সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান কতদিন চলবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এক মাস বা সম্ভাব্যভাবে ‘তারও অনেক বেশি’ সময় ধরে চলতে পারে। ট্রাম্প এই মিশনকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে থাকা একটি ‘বিরাট হুমকি’ নির্মূলের জন্য প্রয়োজনীয় বলে বর্ণনা করেন।
হোয়াইট হাউসের এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ‘যত সময় লাগে, ততই ঠিক আছে। যা প্রয়োজন, আমরা তাই করব। শুরু থেকেই আমরা চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের কথা বলেছিলাম, কিন্তু আমরা তার চেয়েও অনেক বেশি সময় চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখি। আমরা করবই।’ এ খবর দিয়েছে অনলাইন লস অ্যানজেলেস।
এর কয়েক ঘণ্টা আগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, সামরিক অভিযানের সময়সীমা এখনও পরিবর্তনশীল এবং ইরানে যুদ্ধ কতদিন চলবে তা নির্ধারণে ট্রাম্পের ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’ আছে। পেন্টাগনে এক সংবাদ সম্মেলনে হেগসেথ বলেন, ‘চার সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ, ছয় সপ্তাহ- সময় এগোতেও পারে, পিছিয়েও যেতে পারে।’ ট্রাম্প প্রশাসনের পরিবর্তনশীল সময়সীমা ও উন্মুক্ত লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তৃত সংঘাত নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন সেনা নিহতের সংখ্যা ছয়ে পৌঁছেছে এবং কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে আরও হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে। কারণ ‘সবচেয়ে কঠিন আঘাত এখনও আসেনি।’
জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সোমবার জানান, অতিরিক্ত মার্কিন বাহিনী ইতিমধ্যে ওই অঞ্চলে মোতায়েন হচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এটি ‘এক রাতের অভিযান’ নয় এবং তিনি অতিরিক্ত ক্ষয়ক্ষতিরও আশঙ্কা করছেন।
সামরিক কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, ইরানের পাল্টা হামলায় আরও তিনজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। পাশাপাশি কুয়েতে এক সম্ভাব্য বন্ধুত্বপূর্ণ আগুনের ঘটনাতে ভুলবশত তিনটি মার্কিন জেট ভূপাতিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সব আক্রমণ ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় নিহতের সংখ্যা কয়েকশ’তে পৌঁছেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যখন তেহরান ও ইরানের অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে, তখন ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহসহ তার মিত্ররা ইসরাইল এবং বাহরাইন, সাইপ্রাস, ইরাক, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে বলে বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে। এদিকে ইরানের পূর্বে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান নিজেদের লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ায় পুরো অঞ্চল আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।
শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ইরানি স্কুলশিশু, বেসামরিক নাগরিক ও বাংলাদেশি সহ উপসাগরীয় অঞ্চলের অভিবাসী শ্রমিকরাও রয়েছেন। লড়াইয়ের প্রভাব পড়েছে বিশ্ব তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনে। পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী দিয়ে ট্যাংকার চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় তেলের দাম বেড়েছে।
সৌদি আরব জানিয়েছে, দাম্মামের কাছে একটি তেল শোধনাগারে ইরানি ড্রোন হামলা প্রতিহত করা হয়েছে এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে শোধনাগারটি বন্ধ রাখা হয়েছে। ইরান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। দুবাইসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান বিমানবন্দরগুলো ফ্লাইট স্থগিত বা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ ব্যাহত হয়েছে এবং বিমান সংস্থার শেয়ারের দাম কমেছে। ইসরাইলে দেশব্যাপী বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে এবং নাগরিকরা বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েছেন। ইরান জানিয়েছে, দেশটির একাধিক স্কুলে হামলায় শিক্ষার্থীরা নিহত হয়েছে।
সংঘাত চলাকালে ট্রাম্প ও হেগসেথ স্থলসেনা পাঠানোর সম্ভাবনা নাকচ করেননি। ট্রাম্প নিউইয়র্ক পোস্টকে বলেন, আমি স্থলসেনা পাঠানো নিয়ে আগেভাগে কিছু বলি না। অন্য প্রেসিডেন্টরা বলেন, কোনও স্থলসেনা যাবে না। আমি তা বলি না। আমি বলি, সম্ভবত লাগবে না অথবা প্রয়োজন হলে (পাঠানো হবে)।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের স্বল্প-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং নৌবাহিনীর হুমকি মোকাবিলায় অভিযান চালাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, ইসরাইলের সম্ভাব্য হামলার জবাবে ইরান মার্কিন স্থাপনায় আঘাত হানতে পারে- এই আশঙ্কা থেকেই যুক্তরাষ্ট্র আগে আঘাত হানে। তিনি বলেন, আমরা বসে থেকে প্রথম আঘাতের অপেক্ষা করতাম না। তাহলে আমাদের ক্ষয়ক্ষতি আরও বেশি হতো। রুবিও সতর্ক করেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে কঠিন আঘাত এখনও আসেনি।
নেতৃত্ব পরিবর্তন ও বিতর্ক
শনিবারের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন বলে জানানো হয়েছে। ট্রাম্প এবিসি নিউজকে বলেন, সম্ভাব্য বিকল্প নেতাদের অনেকেই এখন আর বেঁচে নেই- দ্বিতীয় বা তৃতীয় অবস্থানেও কেউ নেই। তবে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেসের আন্তর্জাতিক ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক কেভান হ্যারিস বলেন, ইরান কেবল একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। তার মতে, খামেনিকে হত্যা করা হলেও দেশটির নীতিতে বড় পরিবর্তন নাও আসতে পারে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কল সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্সের সিনিয়র ফেলো বেঞ্জামিন র্যাড বলেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে কিনা তা নির্ভর করছে ইরানের বর্তমান ক্ষমতাধরদের আলোচনায় বসার ইচ্ছার ওপর। ট্রাম্প দাবি করেছেন, গত সপ্তাহে একটি চুক্তি প্রায় হয়েই গিয়েছিল। কিন্তু ইরান পিছিয়ে যায়। তিনি বলেন, আমরা ভেবেছিলাম চুক্তি হয়েছে। কিন্তু তারা সরে গেছে। এদের সঙ্গে সহজে সমঝোতা করা যায় না। সঠিক উপায়েই কাজটা করতে হবে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তিনি আগ্রহ হারাবেন- এমন ধারণা প্রত্যাখ্যান করে ট্রাম্প বলেন, আমি বিরক্ত হই না। এতে বিরক্তিকর কিছু নেই।