খালিদ বিন আনিস
বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অগ্নিকুণ্ড। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার সমীকরণকে এক জটিল মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এ সংঘাত কেবল ওই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই, এর ঢেউ আছড়ে পড়ছে দক্ষিণ এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত। একদিকে যুদ্ধের দামামা, অন্যদিকে জ্বালানি সংকট ও সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা-সব মিলিয়ে এক অস্থির সময় পার করছে বিশ্ব। এ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান, প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং আমাদের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রস্তুতি কতটুকু? যুদ্ধের এই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের কৌশল কী হওয়া উচিত? এই সব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে কথা বলেছেন কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ এম হুমায়ুন কবির।
ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধ আমরা এখন প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নিতে দেখলাম। আয়াতুল্লাহ খামেনিকে মেরে ফেলা হয়েছে এবং ইসরাইল শুধু আক্রমণই করেনি, আমেরিকা সরাসরি এখানে দৃশ্যমানভাবে যুক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে এ অভূতপূর্ব সামরিক উত্তেজনাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? আর এটা কি নতুন বিশ্বযুদ্ধের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে?
এম হুমায়ুন কবির : সেটা বলা মুশকিল। তবে কয়েকটি বিষয় অবশ্য আছে; একটা হচ্ছে, প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে একটা দেশের সরকার পরিবর্তনের জন্য সামরিক আক্রমণ পরিচালনা করা-এটি আন্তর্জাতিক রীতিনীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি কাজ। এবং সেদিক থেকে ইরানের ওপর ইসরাইল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে আক্রমণ-এটা নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক রীতিনীতির একটা বড় লঙ্ঘন।
আর দ্বিতীয় ব্যাপারটা হলো, এ আক্রমণের মধ্য দিয়ে ওদের অনেক নেতৃস্থানীয় সামরিক বাহিনীর প্রধান, নিরাপত্তা প্রধান-এরকম আরও বেশকিছু লোকজন মারা গেছেন। এবং একইসঙ্গে আমরা দেখেছি, ১২০ জনের মতো শিশু-একটা স্কুলের মেয়েরাও কিন্তু এতে নিহত হয়েছে। এ ধরনের নৃশংস আক্রমণ আমার মনে হয় সভ্য জগতের সঙ্গে সাজুয্যপূর্ণ নয়, যে কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ এগুলোর নিন্দা করছে। কেউ কেউ সমর্থনও করছেন বটে। কিন্তু আমি মনে করি, সভ্যতার বিচারে, নীতি-নৈতিকতার বিচারে এ ধরনের কাজগুলো গর্হিত কাজ হিসাবেই বিবেচনা করা যেতে পারে। মাঝখানে ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু আলোচনায় নিয়োজিত ছিল। তারা এর আগের দিনও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, যিনি বা যারা এটার দূতিয়ালিটা করছিলেন, তারা কিন্তু আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন এবং মনে হচ্ছিল, এরপর পরবর্তী আলোচনা ভিয়েনায় বসবে, এর মধ্য থেকে একটা সমাধান পাওয়া যাবে। কিন্তু গত জুনে যখন ইসরাইল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ চালায়, তখনকার মতোই এবারও দেখা গেল, তাদের এ কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনা এক ধরনের চাতুরী। অর্থাৎ তারা ধোঁকা দেওয়ার জন্য কূটনৈতিক আলোচনায় ইরানকে ব্যস্ত রেখে এ ধরনের আক্রমণ করল। এতে করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে পারস্পরিক বিশ্বাস, যা একটা মৌলিক কাঠামোর অংশ, সেখানে এ ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা পারস্পরিক বিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনের জন্য এটা ভালো দৃষ্টান্ত নয়।
ইরান আগেই বলছিল, যদি আক্রান্ত হয়, তারা পালটা আক্রমণ করবে। এবং সেটা ওই অঞ্চলে ইসরাইল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ যেখানে আছে বা যেসব প্রতিষ্ঠান আছে, সেগুলোকে তাদের লেজিটিমেট টার্গেট হিসাবে বিবেচনা করবে। এ কথাটা কিন্তু আগে থেকেই তারা বলছিল। ফলে আমরা যেটা দেখলাম, গত দুই দিনে ইরানের ওপর আক্রমণ হওয়ার পর কুয়েত থেকে শুরু করে বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরবসহ সব দেশের ওপরই, যে দেশগুলোতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান বা স্বার্থ আছে, সেসবের ওপর ইরানিরা পালটা আক্রমণ চালিয়েছে এবং ইসরাইলের ওপরও চালিয়েছে। ফলে আমরা দেখলাম, এ যুদ্ধটা বিস্তৃত হওয়ার পথে। এবং হরমুজ প্রণালি ইরানিরা বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে শুধু ওই অঞ্চলেই নয়, এখন সারা পৃথিবীর ওপর এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইসরাইলের জন্য এটি একটি ওয়্যার অফ চয়েস অর্থাৎ তারা ইচ্ছে করে এ যুদ্ধে গেছে। কিন্তু ইরানের জন্য এটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। কাজেই এ যুদ্ধে ইরান অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বেশ দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরাইলও তার সব শক্তি নিয়ে ইরানকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। কাজেই এখানে একটা ধ্বংসযজ্ঞের সূত্রপাত হলো এবং নিশ্চিতভাবেই আমরা বাংলাদেশের মানুষ, শান্তিপূর্ণ মনোভাবের বা শান্তিতে যারা বিশ্বাস করে, তাদের সবার জন্যই এটা খুব বেদনার সময়, সবার জন্য একটা আশাহত হওয়ার সময়।
যুদ্ধ মানেই তো মানবিক বিপর্যয়। একদিকে আমরা দেখছি পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তেও সংঘাত হচ্ছে, শরণার্থীবিষয়ক সংকট বাড়ছে। আবার ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের ফলে সেই ঢেউ তো ইউরোপ বা এশিয়া পর্যন্তও পৌঁছাবে। এ সম্ভাব্য মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রস্তুতিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
এম হুমায়ুন কবির : আন্তর্জাতিক সংস্থা বলতে কার্যকর সংস্থা জাতিসংঘ। তারা নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে বসেছিল; কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি। আমার মনে হয়, বিশ্ব দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। একপক্ষ ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আক্রমণকে সমর্থন করছে; আরেক পক্ষ একটা দেশের ওপর এমন আক্রমণকে নিন্দা জানাচ্ছে। কাজেই আমরা একটা বিভাজিত পৃথিবী দেখতে পাচ্ছি। সেই বিভাজনেরই ছায়া কিন্তু জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর গিয়ে পড়েছে। কারণ ওখানে আলাপ-আলোচনা হয়েছে; কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। যদিও আমি নিশ্চিত নই যে, এখনকার যে বিশ্ব বাস্তবতা, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর বিশ্বে যে ধরনের ড্রামাটিক বা চমকপ্রদ কিছু পরিবর্তন হয়েছে, সেই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সংস্থার কতটা ভূমিকা পালন করার সুযোগ আছে। এ ক্ষেত্রে যুদ্ধটা যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল অথবা ইরান যদি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত না নেয়, তাহলে বাইরের লোকজন বা সংস্থা আহ্বান জানালেও আমার আশঙ্কা, যুদ্ধটা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে। আর তা হলে সারা পৃথিবীকেই ভুগতে হবে। আমরাও এর বাইরে নই। ইতোমধ্যেই একজন বাংলাদেশি মারা গেছেন। কাজেই আমরাসহ এ অঞ্চলের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সরাসরি। আর আর্থিক ব্যবস্থাপনা বা আর্থিক সংকট যদি শুরু হয়, তাহলে তা সারা পৃথিবীকেই আঘাত করবে। অন্যান্য দেশের মতো আমরাও এতে আঘাতপ্রাপ্ত হব।
এ বৈশ্বিক সংকটের সম্ভাব্য আঁচ এড়াতে বাংলাদেশের আগাম প্রস্তুতি বা কূটনৈতিক কৌশল কেমন হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
