দেশের অর্থনীতি যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখন জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা এবং চলতি মাসে দ্বিতীয়বার এলপিজির দাম বাড়ানো নিঃসন্দেহে জনজীবনের জন্য দুঃসংবাদ। ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণ হিসাবে সরকারের এ সিদ্ধান্তের সরাসরি অভিঘাত পড়বে সাধারণ মানুষের পকেটে। বিশেষ করে শিল্প, কৃষি ও সেবা-জাতীয় অর্থনীতির তিন প্রধান স্তম্ভে জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি যে নেতিবাচক চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করবে, তা সামলানো বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত কঠিন হবে। বলা বাহুল্য, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কেবল পরিবহণ ভাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর বহুমাত্রিক প্রভাব বাজারব্যবস্থাকে মুহূর্তেই অস্থিতিশীল করে তোলে। ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ার ফলে পণ্যবাহী ট্রাক ও লরির ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজধানীর বাজারে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানেই নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে।
পরিতাপের বিষয়, ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভোজ্যতেলের সরবরাহ বন্ধ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির যে পাঁয়তারা দেখা যাচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে পর্যুদস্ত করছে। এর সঙ্গে আবারও ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বৃদ্ধি এবং বিগত সরকারের সময় থেকে বাজারে নির্ধারিত দামে এলপিজি না পাওয়ার যে অভিযোগ রয়েছে, তা বাজার তদারকি সংস্থার চরম উদাসীনতাকেই ফুটিয়ে তোলে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো উৎপাদন খাতের ভবিষ্যৎ। দেশের কৃষি খাত মূলত ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন খরচ বাড়লে কেবল খাদ্যপণ্যের দামই বাড়বে না, বরং অনেক ক্ষুদ্র কৃষক চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। একইভাবে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ও পণ্য পরিবহণ ব্যয় বাড়লে বিশ্ববাজারে আমাদের তৈরি পোশাক ও অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি সক্ষমতা হ্রাস পাবে। বিনিয়োগে মন্দা ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে যে শ্লথগতি চলছে, তা আরও ঘনীভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সরকার বলছে, সরকারি তহবিলের চাপ কমাতে দাম সমন্বয় করা ছাড়া বিকল্প ছিল না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষ যখন জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন এই বিশাল ভার তাদের ওপর চাপানোর আগে সরবরাহব্যবস্থা কেন নিশ্চিত করা গেল না? পাম্পগুলোয় জ্বালানির জন্য দীর্ঘ সারি এবং চলমান রেশনিং প্রমাণ করে, কেবল দাম বাড়িয়ে সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। বরং সরবরাহে ঘাটতি থাকলে কালোবাজারি ও জনভোগান্তি আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক দায়ভার এবং বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা পরিস্থিতিকে এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাওয়ার উপক্রম করেছে।
এ অবস্থায় সরকারকে কেবল মূল্য নির্ধারণে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে হলে পরিবহণ ভাড়ার যৌক্তিক সমন্বয় এবং বাজার সিন্ডিকেট দমনে কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষি ও শিল্প খাতে জ্বালানি নিরবচ্ছিন্ন রাখতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরবরাহব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে রক্ষা করতে হলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং উৎপাদন খাতের সক্ষমতা বজায় রাখার কোনো বিকল্প নেই। নতুবা এই মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।