Home সম্পাদকীয়মধ্যপ্রাচ্য ও তৃতীয় বিশ্বকে আরো শত বছরের জন্য পদানত রাখার যুদ্ধ

মধ্যপ্রাচ্য ও তৃতীয় বিশ্বকে আরো শত বছরের জন্য পদানত রাখার যুদ্ধ

Muktochinta Online
০ comments views

জামালউদ্দিন বারী

ইরান বা পারস্য সভ্যতার বয়স প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর। এ সময়ে বিশ্ব সভ্যতায় নানা রকম উত্থান পতনের ঘটনা ঘটলেও পারস্য সভ্যতা কখনো কোনো পরাশক্তির দ্বারা পদানত হয়নি, কিংবা পারসিকরা অন্য কোনো দেশে সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে দখল করে নেয়ার ইতিহাস নেই। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে এবং আধুনিক বিশ্বের সভ্য হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস তিনশ বছরের বেশি নয়। মূলত আফ্রিকা থেকে ইউরোপীয়দের মানব পাচার ও দাস ব্যবসার উপর ভিত্তি করে সপ্তদশ শতক থেকে ঊনবিংশ শতকে পশ্চিমা পুঁজিবাদের বিকাশের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র শক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান। ইউরোপীয়রা রেড ইন্ডিয়ান নামে পরিচিত আমেরিকার কয়েক মিলিয়ন আদি বাসিন্দাকে হত্যা করে তাদের খেত-খামার বাড়িঘর দখল করে নেয়। এরপর আফ্রিকা থেকে ধরে আনা কালো আদমিদের শ্রমশক্তির উপর ভর করে সেখানে নতুন কৃষি খামার, কয়লা উত্তোলন ও কলকারখানা গড়ে তোলা হয়। আদি আমেরিকান ও কালো আদমিদের রক্তের উপর গড়ে ওঠা পশ্চিমা পুঁজিবাদি সা¤্রাজ্য শুরু থেকেই ভিকটিমদের রক্ত ও হাড়-মাংসের রস শোষণ করে টিকে আছে। মধ্যযুগে ইউরোপ জুড়ে একদিকে যখন যাজকতন্ত্রের নিপীড়ন, অন্যদিকে উপকূলীয় ভাইকিংদের লুন্ঠন-বর্বরতার শিকার ঠিক তখন পবিত্র কুরআনের আলোকবর্তিকা সামনে রেখে দিগি¦জয়ি মুসলমানরা ইউরোপকে নতুন পথের সন্ধান দিয়েছিল। কিন্তু পুরোহিততন্ত্রের ধারক রাজারা মুসলমানদের নতুন সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা অস্ত্র দিয়ে মোকাবেলা করতে গিয়ে ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের ডাক দেয়। পোপ তৃতীয় লুই খৃষ্টীয় নবম শতকের শুরুতে ফ্রাঙ্কিশ রাজা শার্লমেনকে ইউরোপের স¤্রাট উপাধি দিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেন। এরপর দুইশ বছরের ধর্মযুদ্ধে অল্প কয়েক দশক ফিলিস্তিনের উপর দখল কায়েম রাখতে সক্ষম হলেও চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনের উপর মুসলমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনে খাত্তাবের নেতৃত্বে সপ্তম শতকে বাইজানটাইনদের কাছ থেকে বিনা রক্তপাতে জেরুজালেমের চাবি বুঝে নিতে সক্ষম হন। এরপর প্রায় ৫শ বছর ধরে মুসলমানদের হাতে জেরুজালেম সব জাতি ধর্মের মানুষের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নগরী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। খৃষ্টান ক্রুসেডের মূল লক্ষ্য ছিল জেরুজালেমসহ ইউরোপের মুসলমানদের অধ্যুসিক সব জনপদ দখল করা। তৃতীয় ক্রুসেডের সময় পুরো জনপদের উপর পৈশাচিক বর্বরতা চালিয়ে ১০৯৯ সালে খৃষ্টানরা জেরুজালেম দখল করে নেয়ার ৮০ বছর পর ১১৮৭ সালে হাত্তিনের যুদ্ধে ক্রুসেডারদের পরাজিত করে সুলতান গাজী সালাদিনের নেতৃত্বে জেরুজালেম পুনরুদ্ধার হয়। মাঝখানে আট দশক বাদ দিলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত প্রায় ১২শ বছর জেরুজালেমসহ ইউরেশিয়ায় মুসলমানদের শাসন