এম হুমায়ুন কবির : আগাম প্রস্তুতি বলতে, আমাদের দেশে একটা নতুন সরকার এসেছে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। ক্ষমতা গ্রহণের পর তারা হাতে খুব বেশি সময় পায়নি। আমার ধারণা, তারা এসে অর্থনীতিকে চাঙা করাসহ অন্যান্য জরুরি কাজ যেগুলো আছে, যেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা-এগুলোতে ব্যস্ত থেকেছে। এখন এ যুদ্ধ কিন্তু তাদের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করেছে। এ সমস্যার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়ার দরকার হবে এবং ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশনাও দিয়েছেন বাংলাদেশিরা ওখানে যারা আছেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। বিভিন্ন মিশনও উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু আমি যেটা আশঙ্কা করি, আশা করব এ আশঙ্কা ঠিক হবে না, যদি যুদ্ধটা দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বিভিন্ন দেশে আমাদের বাংলাদেশি ভাইবোনেরা কর্মহীন হয়ে পড়তে পারেন।
এখন সেসব দেশে ভাইবোনরা যারা আছেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে তাদের সরিয়ে আনার জন্য আমাদের সরকারের দিক থেকে উদ্যোগ নিতে হবে। যেমনটি ১৯৯১ সালে প্রথম গালফ যুদ্ধের সময় অর্থাৎ ইরাকের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের সময় আমরা দেখেছিলাম, এরকম অবস্থার মধ্যে আমরা পড়েছিলাম। সাম্প্রতিককালে ২০১১ সালে লিবিয়ায় যখন গাদ্দাফি সরকারের পতন হয়, তখনো বাংলাদেশি ভাইবোনদের সরিয়ে আনার জন্য এমন উদ্যোগ নিতে হয়েছে। আমি মনে করি, সরকারের দিক থেকে এজন্য জরুরি ভিত্তিতে একটা প্রস্তুতি প্রয়োজন। দরকার হলে আমরা এ ধরনের কাজে ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের (IOM) সহায়তা নিতে পারি, যাদের সঙ্গে আমরা আগেও কাজ করেছি। তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে একটা আপৎকালীন কন্টিনজেন্সি প্ল্যান করা দরকার, যদি তাদের সরাতে হয়। সেটা নীতিগত উদ্যোগ হোক, দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ করেই হোক, তাদের আনার জন্য যে আর্থিক সংস্থান দরকার, সেগুলো করা হোক। এ বিষয়গুলোতে আমি মনে করি, একটু উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন।
আর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে গ্যাসের ক্রাইসিস হওয়ার একটা আশঙ্কাও করা হচ্ছে। সেটা যদি সত্যিই হয়, তাহলে আমাদেরও যেহেতু এলএনজি বাইরে থেকে আনতে হয়, যুদ্ধ দীর্ঘকালীন হলে এ সাপ্লাই চেইনে টান পড়বে। কাজেই সেজন্যও সরকারকে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে এ সম্ভাব্য সাপ্লাই চেইন ডিসরাপশন হলে কী করা হবে বা সেটাকে অভ্যন্তরীণভাবে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের আশপাশে বন্ধু দেশ যারা আছে, দরকার হলে তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করে সহযোগিতা নিতে হবে। এ কাজগুলো আমাদের এখনই করতে হবে। কারণ এ যুদ্ধটা দীর্ঘায়িত হলে মানবিক সংকট ঘনীভূত হবে, আর্থিক সংকট বাড়বে। আবার অনেক ভাইবোন যারা মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল, বিমান চলাচল বন্ধ হওয়ায় তারাও যেতে পারেনি। ফলে একটা বহুমুখী সংকটের মধ্যে পড়ার একটা সমূহ আশঙ্কার দিক রয়েছে। এজন্য আমি মনে করি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে হোক কিংবা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নেতৃত্বেই হোক, সংশ্লিষ্ট যত মন্ত্রণালয় আছে, তাদের নিয়ে একটা টাস্কফোর্স জরুরিভাবে করা যেতে পারে, যারা প্রতিদিন এগুলো মনিটর করবে এবং কী কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, সে অনুযায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করবে। অন্তত এ উদ্যোগটা আমার মনে হয়, আগাম প্রস্তুতি হিসাবে আমাদের ভেবে রাখা দরকার।
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
এম হুমায়ুন কবির : ধন্যবাদ।