মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প শনিবার ইরানের বিরুদ্ধে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছেন। চারজন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুই ‘অস্বাভাবিক মিত্র’ ইসরাইল এবং সৌদি আরবের দীর্ঘ সপ্তাহব্যাপী প্রচেষ্টা ভূমিকা রেখেছে। এই হামলায় ইসরাইল এবং মার্কিন বাহিনী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য সমন্বিতভাবে কাজ করেছে। তিনি প্রায় চার দশক ধরে ক্ষমতায় ছিলেন। সূূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গত এক মাসে ট্রাম্পকে একাধিক ব্যক্তিগত ফোন কলের মাধ্যমে মার্কিন হামলার পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন, যদিও তিনি প্রকাশ্যে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে ছিলেন। একই সময়ে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যমে মার্কিন হামলার পক্ষে প্রচার চালাচ্ছিলেন। এই যৌথ প্রচেষ্টার ফলে ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্ব ও সামরিক স্থাপনার উপর একটি ব্যাপক বিমান অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন। যা প্রথম ঘণ্টায়ই খামেনি এবং আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তার মৃত্যু ঘটায়।
হামলার সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলি মূল্যায়ন করে যে, ইরানের বাহিনী পরবর্তী দশকে মার্কিন মূল ভূখণ্ডে অবিলম্বে হুমকি সৃষ্টি করবে না। তারপরও ট্রাম্পের এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রের দশকব্যাপী নীতি থেকে একটি বড় পরিবর্তন। তারা সাধারণত পূর্ণাঙ্গ অভিযান চালিয়ে কোনো দেশের সরকার পরিবর্তন করতে দ্বিধা করতো। ডনাল্ড ট্রাম্প ভিডিও বার্তায় ইরানিদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তোমরা এখন পর্যন্ত যা করতে চাইছো, আমি তা করতে রাজি নই। এখন আপনারা এমন এক প্রেসিডেন্ট পেয়েছেন, যিনি আপনাদের যা চাইছেন তা দিচ্ছেন, দেখা যাক আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান।’
মার্কিন প্রেসিডেন্টের দূত স্টিভ উটকফ এবং ট্রাম্পের জামাই জারেড কুশনার ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার মধ্যে ছিলেন। সে সময়েই হামলা চালানোর পক্ষে সৌদি আরবের চাপ আসে। যদিও ওই আলোচনার সময় সৌদি যুবরাজকে ফোনালাপে জানানো হয় যে, সৌদি আকাশসীমা বা ভূখণ্ডকে ইরানের উপর হামলার জন্য ব্যবহার করা যাবে না। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলাকালীন যুবরাজ সতর্ক করেন যে, যদি যুক্তরাষ্ট্র এখন হামলা না চালায়, তাহলে ইরান আরও শক্তিশালী এবং বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। তার ভাই, সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খালিদ বিন সালমান জানুয়ারিতে ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে হামলা না করার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেন।
ইরান প্রধানত শিয়া মুসলিম শাসিত এবং সৌদি আরবে সুন্নিদের নেতৃত্ব চলছে। এ দুই দেশের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা অঞ্চলে প্রায়শই যুদ্ধের সৃষ্টি করেছে। সপ্তাহের প্রথম মার্কিন হামলার পর ইরান সৌদি আরবের উপর হামলা চালায়। রিয়াদ দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইরানের মোকাবিলায় ‘সব প্রয়োজনীয় ও সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ’ নেয়ার আহ্বান জানায়।
ট্রাম্পের যুক্তি ছিল, ইরানের ১৯৭৯ সালের বিপ্লব থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং হামলার ইতিহাসের প্রতিশোধ নেয়া। তিনি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন, ১৯৭৯ সালে তেহরানের তাদের দূতাবাস দখলের সময় ৫২ মার্কিন নাগরিককে আটকে রাখার হয়। ১৯৮৩ সালে লেবাননে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিস্ফোরণে ২৪১ মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়। ২০০০ সালে ইয়েমেনে ইউএসএস কোল জাহাজে হামলা হয়। তিনি দাবি করেন, ইরান তখনও পারমাণবিক অস্ত্র ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে কাজ করছে। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলি এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
হামলার সময় ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের অভ্যন্তরীণ বিরোধীদের উদ্দেশ্যে বলেন, তারা তাদের সরকার ‘নিয়ন্ত্রণ করবে’। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো নির্দেশনা দেননি। তিনি পুনরায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলবে, যতক্ষণ না ‘মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্বের শান্তি নিশ্চিত করা যায়।’
ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে তার আগের সামরিক অভিযান থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। পূর্ববর্তী পদক্ষেপে তিনি সাধারণত সীমিত আকারের হামলা করতেন। কিন্তু এবার তিনি ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী এবং পুলিশ শান্তিপূর্ণভাবে ইরানি দেশপ্রেমিকদের সঙ্গে একত্রিত হবে এবং দেশকে তার যোগ্য মর্যাদায় ফিরিয়ে আনবে।