Home ধর্মপবিত্র হজ আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম

পবিত্র হজ আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম

জুমার খুৎবা-পূর্ব বয়ান

Muktochinta Online
০ comments ১৪ views

ঢাকাস্থ দক্ষিণ মুগদা ব্যাংক কলোনি রসূলবাগ জামে মসজিদের খতিব মুফতি আব্দুল্লাহ আল মাসউদ গতকাল জুমা-পূর্ব বয়ানে হজের প্রস্তুতি গ্রহণ সম্পর্কে বলেন, জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য আমরা প্রস্তুতি নিই। পরীক্ষার আগে পড়াশোনা, বিয়ে, ব্যবসা ও সফরের আগে পরিকল্পনা: সবই প্রস্তুতির অংশ। অথচ পবিত্র হজ যা ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা একটি আধ্যাত্মিক যাত্রা, যা তাওবার সুযোগ ও গোনাহ থেকে পরিপূর্ণ মুক্তি লাভের সুযোগ করে দেয়, যা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম, তা অনেক সময় আমরা যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া সম্পন্ন করতে চাই। খতিব বলেন, হজ কবুলের পূর্বশর্ত হলো হালাল অর্থ। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।’ অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘বান্দা যখন হারাম মাল দ্বারা হজ করে এবং বাহনে আরোহণ করে লাব্বাইক বলে, তখন আসমান থেকে ফেরেশতারা বলেন, তোমার লাব্বাইক কবুল হলো না, কারণ তোমার উপার্জন হারাম, তোমার বাহন হারাম, তোমার পোশাক হারাম, তোমার পাথেয় হারাম, তুমি সওয়াব প্রাপ্তি ছাড়া গোনাহ নিয়ে ফিরে যাও। তুমি বিপদের সুসংবাদ নিয়ে বাড়িতে যাও।’ (তাবরানি, হাদিস-৫২২৮) তাই হজের আগে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, আমাদের উপার্জন, সঞ্চয় এবং হজের ব্যয় যেন সম্পূর্ণ হালাল হয়। খতিব বলেন, হজের সফরের কষ্ট অন্য যেকোনো সফরের চেয়ে বেশি। সফরসঙ্গীদের আচরণ, প্রশাসনিক লোকদের আচরণ হতে পারে কষ্টদায়ক, গরম ও ভিড়ের কারণে কষ্টের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। তাই হজ পালনকারীকে মনে রাখতে হবে: সে বায়তুল্লাহর মুসাফির, সে আল্লাহর সন্তুষ্টির সফরে বের হয়েছে, তাই তাকে সর্ব বিষয়ে ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। যেন ধৈর্য দেখে আল্লাহ খুশি হয়ে যান এবং হজ কবুল করে নেন।

টঙ্গীর পূর্ব আরিচপুর সরকার বাড়ি ঈদগাহ মসজিদুল আকসার খতিব মাওলানা রিয়াদুল ইসলাম মল্লিক গতকাল জুমার খুৎবা-পূর্ব বয়ানে বলেন, কালো গিলাফে ঢাকা বায়তুল্লাহ আর মসজিদে নববীর সবুজ গম্বুজ, মুমিনের হৃদয়ে লালিত দুটি স্বপ্ন। লাখো কোটি চোখের অসীম তৃষ্ণা এই দুটি স্বপ্নকে ঘিরে, অনবরত সেই স্বপ্ন মুমিন-হৃদয়কে আলোড়িত করে। ইসলামের মূল স্তম্ভসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো হজে বায়তুল্লাহ: ঈমান, নামাজ, জাকাত ও রোজার পরই হজের অবস্থান হজ মূলত কায়িক ও আর্থিক উভয়ের সমন্বিত একটি ইবাদত। তাই উভয় দিক থেকে সামর্থ্যবান মুসলিমের উপর হজ পালন করা ফরজ। এখন হজের মওসুম। মিম্বরে মিম্বরে হজের আলোচনা। চারদিকে সাজ সাজ রব। কারো মুখে তালবিয়া, কারো মনে আগামীর স্বপ্ন, আর কারো হৃদয়জুড়ে মক্কা-মদিনার স্মৃতি ও হাহাকার। এভাবেই হজের মওসুম আসে আর গোটা মুসলিম জাহানের হৃদয় ও আত্মাকে মথিত আলোড়িত করে যায়। যতদিন থাকবে মুমিনের দেহে এক বিন্দু প্রাণ থাকবে উম্মাহর হৃদয়ে কিছু মাত্র ঈমানের স্পন্দন ততদিন মক্কা-মদিনা, মিনা-আরাফা আমাদের আলোড়িত করবেই।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, মানুষের মধ্যে যারা সেখানে (বায়তুল্লাহ) পৌঁছার সামর্থ্য রাখে তাদের উপর আল্লাহর উদ্দেশ্যে এ গৃহের হজ করা ফরজ, আর কেউ যদি অস্বীকার করে তাহলে তোমাদের জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি জগতের প্রতি মুখাপেক্ষী নন।’ (সূরা আলে ইমরান-৯৭) একবার ফরজ হজ আদায়ের পর পরবর্তী হজগুলো নফল হিসেবে গণ্য হবে। ইবনে আববাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলে কারিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি হজ করার ইচ্ছে করে, সে যেন তাড়াতাড়ি তা আদায় করে নেয়। কারণ যেকোনো সময় সে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে বা বাহনের ব্যবস্থাও না থাকতে পারে অথবা অন্য কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে। (মুসনাদে আহমদ) রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘ফরজ হজ আদায়ে তোমরা বিলম্ব করো না। কারণ তোমাদের কারো জানা নেই, তোমাদের পরবর্তী জীবনে কী ঘটবে।’ (মুসনাদে আহমদ) খতিব বলেন, হজে মাবরুরের বিনিময় শুধুই জান্নাত। হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে সহিহ সনদে বর্ণিত: ‘হজের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে হজ করল না, এরপর সে ইহুদি অবস্থায় মারা যাক কি খ্রিষ্টান অবস্থায় সবই তার জন্য সমান!’ (তাফসিরে ইবনে কাসির) হজ পরম করুণাময় আল্লাহর ইবাদত। বান্দার প্রতি স্রষ্টার হক। ঈমানের আলোকিত নিদর্শন। কুরআন মাজিদে ইরশাদ করেন: ‘আর তুমি মানুষের মাঝে হজের ঘোষণা প্রচার করে দাও। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং কৃশকায় উটের উপর সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত হতে। যাতে তারা তাদের (দুনিয়া ও আখিরাতের) কল্যাণের জন্য সেখানে উপস্থিত হতে পারে এবং রিজিক হিসেবে তাদের দেয়া গবাদিপশুসমূহ জবাই করার সময় নির্দিষ্ট দিনগুলোতে তাদের উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর ঘরের মেহমান হিসেবে কবুল করুন।

ঢাকার উত্তর মান্ডা বাইতুন নূর জামে মসজিদের খতিব হাফেজ মাওলানা মুফতি ফয়জুল্লাহ জীবনপুরী গতকাল জুমার খুৎবা-পূর্ব বয়ানে বলেন, পবিত্র হজে বিশ্ব মুসলিমের মহামিলন হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের মধ্যে যার সেখানে (বায়তুল্লাহ) যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই ঘরের হজ করা তার ওপর ফরজ। আর কেউ যদি কুফরি করে (অস্বীকার করে), তবে আল্লাহ তো জগৎবাসীর মুখাপেক্ষী নন।’ (সূরা আল-ইমরান, আয়াত-৯৭)

কুরআনে আল্লাহ বলেন: ‘এবং মানুষের নিকট হজের ঘোষণা দাও; তারা তোমার নিকট আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটসমূহের পিঠে সওয়ার হয়ে, তারা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে।’ (সূরা হজ, আয়াত-২৭) আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হজের সময় নির্দিষ্ট মাসসমূহ। অতএব, এই মাসগুলোতে যে নিজের ওপর হজ অবধারিত করে নিলো, হজের সময় তার জন্য স্ত্রী-সহবাস, কোনো প্রকার পাপ কাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়।’ (সূরা বাকারা, আয়াত-১৯৭) আল্লাহ বলেন: ‘নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম। সুতরাং যে ব্যক্তি কাবাগৃহের হজ বা ওমরাহ সম্পন্ন করে, তার জন্য এই দুই পাহাড় প্রদক্ষিণ (সায়ি) করায় কোনো পাপ নেই।’ (সূরা বাকারা, আয়াত-১৫৮) আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘আর তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে হজ ও ওমরাহ পূর্ণ করো।’ (সূরা বাকারা, আয়াত-১৯৬১) আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের উদ্দেশে ভাষণ দিলেন এবং বললেন, ‘হে লোক সকল! তোমাদের ওপর হজ ফরজ করা হয়েছে। অতএব তোমরা হজ করো।’ জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! তা কি প্রতি বছর? তিনি চুপ রইলেন, এমনকি লোকটি তিনবার তা বলল। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আমি যদি হ্যাঁ বলতাম (প্রতি বছরের জন্য), তবে তা অবধারিত হয়ে যেত। আর তোমরা তা পালন করতে সক্ষম হতে না।’ (মুসলিম-১৩৩৭) ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত: আকরা ইবনে হাবিস (রা.) নবী কারিম (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! হজ কি প্রতি বছর, না একবারই? নবীজি (সা.) বললেন, ‘বরং একবার। তবে কারো যদি এর অধিক করার সামর্থ্য থাকে তা নফল।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ-২৮৮৬) ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হজের সংকল্প করে, সে যেন তা দ্রুত আদায় করে। কারণ মানুষ কখনো অসুস্থ হয়ে পড়ে, কখনো প্রয়োজন দেখা দেয় এবং বাহনও হারিয়ে যেতে পারে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ-২৮৮৩) আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত: তিনি নবী কারিম (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে হজ করল এবং তাতে কোনো অশ্লীল কথা বা কাজ করল না, সে যেন তার মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিনের মতোই (নিষ্পাপ অবস্থায়) ফিরে এলো।’ (বুখারি-১৫২১) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা হজ ও ওমরাহ একাদিক্রমে পালন করো। কেননা, এই হজ ও ওমরাহ দারিদ্র্য ও গুনাহসমূহকে সেভাবে দূর করে দেয়, যেভাবে কামারের হাপর লোহা ও সোনা-রুপার ময়লা দূর করে দেয়। আর কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ব্যতীত আর কিছুই নয়।’ (সুনানে তিরমিজি-৮১০) আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত: তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমরা জিহাদকে সর্বোত্তম আমল মনে করি। কাজেই আমরা কি জিহাদ করব না?’ তিনি (নবীজি) বললেন, ‘না, বরং তোমাদের (নারীদের) জন্য সর্বোত্তম জিহাদ হলো হজে মাবরুর (কবুল হজ)।’

ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত: নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে জিহাদকারী এবং হজ ও ওমরাহ পালনকারীরা আল্লাহর মেহমান। আল্লাহ তাদের ডেকেছেন এবং তারা সাড়া দিয়েছেন। তারা আল্লাহর নিকট যা কিছু চান, আল্লাহ তাদের তা দান করেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ-২৮৯৩) সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো মুসলিম তালবিয়া (লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা…) পাঠ করে, তখন তার ডান ও বাম পাশে পাথর, বৃক্ষরাজী ও মাটির ঢিবি যা কিছু আছে সবই তার সাথে তালবিয়া পাঠ করে; এমনকি পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ধ্বনিত হতে থাকে।’ (তিরমিজি-৮২৮) আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আরাফার দিনের চেয়ে এমন কোনো দিন নেই, যেদিন আল্লাহ তায়ালা সবচেয়ে বেশি বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।’ (সহিহ মুসলিম-১৩৪৮) আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হজ করার তৌফিক দান করুন এবং এই বছর যে সমস্ত হাজী সাহেবগণ বাইতুল্লাহর সফরে যাবেন সবার হজকে হজে মাবরুর হিসেবে কবুল করুন। আমিন।

You may also like

Leave a Comment