গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার হাসিনার পতনের প্রায় আড়াই মাস পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়িত্ব নেয় মোমেন কমিশন। এর মধ্যে দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে ১২ ডিসেম্বর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান সিনিয়র সচিব ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন। তার পরপরই কমিশনার হিসেবে যোগ দেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ মিঞা মুহাম্মদ আলী আকবার আজিজী (তদন্ত) এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ (অনুসন্ধান)। তবে এদের কীভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তা নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। কে কীভাবে তাদের বাছাই করেছে, তা পরিস্কার নয়। অথচ দুদক পুনর্গঠনের একটি বাছাই কমিটি রয়েছে। সেখান থেকে বাছাই প্রক্রিয়ায় চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ দেয়া হয়। মোমেন কমিশন গঠনের সময় এ প্রক্রিয়ার কোনো ধার ধারা হয়নি। কয়েকজন প্রভাবশালী উপদেষ্টার আকাক্সক্ষা অনুযায়ী তাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছিল বলে গতকাল দৈনিক ইনকিলাবের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুদক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে মোমেন কমিশনকে না করে দেয়া হয়েছে। ফলে এই তিন সদস্যের কমিশনের সবাই দ্রুত পদত্যাগ করতে পারেন বলে জানা গেছে।
শেখ হাসিনার পতনের পর দুর্নীতি দমন কমিশনে কারা আছেন এবং কী কাজ করেছেন, এ নিয়ে খুব একটা আওয়াজ পাওয়া যেত না। শুরুর দিকে কমিশন বেশ বড় বড় কথা বললেও পরবর্তীতে তাদের মুখে আর কোনো কথা শোনা যায়নি। হাসিনার শাসনামলে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনাসহ নানা কথা বললেও তার কিছুই করতে পারেনি। বাস্তবতাবিবর্জিত কথা বলে যেন শীতনিদ্রায় চলে যায়। তাদের কর্মকা- এমনই ছিল যে, কোনো টের পাওয়া যেত না। কমিশন আকে কি নেই, বোঝা যেত না। তবে পর্যবেক্ষকরা কমিশনকে অথর্ব বললেও সে কাজ করেছে চাতুরতার সাথে। বড় বড় দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে করা মামলা হালকা করে দিয়েছে। কেন হালকা হয়েছে, তা বোধকরি বুঝিয়ে বলার অবকাশ নেই। হাসিনার আমলের ব্যাংক লুট, অর্থপাচার, মেগা প্রকল্পের দুর্নীতির অনুসন্ধান ও তদন্তকে গুরুত্ব না দিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদ অনুসন্ধানে বেশি ব্যস্ত সময় পার করেছে। মেগা প্রকল্পের সাথে জড়িত পরিচালকদের বিরুদ্ধে করা মামলার একটি রায়ও অনুকূলে আনতে পারেনি দুর্বল তদন্ত রিপোর্টের কারণে। যেসব মামলা করেছে, তার সিংহভাগই উচ্চ আদালতে টিকবে না। অথচ হাসিনার সময়ের সীমাহীন দুর্নীতির তদন্ত এবং এর সাথে জড়িতদের গ্রেফতার ও বিচারের মুখোমুখি করে দুদক কমিশন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারত। হাসিনার পতনের পরপরই অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন ১২ সদস্যের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করে। এই কমিটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার ১৫ বছরে প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। এ হিসেবে ১৫ বছরে ২৪০ বিলিয়ন বা দুই লাখ ৪০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার পাচার হয়েছে। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি দ্রুত হাসিনার শাসনামলের দুর্নীতির প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও দুর্নীতি দমন কমিশন এ প্রতিবেদনের আলোকে কোনো কাজই করেনি। তাহলে, এরা করেছে কি? তারা কার পারপাস সার্ভ করেছে? কেন দুর্নীতির সাথে জড়িত রাঘব-বোয়ালদের আইনের আওতায় আনতে পারেনি? যাদের এনেছে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন কেন দুর্বল হলো? এসব প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, এই কমিশন অন্তর্বর্তী সরকারের একটি সিন্ডিকেটের হয়ে বড় বড় দুর্নীতিবাজদের বাঁচাতে কাজ করেছে। আর মুখে বড় বড় কথা বললেও কোনো কাজ করেনি। পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার কথা বলে এক টাকাও আনতে পারেনি। অথচ হাসিনার আমলের দুর্নীতির শ্বেতপত্রের আলোকে এই দুর্নীতি দমন কমিশন ব্যাপক কাজ করতে পারত। দুর্নীতিবাজদের গ্রেফতার ও আইনের মুখোমুখি করে দুর্নীতি দমন ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা পালন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারত। শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি ব্যর্থতা নিয়ে তাকে বিদায় নিতে হচ্ছে।
বিদায়ী দুর্নীতি দমন কমিশন কী কাজ করেছে, তা নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিৎ। তাদের কাজের জবাবদিহি করা দরকার। কেন তারা ব্যর্থ হলো, তা খতিয়ে দেখতে হবে। তাদের দিয়ে কারা দুর্নীতিবাজদের পার করে দিয়েছে বা দিচ্ছে, সেটাও পুনর্বিবেচনা করতে হবে। রাঘব-বোয়ালদের দুর্নীতিকে কম প্রণিধান দিয়ে কমিশন কেন মানুষের ব্যক্তিগত অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ল? বড় বড় দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কেন কমিশন কঠিন হলো না? এতে কাদের স্বার্থ রক্ষা করেছিল? এসব প্রশ্ন সামনে রেখে কমিশনের প্রত্যেককে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তারা যাতে দেশের বাইরে যেতে না পারে, এ ব্যাপারেও সরকারকে বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে।