Home প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানব্যাটারি শিল্পে নতুন প্রযুক্তি

ব্যাটারি শিল্পে নতুন প্রযুক্তি

সোডিয়াম আয়ন

Muktochinta Online
০ comments views

বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি), মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপের ব্যাটারি তৈরির মূল কাঁচামাল লিথিয়াম ধাতু। বাজারের বেশির ভাগ ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহৃত হয় লিথিয়াম আয়ন প্রযুক্তি।  এর পাশাপাশি ক্ষেত্র অনুয়ায়ী লিথিয়াম পলিমার এবং লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারিও ব্যবহৃত হয়। পুরনো লেড এসিড অথবা নিকেল মেটাল হাইব্রিড প্রযুক্তির ব্যাটারিগুলোর শক্তি ঘনত্ব অপেক্ষাকৃত কম।

তাই শক্তিশালী কিন্তু আকারে ছোট ও ওজনে হালকা ব্যাটারি তৈরিতে লিথিয়ামই অধিক জনপ্রিয়। লিথিয়াম ব্যাটারির আরো একটি গুণ, এটি দীর্ঘ সময় ধরে শক্তি সরবরাহ করে।

ব্যাটারি বাজারে লিথিয়ামের একচেটিয়া আধিপত্য এবার শেষে পথে। লিথিয়ামের পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়িতে ব্যবহার শুরু হচ্ছে নতুন এক প্রযুক্তি—সোডিয়াম আয়ন ব্যাটারি।চীনের বাজারে এর মধ্যেই বিশ্বের প্রথম সোডিয়াম আয়ন ব্যাটারিসমৃদ্ধ বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি শুরু হয়েছে। এটি তৈরি করেছে চীনা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘চাঙ্গান’। তাদের ‘নেভো এ০৬’ মডেলের বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে সিএটিএলের তৈরি নতুন প্রজন্মের ‘এনএ-আয়ন’ ব্যাটারি প্যাক।

কিভাবে কাজ করে

লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির মতোই রিচার্জেবল প্রযুক্তি সোডিয়াম আয়ন।

এর রসায়ন প্রক্রিয়া অনেকটা লিথিয়াম ব্যাটারির মতোই। লিথিয়ামের বদলে এর প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয় সোডিয়াম। ইভি শিল্পে লিথিয়াম আয়নের বিকল্প প্রযুক্তি বহুদিন ধরেই খুঁজছেন গবেষকরা। লিথিয়ামের বদলে সোডিয়াম কাজে লাগিয়ে ব্যাটারি তৈরি করা যেতে পারে, এমন ধারণা বেশ পুরনো। তবে বাণিজ্যিক পর্যায়ে সোডিয়াম আয়ন ব্যাটারি তৈরিতে প্রথম সাফল্য পেয়েছে চীনা ব্যাটারি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘কনটেম্পোরারি অ্যাম্পেয়ারেক্স টেকনোলজি (সিএটিএল)’।

প্রতিষ্ঠানটি ‘এনএএক্সট্রা’ (NAxtra) ব্যানারে বিক্রি শুরু করেছে সোডিয়াম আয়ন ব্যাটারি প্যাক। চাঙ্গান নেভো এ০৬ ইভি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এতে ব্যবহৃত ৪৫ কিলোওয়াট ঘণ্টা ধারণক্ষমতার ব্যাটারি প্যাকটি এক চার্জে প্রায় ২৫০ মাইল পর্যন্ত চলতে সক্ষম। চাঙ্গানের মতে, ২৫০ মাইল রেঞ্জ মোটেও ফেলনা নয়। বরং প্রচলিত লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারিচালিত সাশ্রয়ী মূল্যের অন্যান্য ইলেকট্রিক গাড়ির সঙ্গে মানানসই। অর্থাৎ পারফরম্যান্সের দিক থেকে বাজেট ইভিতে ব্যবহৃত ব্যাটারির চেয়ে পিছিয়ে নেই সোডিয়াম আয়ন প্রযুক্তি।

কেন হঠাৎ সোডিয়ামের কদর?

পারফরম্যান্সে সোডিয়াম এবং লিথিয়াম আয়রন ফসফেট প্রযুক্তি প্রায় সমান। এর পরেও ইভি নির্মাতারা হঠাৎ করেই সোডিয়ামের দিকে ঝুঁকছে। এর নেপথ্যে বড় কারণ—

সহজলভ্য ও সস্তা কাঁচামাল : প্রাকৃতিকভাবেই লিথিয়ামের তুলনায় প্রায় এক হাজার গুণ বেশি পরিমাণে পাওয়া যায় সোডিয়াম। সমুদ্রের লবণ থেকে শুরু করে নানাবিধ সহজলভ্য খনিজে সোডিয়াম মেলে। তাই সোডিয়ামের জন্য এক-দুটি দেশের ওপর নির্ভর করতে হয় না। অথচ অস্ট্রেলিয়া, চিলি, আর্জেন্টিনা ও চীনের মতো কয়েকটি দেশের বাইরে লিথিয়াম তেমন পাওয়া যায় না। তাই এর মূল্য ও সরবরাহ প্রায়ই ওঠানামা করে। কাঁচামাল সহজলভ্য হওয়ায় সোডিয়াম আয়ন ব্যাটারি তুলনামূলক অনেক কম খরচে তৈরি করা সম্ভব।

তীব্র শীতেও কার্যকর : সোডিয়াম আয়ন ব্যাটারির সবচেয়ে বড় সুবিধা শীতপ্রধান অঞ্চলের তীব্র শীতেও পারফরম্যান্স ধরে রাখে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, মঙ্গোলিয়ার মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়ও এটি স্বাভাবিকভাবেই চার্জ গ্রহণ করেছে। এমনকি মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও গাড়ি সচল রেখেছে সোডিয়াম ব্যাটারি। টেক রেডারের রিপোর্ট অনুযায়ী, মাইনাস ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় মূল ধারণক্ষমতার ৯০ শতাংশের বেশি ধরে রাখতে পারে সোডিয়াম ব্যাটারি। সেখানে একই আবহাওয়ায় লিথিয়াম ব্যাটারির রেঞ্জ ও কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

নিরাপত্তা : সোডিয়াম আয়ন ব্যাটারিতে অতিরিক্ত গরম হয়ে আগুন ধরে যাওয়ার ঝুঁকি অপেক্ষাকৃত কম।

হারিয়ে যাবে লিথিয়াম?

ব্যাটারি তৈরিতে লিথিয়াম ব্যবহার এখনই বন্ধ হচ্ছে না। বরং ব্যাটারি বাজারে এখন থেকে দুই ধরনের ব্যাটারিই বিক্রি হবে। সিএটিএল-এর মতে, সব ধরনের কাজে একই ব্যাটারি ব্যবহারের দিন শেষ।

লিথিয়াম আয়ন প্রযুক্তি থেমে নেই । সম্প্রতি সিএটিএল বাজারে এনেছে সর্বশেষ ‘৫সি’ প্রযুক্তির লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি প্যাক। তাদের দাবি, এই ব্যাটারি প্যাক শূন্য থেকে পূর্ণ চার্জ হতে সময় নেবে মাত্র ১২ মিনিট। তিন হাজারবার পুরোপুরি খালি করে আবার চার্জ করার পরও ধারণক্ষমতার ৮০ শতাংশ ধরে রাখতে পারবে এটি। যেসব গাড়িতে ৫সি ব্যাটারি ব্যবহৃত হবে সেগুলো প্রতিবছর ১৫ হাজার মাইল চালালে প্রায় ৭৫ বছর পর্যন্ত সেগুলো ব্যবহারযোগ্য থাকবে। যেসব গাড়ি দীর্ঘ রেঞ্জ এবং দ্রুত সময় চার্জিংয়ের উপযোগী, সেগুলোতে লিথিয়াম আয়ন ব্যবহৃত হবে। শহুরে ট্রাফিকে চালানোর জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের গাড়ি বা শীতপ্রধান এলাকার উপযোগী মডেলে থাকবে সোডিয়াম আয়ন ব্যাটারি।

ব্যাটারি শিল্পে নতুন প্রযুক্তি

দেশি প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে এখনো বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার তুলনামূলক ছোট। তবে ধীরে ধীরে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। আমাদের দেশে তীব্র শীত না পড়লেও গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া, বিদ্যুৎ সরবরাহের ভোল্টেজ তারতম্য এবং মানসম্মত চার্জিং স্টেশনের অভাবে গাড়ির ব্যাটারি দ্রুত নষ্ট হয়। তাই আমাদের দেশে ব্যবহারের জন্য সোডিয়াম আয়ন হতে পারে উত্কৃষ্ট প্রযুক্তি। এ ধরনের ব্যাটারি বেশ টেকসই এবং এর উৎপাদন খরচও কম। সোডিয়াম ব্যাটারি ব্যবহারে ইভি-এর মূল্য প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাবে। ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্যও ইভি কেনা হবে সহজ। ব্যাটারি পরিবর্তনের খরচও কমবে অনেকটা। ফলে দীর্ঘদিন নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যাবে ইভি। ব্যবহৃত ইভি কেনায় ক্রেতাদের সংশয় কমবে।

You may also like

Leave a Comment