যকৃৎ তথা লিভার ও লিভার সম্পর্কিত রোগ নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী ১৯ এপ্রিল পালিত হয় বিশ্ব লিভার দিবস। এবারের লিভার দিবসের প্রতিপাদ্য, ‘সঠিক অভ্যাস, সুস্থ ও মজবুত লিভার’। শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ যকৃৎ। রক্ত পরিশোধন, পিত্তরস তৈরি, খাবার হজমে সহায়তা এবং শরীরে শক্তি সঞ্চয়ে ভূমিকা রাখে এটি।
কিন্তু লিভারের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে প্রতিবছর ১৫০ কোটি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী লিভারের রোগে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে মারা যায় প্রায় ২০ লাখ রোগী।
যকৃতের সাধারণ রোগ ও কারণ
ফ্যাটি লিভারের পাশাপাশি যকৃতে আরো কয়েকটি সাধারণ রোগ দেখা দিতে পারে। এসবের উপসর্গ ও কারণ সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
এর মধ্যে আছে—
♦ ফ্যাটি লিভার : এটি সম্পূর্ণ জীবনযাপনজনিত একটি রোগ। লিভারের রোগগুলোর মধ্যে এর প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। দেহের অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এর প্রধান কারণ। অনেক সময় এর কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।
♦ হেপাটাইটিস-বি ও সি : এই দুটি রোগের কারণ লিভারে হেপাটাইটিস ভাইরাসের সংক্রমণ। এর ফলে লিভারে সৃষ্টি হয় প্রদাহ। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না করলে দীর্ঘ মেয়াদে মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে হেপাটাইটিস।
♦ লিভার সিরোসিস : দীর্ঘ সময় ধরে মদ্যপান, ভাইরাল হেপাটাইটিস বা ফ্যাটি লিভার ডিজিজের কারণে লিভারে স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি হয়ে তৈরি হয় সিরোসিস।
♦ লিভার ক্যান্সার : লিভারের জন্য ক্ষতিকর, দীর্ঘদিন ধরে এমন জীবনযাপন করলে বা সময়মতো ভাইরাস সংক্রমণের চিকিৎসা না নেওয়ার কারণে ক্যান্সার সৃষ্টি হতে পারে।
♦ অ্যালকোহলজনিত লিভার রোগ : অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে হয় এই রোগ। শুরু হয় ফ্যাটি লিভার হিসেবে, ধীরে ধীরে মারাত্মক হতে থাকে, এমনকি লিভার ফেইলিউর পর্যন্ত গড়াতে পারে।
ফ্যাটি লিভার হেলাফেলা নয়
বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ফ্যাটি লিভার রোগে আক্রান্ত। দেহের অতিরিক্ত ওজন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ফলে দেখা দেয় এই রোগ। বছরের পর বছর কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ ছাড়াই (silent) বাড়তে থাকে ফ্যাটি লিভার (Fatty Liver Disease)। এই রোগ অত্যন্ত ধীরগতিতে অগ্রসর হয়, এর মারাত্মক উপসর্গ সহজে ধরা দেয় না। তাই বলে ফ্যাটি লিভার নিয়ে হেলাফেলা করার সুযোগ একেবারেই নেই। কেননা ফ্যাটি লিভার অগ্রসর পর্যায়ে পৌঁছে গেলে দেখা দিতে পারে প্রাণঘাতী সব রোগ, যেমন—
♦ ফাইব্রোসিস (Liver Fibrosis)
♦ সিরোসিস (Cirrhosis) এবং ফ্যাটি লিভারের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেলে
♦ লিভার ক্যান্সারও (Liver Cancer) দেখা দিতে পারে।
ফাইব্রোসিস বা সিরোসিস পর্যায়ে না পৌঁছা পর্যন্ত সাধারণত ফ্যাটি লিভারের কোনো উপসর্গ দৃষ্টিগোচর হয় না। তাই উপসর্গ না থাকলেও নিয়মিত লিভার পরীক্ষা করা উচিত।
প্রয়োজন সঠিক জীবনযাপন
দেহের সুস্থতায় সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করার বিকল্প নেই। লিভারের সুস্থতায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। এর পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম ও সার্বিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়মিত করা উচিত। অ্যালকোহল পান করা থেকে বিরত থাকা জরুরি। মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে আজই ছেড়ে দিন। মনে রাখতে হবে, সঠিক অভ্যাসই পারে আমাদের লিভারকে সুস্থ রাখতে। তাই আসুন, সচেতন হই, সুস্থ থাকি।
লেখক : অধ্যাপক, মেডিক্যাল গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি
জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল