১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে যেমন আনন্দিত, তেমনি নির্বাচন হওয়ায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ যেন হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আওয়ামী লীগকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়া হয়নি। যেখানেই তৎপর হয়েছে, সেখানেই তাদের দমানো হয়েছে। যখনই কোনো কার্যালয় খোলার চেষ্টা হয়েছে, বিক্ষুব্ধ জনতা তা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলো তৎপর হওয়ার সুযোগ পায়নি। তবে নির্বাচনের পরের দিন থেকে আওয়ামী লীগ যেন ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। নিষিদ্ধের খড়গ উপেক্ষা করে দেশের বহু জায়গায় দলটির অঙ্গ সংগঠনের কার্যালয় খুলছে। জাতীয় পতাকা উড়াচ্ছে। গত শুক্রবার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে দলীয় নেতাকর্মীরা জাতীয় পতাকা ও শেখ মুজিবের ছবি রেখে স্লোগান দিয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামীপন্থী কিছু শিক্ষক ও নেতাকর্মী ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ফুল দিতে গিয়েছে। যেখানে গ্রেফতারকৃত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জামিন পাওয়া ছিল অনিশ্চিত, সেখানে নির্বাচনের পর অনেকে জামিনে বের হয়ে আসছেন। গত কয়েক দিনে অনেক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জামিন হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন, নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী ও কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক এমপি ইয়াবা স¤্রাট খ্যাত আব্দুর রহমান বদি। নিষিদ্ধতা উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগের মাথাচাড়া দিয়ে উঠা নিয়ে দেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী জনগণ ত্রস্ত ও ভীত। কারণ, দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী লীগ নামক দানব যেভাবে এদেশের মানুষকে নিষ্পেষণ, নির্যাতন, খুন, গুম করেছে, তা তাদের মনে এখন জাজ্বল্যমান।
বিএনপি বিপুল বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় আসায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ খুশি হয়েছে বলে পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাদের নেতাকর্মীদের তৎপর হওয়া থেকে তা বোঝা যাচ্ছে। অথচ এই বিএনপিকে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে কী অসীম নিপীড়ন-নির্যাতনই না করেছে আওয়ামী লীগ! দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রায় ৬০ লাখ মামলা করেছে। লাখ লাখ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার-নির্যাতন করা হয়েছে। বছরের পর বছর নেতাকর্মীদের হয় জেলখানায়, না হয় আদলতের বারান্দায় কাটাতে হয়েছে। মামলার খরচ চালাতে গিয়ে লাখ লাখ নেতাকর্মী নিঃস্ব হয়ে গেছে। অনেককে বাড়িঘর ও এলাকাছাড়া হয়ে উদ্বাস্তুর জীবনযাপন করতে হয়েছে। তাদের জীবনের সোনালী সময়গুলো পলাতক সময়ে পরিণত হয়। যেখানে বিএনপির নেতাকর্মী দেখা গেছে, সেখানেই আওয়ামী লীগের পান্ডা ও পোষা পুলিশ ঝাপিয়ে পড়েছিল। শত শত নেতাকর্মী ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছে। বিএনপির হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ছয় শতাধিক নেতাকর্মী গুম হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, ফ্যাসিস্ট হাসিনা তার রোষ মিটাতে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে ভুয়া মামলায় সাজা দিয়ে নির্জন জেলে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে তাকে স্লো পয়জনিংয়ের মাধ্যমে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তার দলের এই নির্মম আচরণের শিকার হয়ে আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেছেন। বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে থাকতে হয়েছে, এই আওয়ামী লীগের জন্য। নির্বাসনে থেকেও তিনি ভুয়া মামলা থেকে রেহাই পাননি। যাবজ্জীবন থেকে শুরু করে বিভিন্ন মেয়াদে তাকে কারাদ- দেয়া হয়েছিল। শুধু বিএনপির নেতাকর্মী নয়, কত মানুষ যে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের জুলুমের শিকার হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা কী করেছে, তা বোধকরি নতুন করে বলার কিছু নেই। তাকে উৎখাত ও বিতাড়িত করতে শিশু থেকে শুরু করে সকল শ্রেণীপেশার মানুষ অকাতরে জীবন দিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ চিরতরে অন্ধ ও পঙ্গু হয়ে গেছে। ত্রয়োদশ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের ফ্যাবিবাদবিরোধী, ভারতীয় হ্যাজিমনিবিরোধী, নিপীড়িত-নির্যাতিত, বঞ্চিত, মজলুম জনগণ বিএনপির উপর আস্থা রেখে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় এনেছে। তাদের বিশ্বাস বিএনপি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারবে। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, বিএনপির বিজয়ের পরদিন থেকেই আওয়ামী লীগ আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করেছে।
বিএনপির ক্ষমতার দশদিন যেতে না যেতে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্নকারী এবং ভারতীয় দোসর আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি হওয়া দেশের মানুষ ভালোভাবে দেখছে না। তারা মনে করছে, যে আওয়ামী লীগ বিএনপির অস্তিত্বই বিলীন করে দিতে চেয়েছিল, বিএনপি নামক দলকে স্বীকার করতে চায়নি, সেই আওয়ামী লীগই বিএনপি ক্ষমতায় আসায় কমফোর্ট ফিল করছে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কতটা শোচনীয় তা প্রতিদিনের পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন দেখলেই বোঝা যায়। মানুষের কষ্টের সীমা নেই। এই পরিস্থিতির মধ্যে যখন আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের কথা শোনা যায়, তখন ফ্যাসিবাদবিরোধী জনগণ এবং বিএনপিকে যারা ভোট দিয়েছে, তাদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক কাজ করা স্বাভাবিক। কারণ, আওয়ামী লীগ এমনই একটি ভয়ংকর ও প্রতিশোধপরায়ন দল যে, সে কাউকে ছাড় দেয় না। তার দেড় দশকের বেশি শাসনামলে দেশের মানুষ হাড়েহাড়ে তা টের পেয়েছে। এমন ভয়ংকর দলের ফিরে আসার আলামত শঙ্কা জাগানিয়া। বলা বাহুল্য, আওয়ামী লীগ তার কৃতকর্মের জন্য কোনো দুঃখ প্রকাশ বা অনুশোচনা প্রদর্শন করেনি। এতেই বোঝা যায়, দলটি দেশের মানুষের ওপর কতটা ক্ষিপ্ত ও প্রতিশোধপরায়ন হয়ে রয়েছে। যেহেতু বিএনপি ক্ষমতায় আসতে না অসতেই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের আলামত দেখা যাচ্ছে, তার নেতাকর্মীরা জামিন পাচ্ছে, তাই এ ব্যাপারে বিএনপির সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও অবস্থান জনগণ আশা করে। যারা বিএনপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছে, তাদের মনে যে সন্দেহ, সংশয় ও অবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে, তা দূর করতে হবে। বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, এই আওয়ামী লীগ সুযোগ পেলে বিএনপিকে ছেড়ে দেবে না। আরও অধিক শক্তিশালী হয়ে তার উপর প্রতিশোধ নেবে। সেদিন যাতে এ অনুশোচনা না হয়, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের সুযোগ দেয়া ছিল ভুল।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের চেষ্টা
১৪
previous post