেই পাকিস্তানের জন্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তালেবান নেতৃত্বাধীন আফগান শাসনব্যবস্থা নিজেদের স্বায়ত্তশাসন জোরালোভাবে তুলে ধরতে চায়, আর পাকিস্তান প্রত্যাশা করে যে তারা সীমান্তবর্তী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে। এই প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক থেকেই দ্বন্দ্ব তীব্রতর হয়েছে।

জাতিগত রাজনীতিও এই বৈরিতার আরেকটি গভীর স্তর। আফগানিস্তান নিজেকে ঐতিহাসিকভাবে পশতুনদের মাতৃভূমি হিসেবে দেখেছে, আর পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলেও উল্লেখযোগ্য পশতুন জনগোষ্ঠী বসবাস করে। ‘পশতুনিস্তান’ ধারণা বা জাতিগত স্বায়ত্তশাসনের দাবি অতীতে বহুবার রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে এসেছে, যা পাকিস্তানের কাছে সংবেদনশীল ইস্যু। ইসলামাবাদ আশঙ্কা করে, এই ধরনের দাবি তার অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে আফগানিস্তানের ভেতরে জাতিগত প্রশ্ন যত জোরালো হয়, পাকিস্তানের নিরাপত্তা উদ্বেগও তত বাড়ে। এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব রাজনৈতিক বিরোধকে আরও তীব্র করে তোলে।

শরণার্থী ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কে মানবিক ও কূটনৈতিক জটিলতা বাড়িয়েছে। সোভিয়েত আগ্রাসনের সময় থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সংঘাত- বিভিন্ন পর্যায়ে লাখো আফগান নাগরিক পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে তারা সেখানে বসবাস করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের ফেরত পাঠানোর নীতি দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। পাকিস্তান মনে করে, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে শরণার্থী প্রত্যাবাসন জরুরি; অন্যদিকে আফগানিস্তান এটিকে মানবিক সংকট হিসেবে তুলে ধরে। ফলে শরণার্থী প্রশ্নটি শুধু সামাজিক সমস্যা নয়, বরং কূটনৈতিক সম্পর্কেরও একটি সংবেদনশীল উপাদান হয়ে উঠেছে।

ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও এই বৈরিতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে আঞ্চলিক শক্তির কৌশলগত স্বার্থ- সবকিছুই পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে। সোভিয়েত আগ্রাসনের সময় পাকিস্তান মুজাহিদিনদের সমর্থন দেয়, যা পরে আফগান রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। একইভাবে, বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি ও নীতিও এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়। আন্তর্জাতিক শক্তির এই সম্পৃক্ততা দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ককে কখনো সহযোগিতামূলক, কখনো আবার প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে। ফলে দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলো প্রায়ই বৃহত্তর আঞ্চলিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

অবিশ্বাসের আরেকটি কারণ হলো, কূটনৈতিক যোগাযোগের ভঙ্গুরতা। দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ হলেও তা প্রায়ই সামরিক উত্তেজনা বা সীমান্ত সংঘর্ষের কারণে ভেঙে পড়ে। আস্থাহীনতার এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে উঠেছে। কারণ প্রতিটি ঘটনা অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়। ফলে একটি সীমান্ত সংঘর্ষও দ্রুত বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকটে রূপ নেয়। মিডিয়া ও রাজনৈতিক বক্তব্য অনেক সময় পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে, যা সমঝোতার সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্ভাবনা থাকলেও রাজনৈতিক বৈরিতা তা বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করেছে। আফগানিস্তান ভৌগোলিকভাবে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগস্থল; অন্যদিকে পাকিস্তান সমুদ্রবন্দর ও বাণিজ্যিক রুটের মাধ্যমে আঞ্চলিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা থাকলে বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন ও আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সন্দেহ ও নিরাপত্তা উদ্বেগ এই সম্ভাবনাকে সীমিত করে রেখেছে। ফলে অর্থনৈতিক লাভের পরিবর্তে নিরাপত্তা ব্যয় ও সংঘাতের ঝুঁকিই সম্পর্কের প্রধান নির্ধারক হয়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখিয়েছে, এই বৈরিতা কেবল অতীতের উত্তরাধিকার নয়; বরং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। সীমান্তে গোলাগুলি, জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে অভিযোগ, শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন৭সব মিলিয়ে সম্পর্ক আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এই উত্তেজনা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে তা কেবল দুই দেশের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ এই দুই রাষ্ট্রের পারস্পরিক সংঘাত সহজেই দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে সক্ষম।

লেখকঃ প্রকাশক ও কলাম লেখক।

You may also like

Leave a Comment