ছিল ঔদার্য ও জাতিগত সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এমনকি স্পেনে-আইবেরিয়ান পেনিনসুলায় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্মকা-ে ইহুদিদের স্বাধীন ভূমিকার কারণে সে সময়টি ‘জুইশ গোল্ডেন এইজ’ বলে অভিহিত হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ইউরোপের রাজশক্তিগুলোর আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের কারণে। বলকান যুদ্ধে উসমানীয় খেলাফতের দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে পড়েছিল। ইউরোপের খৃষ্টানরা ক্রুসেডের প্রতিশোধ হিসেবে প্রথম মহাযুদ্ধকে বেঁছে নিয়েছিল। যদিও জার্মানি ও ফ্রান্স ছিল যুদ্ধের প্রধান প্রতিপক্ষ ; তবে যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিনতি নির্ধারিত হওয়ার অনেক আগেই ফ্রান্স, বৃটেন ও ইতালিসহ ইউরোপের প্রধান শক্তিগুলো অটোমান সা¤্রাজ্যের ভাগ-বাটোয়ারা ও ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে নেয়। বালফোর ডিক্লারেশনের বিনিময়ে বৃটিশ ইহুদিদের সমর্থন আদায় করে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে সক্ষম হয়। এর আগেই ১৯১৬ সালে বৃটিশ কূটনীতিক স্যার মার্ক সাইক্স এবং ফরাসি কূটনীতিক ফ্রঁসোয়া জর্জ পিকোর মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুসারে মধ্যপ্রাচ্যের উপর পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভাগাভাগি চুড়ান্ত করা হয়। ভার্সাই চুক্তির মধ্য দিয়ে প্রথম মহাযুদ্ধে জার্মানির উপর গ্লানিকর-অপমানজনক শর্ত চাপিয়ে দেয়া হয়। সেই শর্তের কারণেই জার্মানিতে এডলফ হিটলারের নেতৃত্বে ফ্যাসিস্ট জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে। প্রথম মহাযুদ্ধে জার্মানি ও অটোমানদের পতনের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যবস্থার ভারসাম্য ভেঙ্গে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানের মধ্য দিয়ে পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থায় নতুন দিকনির্দেশনা ও পরিকল্পনা কার্যকর হয়। সাইক্স-পাইকটের চুক্তির আগে মক্কার গর্বনর শরিফ হোসেনের সাথে বৃটিশ হাই কমিশনার স্যার ম্যাকমোহনের যে গোপন চুক্তি হয়েছিল, তাতে যুদ্ধের পর আল সৌদ পরিবারের রাজত্বের স্বীকৃতির অঙ্গিকার ছিল। সেই লোভে আরব জাতীয়তাবাদী রিভোল্টের মধ্য দিয়ে হেজাজ ও নজদ প্রদেশ থেকে অটোমান বাহিনীকে পরাজিত করে ভেতর থেকে অটোমান খেলাফতের পতনের সূচনা করা হয়। বৃটিশদের পৃষ্ঠপোষকতায় শরিফ হোসেনের নেতৃত্বে হেজাজে হাসেমীয়দের রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই ছিল মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রনব্যবস্থার প্রথম বাস্তব ভিত্তি। একই সময়ে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। বলকান যুদ্ধের পর অটোমান সুলতান আব্দুল হামিদের কাছ থেকে ফিলিস্তিনের কয়েকটি জেলা ইহুদিরা অর্থের বিনিময়ে কিনে নিতে চাইলে তিনি রাজি হননি। তবে তিনি তাদেরকে সেখানে নির্বিঘেœ বসবাসের অনুমতি দিয়েছিলেন। ইহুদিরা প্রথম জায়নিস্ট কনভেনশনে ফিলিস্তিনে অথবা আমেরিকায় একটি ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনার কথা প্রকাশের সাথে সাথে অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার উপর ভর করে ভবিষ্যতে বিশ্বের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি গোপন পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। ‘দ্য প্রটোকল্স অব দি এলডার্স অব জায়ন’ নামে পরিচিত এই পরিকল্পনা বিংশ শতকের শুরুতে (১৯০৩) প্রথমে রাশিয়ায় অত:পর ইউরোপের বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনুদিত হয়ে প্রকাশিত হয়। এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত থাকলেও প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর একশ বছরের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, জায়নিস্ট প্রটোকলের ষড়যন্ত্রের দাবি মিথ্যা নয়। যুদ্ধ জয়ে বৃটিশদের উপর ইহুদি ধনকুবের, ব্যাংকার ও বিজ্ঞানিদের প্রভাব আমেরিকায় আরো প্রকট ও গভীর প্রভাব বলয় সৃষ্টি করে।
উসমানীয় খেলাফতের পতনের পর একশ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রথম মহাযুদ্ধের সময় সম্পাদিত গোপন সন্ধিগুলোর প্রভাব থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা বিশ্ব বেরিয়ে আসতে পারেনি। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতনের পর ইউনিপোলার বিশ্বের নেতৃত্বে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে মুক্তবাজার অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট মোকাবেলায় মার্কিনীরা জায়নিস্ট লবি ও ইসরাইলের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বসম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান সমর্থন ও চাপ অগ্রাহ্য করে গ্রেটার ইসরাইল গঠন, মধ্যপ্রাচ্যের তেলসম্পদের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং ইসরাইলের একচ্ছত্র আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে প্রথম মহাযুদ্ধের সময়ের মত একটি নতুন সন্ধি বা চুক্তিতে উপনীত হওয়া জায়নিস্ট মার্কিনীদের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। আব্রাহাম অ্যাকর্ড বা ডিল অব দ্য সেঞ্চরি সেই পুরনো গোপন চুক্তির নবতর নবায়ন হিসেবেই গণ্য করা যায়। তবে একমাত্র ইরানের বিপ্লবী সরকার এ ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত দশকে মধ্যপ্রাচ্যের অনন্ত ৭টি দেশের রেজিম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল বলে জানা যায়। এর মধ্যে ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, লিবিয়ায়, তিউনিসিয়া ও ইয়েমেনে রেজিম পরিবর্তন সম্পন্ন হলেও এই তালিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ ইরানই শুধু অবশিষ্ট্য রয়েছে। ইরানকে একঘরে করে রেখে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর সাথে ইসরাইলের নরমালাইজেশন প্রক্রিয়ায় সফল হলে ইরানের রেজিম পরিবর্তনের পরবর্তী ধাপ আরো সহজ হতে পারতো। সেটি সফল না হওয়ায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপকে বেছে নিয়েছে। তাদের এমন পদক্ষেপের বিষয়ে ইরান অনেক আগে থেকেই সচেতন ছিল। ইরানের এই সচেতনতাকে ব্যর্থ করে দিতে তাদের উপর ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক-অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা উস্কে দেয়া, টার্গেট কিলিং এবং বিরতিহীনভাবে সামরিক আগ্রাসনের হুমকি অব্যাহত রাখা হয়েছে। কিন্তু তিন হাজার বছরের গৌরবময় ধারাবাহিক সভ্যতার দেশ ইরান অতীতে যেমন কোনো পরাশক্তি দেশের পদানত হয়নি, নিজেও অন্যকোনো দেশকে পদানত বা দখল করার নজির নেই। দুর্বল ও অবরুদ্ধ অর্থনীতি নিয়ে গতানুগতিক সামরিক প্রযুক্তি বাজারের প্রতিযোগিতায় পশ্চিমাদের সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকা ইরানের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এ কারণেই তারা নিজস্ব ক্ষেপনাস্ত্র, ড্রোন, সামরিক প্রযুক্তি ও প্রকল্পের উপর সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। এফ-সিক্সটিন, এফ-থার্টি ফাইভ, স্টেল্থ যুদ্ধবিমানের সাথে পাল্লা দিতে নিজস্ব বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অপেক্ষা না করে ক্ষেপনাস্ত্রের শক্তি ও গতি বাড়িয়ে তাদের সাথে পাল্লা দেয়ার সক্ষমতা অর্জনে আয়াতুল্লা খামেনির পরিকল্পনা ছিল মোক্ষম ও নির্ভুল। গত বছর জুন মাসের যুদ্ধে ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত শক্তিকে নাস্তানাঁবুদ করে ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ১২ দিনের মাথায় যুদ্ধবিরতি করতে বাধ্য করেছিল ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন একাধিপত্য আরো একশ বছর নির্বিঘœ রাখতে ডিল অব দ্য সেঞ্চুরির ফর্মূলা কার্যত ব্যর্থ হওয়ার কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প ধৈর্য হারিয়ে ইরানের উপর সামরিক পদক্ষেপ নিতে গিয়ে আবারো লেজে-গোবুরে অবস্থা সৃষ্টি করেছেন। জুন মাসের যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী বোমা ও বোমারু বিমান ব্যবহার করে ইরানের ফর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান পরমাণু কেন্দ্রে শত শত বোমা ফেলে তা ধ্বংস করার দাবি করেছিল ট্রাম্প। সে সময় বোমা মেরে শুধু পারমানু কেন্দ্রই ধ্বংস করেনি, টার্গেট কিলিংয়ের মাধ্যমে ইরানের অর্ধ ডজন সামরিক-বেসামরিক শীর্ষ নেতাকে হত্যা করেছিল। মার্কিন ভূখন্ডে কিংবা অন্য কোনো দেশের জন্য কোনো ইমিডিয়েট থ্রেট না হলেও ৬ মাসের মাথায় আবারো ইরানে বোমা হামলার প্রথম দফায় স্কুলের শত শত বাচ্চা হত্যা, পরিবারের সদস্যসহ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের রেজিম পরিবর্তনের যুদ্ধ শুরু করেছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রেজিম চেঞ্জ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইসরাইল ও আমেরিকা যে সব অভিযোগ ও প্রোপাগান্ডার আশ্রয় নিয়েছে তার সবগুলোই সর্বৈব মিথ্যা। সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করার আগে সেখানে ডাব্লিউএমডি থাকার জোরালো প্রচারনা চালিয়েছিল পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো। পশ্চিমা চাপের কাছে নতি স্বীকার করে সমঝোতা করার প্রস্তাবে রাজি হওয়ার পরও লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে নির্মম পরিনতির শিকার হতে হয়েছে। পশ্চিমারা বার বার প্রমান করেছে, তারা প্রতিপক্ষের সাথে দেয়া প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গিকার পালন করেনা। এমনকি ইরানের সাথে কূটনৈতিক আলোচনার নাটক করে অপ্রস্তুত অবস্থায় নেতাদের হত্যা করার মত ঘৃন্য ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেছে ইসরাইল আমেরিকা। ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মাসে মিথ্যা অভিযোগে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বিমান হামলা ও কমান্ডো অভিযান চালিয়ে ধরে নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, ট্রাম্প প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছেন; এখন থেকে তিনি ভেনিজুয়েলার তেল বিক্রি করবেন। কয়েকমাস গ্রীনল্যান্ড দখলের ঘোষণা দিয়ে পুরো ইউরোপের গণপ্রতিবাদের সম্মুখীন হয়ে থেমে গেছেন। এ সপ্তাহে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন তিনি কিউবা দখল করবেন। গাজায় গণহত্যা শেষে যুদ্ধবিরতির শুরুতে ট্রাম্প সেখানে নিজের মালিকানায় প্রমোদ নগরী গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে বিশ্বের আর কোনো পরাশক্তি বা নেতৃত্বকে আর কখনো এমন নির্লজ্জ, নির্মম ও বর্বর ভূমিকায় দেখা যায়নি। ট্রাম্পের এমন ভূমিকায় পশ্চিমা বিশ্বের অনেক নেতা নিরবতা অবলম্বন করলেও ফিলিস্তিন ও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রশ্নে মধ্যপ্রাচ্যের পুরনো বশংবদ নেতারা কিন্তু দ্বৈত ভূমিকা নিয়েছেন। একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশ সীমা ব্যবহার করতে না দেয়ার কথা বলেছেন, অন্যদিকে গোপনে ইসরাইলের সাথে সুর মিলিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে হামলা করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। একশ বছর আগে বৃটিশরা ইহুদি ও বিশ্বাসঘাতক আরবদের সমর্থন নিয়ে উসমানীয় সা¤্রাজ্যের পতনের মধ্য দিয়ে যে নতুন বিশ্বব্যবস্থা শুরু হয়েছিল, এখন শত বছর পর সেই বিশ্বব্যবস্থাকে সম্পদ লুন্ঠনের নতুন মাত্রায় উন্নীত করতে তিন হাজার ছরের সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সার্বভৌম রাষ্ট্র ইরানকে ধ্বংস করতে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সেই আরব ও জায়নিস্টরা গোপনে একাট্টা হয়েছে। স্কুলের শত শত শিশু ও সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনী হত্যার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু যে যুদ্ধ শুরু করেছে, মাত্র চারদিনের মধ্যেই তা নিজেদের জন্য বিপজ্জনক বুমেরাং হয়ে উঠেছে। ইসরাইলের সামরিক আধিপত্য ইরানের হাইপারসনিক মিসাইলে ধূলোয় মিশে যেতে বসেছে। কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ধ্বংস করে একের পর এক দেশ দখল ও রিজিম চেঞ্জের নির্মম নিষ্ঠুর ও নির্লজ্জ খেলায় মেতে ওঠা ডোনাল্ড ট্রাম্পের অহংকারের অজেয় মার্কিন রণতরী-নৌবহরগুলো এখন ইরানের হাইপারসনিক মিসাইলের আগুনে ঝলসে গিয়ে লজ্জায়-অপমানে পারস্যোপসাগরে ডুবে যেতে শুরু করেছে। পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য ও অর্থনীতি, যথেচ্ছ অবরোধ-নিষেধাজ্ঞা বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রক্ত শোষণের হাতিয়ারে পরিনত হয়েছে। এই যুদ্ধে ইরান হেরে গেলে এই শোষণ-লুন্ঠন আরো বাড়তে থাকবে। অভাবনীয় ঋণের ভারে জর্জরিত মার্কিন অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে যুদ্ধ ও লুন্ঠনের এই অগস্ত্যযাত্রা পারস্য উপসাগরে অস্তমিত হলে এক নতুন বহুকেন্দ্রিক ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থার জন্ম হবে। এই যুদ্ধ শুধু ইরানের নয়, এটি শত বছরের শোষণ-লুন্ঠনের বিরুদ্ধে তৃতীয় বিশ্বের ঘুরে দাঁড়ানোর যুদ্ধ। চীন-রাশিয়াসহ সব আরব-অনারব দেশকে এই যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে ইরানের পাশে থেকে সক্রিয়-সোচ্চার ভূমিকা রাখার মধ্য দিয়ে আগ্রাসি-লুটেরা বিশ্বব্যবস্থার পতন নিশ্চিত করা সম্ভব।

You may also like

Leave a Comment