ড. মাহফুজ পারভেজ
১৭ এপ্রিল ভোলার তজুমদ্দিনে আয়োজিত গণসংবর্ধনায় অতীতের রাজনৈতিক অবক্ষয়ের কঠোর মূল্যায়ন করে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, অন্যায়, অবিচার, লুটপাট ও সন্ত্রাসের পরিণতি জনগণ চোখের সামনে দেখেছে। এ মন্তব্য কেবল একটি দলের সমালোচনা নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত ও সমস্যার প্রতি ইঙ্গিত। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহার, বিরোধী মতের দমন ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিষ্ক্রিয় করার প্রবণতা-এসবই আমাদের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। স্পিকারের বক্তব্য তাই একটি সতর্কবার্তা-ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, এবং জনগণের রায়ই শেষ কথা। অতীতের মতো দুর্নীতি, অনিয়ম, সন্ত্রাস ও শক্তির দম্ভ জনগণ মেনে নিতে চাইবে না, তাও তার বক্তব্যে উপস্থাপিত হয়েছে।
ছাত্রসমাজের ভূমিকাকে তিনি যে স্বীকৃতি দিয়েছেন, তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্রসমাজ বহুবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনেও তাদের ভূমিকা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। স্পিকারের এ স্বীকৃতি শুধু একটি প্রশংসা নয়, একটি শক্তিশালী বার্তা। যার মূল কথা হলো-যুবসমাজকে বাদ দিয়ে কোনো টেকসই রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তার আহ্বান ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট, ‘দলবাজি আর করবেন না, মতাদর্শের কারণে কাউকে হয়রানি করবেন না।’ কথাগুলোর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় নৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরেছেন। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের রাজনীতি প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবর্তে প্রতিহিংসার সংস্কৃতিতে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে গণতন্ত্রের মূল চেতনা-মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্পিকারের এ আহ্বান সংঘাতময় রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের প্রস্তাবনা হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে তার বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত ও তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হলো, জামায়াতে ইসলামীর প্রসঙ্গে মন্তব্য এবং বিএনপি-জামায়াত ঐক্যের আহ্বান। তিনি জামায়াতকে ‘ভদ্রলোকের দল’ হিসাবে উল্লেখ করে অতীতের মিত্রতার কথা স্মরণ করেছেন এবং ভবিষ্যতে ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। এ বক্তব্য নিঃসন্দেহে জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন ও জোটভিত্তিক বা সমঝোতাভিত্তিক রাজনৈতিক সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। তবে এটি একই সঙ্গে একটি জটিল প্রশ্নও উত্থাপন করে। আদর্শগত পার্থক্য এবং ঐতিহাসিক বিতর্ক নিয়ে রাজনৈতিক ঐক্য বা জোটবদ্ধ হওয়া কতটুকু সম্ভব এবং তা কতটুকু টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে? বিশেষত, ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় রাজনৈতিক ঐক্য শেষ পর্যন্ত কতটুকু টিকে থাকতে পারে, তা এক বিরাট প্রশ্নও বটে।
স্পিকারের বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ‘ঐক্য ভাঙলে বহিরাগত প্রভাব ফিরে আসবে’ মর্মে সতর্কতা। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত তার বক্তব্য ছিল ‘ঐক্য ভাঙলে আবার ভারত থেকে চলে আসবে দাদারা।’ এখানে তিনি মূলত একটি দেশপ্রেমিক-জাতীয়তাবাদী উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যেখানে অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপের সুযোগ হিসাবে দেখা হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এ ধরনের উদ্বেগ নতুন নয়। তবে এ বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা শুধু গণতান্ত্রিক প্রয়োজনই নয়, বরং এটি একটি নিরাপত্তার কৌশলগত কারণেও অপরিহার্য।
ক্ষমতাসীন দল হিসাবে বিএনপির দায়িত্বের বিষয়টি স্পিকার যেভাবে তুলে ধরেছেন, তা বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, জনগণকে আশ্বস্ত করতে হবে যে, বর্তমান সরকার অতীতের পুনরাবৃত্তি করবে না-লুটপাট, অর্থ পাচার বা নির্বাচনব্যবস্থার অপব্যবহার করবে না। এ বক্তব্য মূলত একটি ‘গভর্নেন্স ন্যারেটিভ’ তৈরি করার প্রচেষ্টা, যেখানে সরকার নিজেকে একটি দায়িত্বশীল এবং জবাবদিহিমূলক শক্তি হিসাবে উপস্থাপন করতে পারে।
নির্বাচন প্রসঙ্গে তার প্রতিশ্রুতি গণতন্ত্রেরই প্রতিধ্বনিস্বরূপ। কারণ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অতীতের নির্বাচনগুলো নিয়ে যে বিতর্ক ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে হলে এ প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। স্পিকারের বক্তব্য তাই শুধু একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার নয়, এটি একটি পরীক্ষার সূচনা- যেখানে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই হবে।
স্পিকার অতীত অন্যায়ের কথা বলেছেন এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য উচ্চমানের নৈতিক অবস্থান তুলে ধরেছেন। তবে যেহেতু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এখনো গভীরভাবে মেরূকৃত এবং দলীয় স্বার্থ অনেক সময় জাতীয় স্বার্থকে ছাপিয়ে যায়, সেহেতু তার আহ্বানগুলো কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ও সংশয় থেকে যায়। বিশেষত, অন্যায়, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণের বিষয়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আদৌ বিচার করার আওতায় আনা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও জনমনে ঘোরতর সন্দেহ রয়েছে। তবে সামগ্রিক বিবেচনায় স্পিকারের বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের প্রতিফলন। এটি একদিকে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান, অন্যদিকে ভবিষ্যতের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রস্তাব। তার বক্তব্যে যে আত্মসমালোচনার সুর, ঐক্যের আহ্বান এবং গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বশীলতার প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য এবং সরকার ও বিরোধী-উভয় রাজনৈতিক শক্তির জন্য অনুসরণ যোগ্য।
স্পিকারের আহ্বান বাস্তব নীতিতে রূপ নেবে কি না-এমন সন্দেহ, সংশয় ও দ্বিধা রেখেও একটি বাস্তব সত্য উল্লেখ করা প্রয়োজন; আর তা হলো, বাংলাদেশের জনগণ এখন আর কেবল বক্তব্য শুনতে চায় না, তারা দেখতে চায় কার্যকর পরিবর্তন ও বাস্তবায়ন। অতএব, স্পিকারের এ আহ্বান শুধু একটি বক্তব্য হিসাবে বিবেচনা না করে একটি প্রতিশ্রুতি হিসাবে দেখতে হবে। উপরন্তু প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণের বিষয়গুলোও ভাবতে হবে। এক্ষেত্রে তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন রাজনীতিবিদদের কর্তব্যরূপে তাদের কাঁধেই বর্তায়।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক হলো-ক্ষমতা কি আত্মসমালোচনার মাধ্যমে শুদ্ধ হবে, নাকি প্রতিশোধমূলক রাজনীতির পুনরাবৃত্তিতে নিজেই তার বৈধতা হারাবে? এ দ্বিধার উত্তর নির্ভর করছে নেতাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, নৈতিক সাহস এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার ওপর। কারণ, ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, শুধু অতীতের দোষ তুলে ধরে বর্তমানকে বৈধতা দেওয়া যায় না। বরং একসময় সেই সমালোচনা ‘রাজনৈতিক পুঁজি’ থেকে ‘রাজনৈতিক ক্লান্তি’তে পরিণত হয়। জনগণ তখন প্রশ্ন তোলে, ‘আপনারা কী আলাদা’ যদি ক্ষমতাসীন দল প্রতিনিয়ত পূর্ববর্তী শাসনের দুর্নীতি, দমন-পীড়ন ও লুটপাটের কথা বলে, কিন্তু নিজের শাসনকাঠামোতে একই ধরনের প্রবণতা অব্যাহত রাখে, তাহলে তা কেবল নৈতিক দ্বিচারিতাই নয়, বরং আত্মধ্বংসের পথ তৈরি করে। কারণ, জনগণের স্মৃতি হয়তো ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দীর্ঘস্থায়ী।
সুতরাং, মূল প্রশ্নটি হলো-পারস্পরিক সমালোচনা কি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত হবে, নাকি তা নীতিগত সংস্কারের ভিত্তি হবে? যদি এটি শুধুই প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার কৌশল হয়, তবে তা শেষ পর্যন্ত ‘উইনার্স কার্সে’ পরিণত হয়, অর্থাৎ ক্ষমতায় এসে সেই একই দোষের পুনরাবৃত্তি ঘটে, যা একসময় তারা নিন্দা করেছিল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ চক্র বহুবার দৃশ্যমান হয়েছে।
ক্ষমতাসীনদের সামনে তাই একটি স্পষ্ট পথ রয়েছে, যার তিনটি দিক। প্রথমত, অতীতের অন্যায়ের নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, এমন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আনা, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের অন্যায়-অনিয়ম-অপব্যবহার আর সম্ভব না হয়। তৃতীয়ত, নিজেদের কর্মকাণ্ডকে একই মানদণ্ডে বিচারযোগ্য করে তোলা-অর্থাৎ ‘রুল অব ল’কে সত্যিকার অর্থে সর্বজনীন করা।
এ তিনটি শর্ত পূরণ না হলে অতীতের সমালোচনা কেবল রাজনৈতিক চাতুর্যে পরিণত হবে। তখন ক্ষমতাসীন দল নিজেই সেই ‘দোষের পঙ্কে’ ডুবে যাবে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে ক্ষমতায় এসেছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, জনগণ এখন আগের মতো নিষ্ক্রিয় নয়। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং নাগরিক সচেতনতার বৃদ্ধি-সব মিলিয়ে এখন ক্ষমতার জবাবদিহি এড়ানো আগের চেয়ে কঠিন। ফলে ‘আমরা ওরা নই’-এ বক্তব্য আর যথেষ্ট নয়; তা প্রমাণ করতে হবে বাস্তব নীতিনির্ধারণ, সুশাসন এবং ন্যায়বিচারের মাধ্যমে।
অতএব, ক্ষমতাসীনদের জন্য বিষয়গুলো কেবল একটি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নয়, একটি অস্তিত্বগত প্রশ্ন। তারা কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করবে, নাকি একটি নতুন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করবে? তারা কি অতীতের ব্যর্থতার ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের বৈধতা নির্মাণ করবে, নাকি সেই ব্যর্থতাকে অতিক্রম করে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে?
শেষ কথা হলো, ক্ষমতা নিজেই একটি পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে কেবল সমালোচনা নয়, আত্মসংযম, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকার প্রদর্শন করা জরুরি। অন্যথায়, ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা হলো-যে দোষের বিরুদ্ধে লড়াই করার দাবি করা হয়, শেষ পর্যন্ত সেই দোষই ক্ষমতাসীনদের গ্রাস করে।
এজন্যই সরকারি দল তথা ক্ষমতাসীনদের সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। চাটুকার ও মতলববাজদের এড়িয়ে চলতে হয়। সঠিক সমালোচনা শুনে, সঠিক পথে থাকতে হয়। নিজেদের যতটুকু সম্ভব দোষমুক্ত রাখতে হয়। নইলে গোচরে বা অগোচরে বিন্দু বিন্দু ভুল একপর্যায়ে ভুলের মহাসমুদ্র হয়ে পতনের কারণ হয়। সন্দেহ নেই, স্পিকারের বক্তব্য সরকারকে সঠিক পথে থাকার প্রণোদনা জোগাবে। স্পিকার পদটি এখন আর দলীয় নয়। তিনি জাতীয় সংসদের মাধ্যমে সব দল ও মতের অভিভাবক। তার বক্তব্যে জাতীয় স্বার্থের প্রতিধ্বনি স্পষ্ট। তার বক্তব্য শুনলে ও মান্য করলে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো লাভবান হবে। গণতন্ত্রায়ণ ও সুশাসনের পথ মসৃণ হবে এবং অতীতের ভুলভ্রান্তি দ্বারা বিপদগ্রস্ত ও দোষাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ : চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)
mahfuzparvez.pol@cu.ac.bd