মানবদেহে বিদ্যমান আয়নগুলোর মধ্যে সর্বাধিক পরিমাণে থাকে ক্যালসিয়াম। হাড় ও দাঁত গঠন ও মজবুত রাখতে সহায়তা করে এটি। মস্তিষ্ক থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে বার্তা বহন তথা স্নায়বিক কার্যক্রম, হৃত্স্পন্দন নিয়ন্ত্রণ এবং পেশির নড়াচড়ায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ক্ষতস্থানে রক্ত জমাট বাঁধতেও কাজ করে এটি।
দেহের বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমের জন্য রক্তে পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালসিয়ামের উপস্থিতি প্রয়োজন।
দেহের ক্যালসিয়ামের চাহিদা সব সময় খাদ্যের মাধ্যমে পূরণ করা যায় না। বিশেষত গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা এবং রজোনিবৃতি পেরোনো নারীদের দেহে ক্যালসিয়ামের প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে বেড়ে যায়। এ সময় ওষুধ হিসেবে সম্পূরক ক্যালসিয়াম গ্রহণ প্রয়োজন।
তবে অনেক রোগী ক্যালসিয়াম সেবন করলেও দেহে তা ঠিকভাবে শোষিত হয় না। নানা কারণে বাধাপ্রাপ্ত হয়।
ক্যালসিয়াম শোষণে বাধা
বেশ কয়েকটি কারণে দেহে ক্যালসিয়াম শোষণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। দেহে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দিলে এসব দিকে বাড়তি নজর দিতে হবে—
♦ পরিপাকতন্ত্রে এসিড প্রশমনের ওষুধ : পাকস্থলীর এসিড ক্যালসিয়ামকে শোষণের উপযোগী করে তোলে।
এসিড উৎপাদন কমানোর ওষুধ খেলে ক্যালসিয়াম শোষণও কম হবে। তাই ওমিপ্রাজল বা প্যান্টোপ্রাজলের মতো ওষুধের সঙ্গে ক্যালসিয়াম সম্পূরক গ্রহণ করা অনুচিত। ক্যালসিয়াম গ্রহণ করতে হবে তুলনামূলক খালি পেটে। এ সময় পেটে অ্যাসিডিক পরিবেশ বজায় থাকে। কিছু খাদ্যদানা ও ডালে ফাইটিক এসিড থাকে, এটিও ক্যালসিয়াম শোষণে বাধা দেয়।
♦ খাদ্যাভ্যাস বনাম ক্যালসিয়াম : চা, কফি, বাদাম, উচ্চমাত্রার আমিষ ও চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ করলে ক্যালসিয়াম শোষণ কমে যায়। সুতরাং ক্যালসিয়াম গ্রহণের পর চা-কফি পান করলে কিংবা বাদাম খেলে ক্যালসিয়াম শোষণ কমে যাবে। ধূমপান করলেও একই ঘটনা ঘটে।
♦ ক্যালসিয়ামের সঙ্গে চাই ভিটামিন ‘ডি’ : ভিটামিন ‘ডি’ ও প্যারাথাইরয়েড হরমোন ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়ক। অন্ত্র থেকে ক্যালসিয়াম শোষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ভিটামিন ‘ডি’। এ কারণে ক্যালসিয়াম সম্পূরকের সঙ্গে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভিটামিন ‘ডি’ দেওয়া হয়। তা না হলে ক্যালসিয়ামের পাশাপাশি ভিটামিন ‘ডি’ সম্পূরকও গ্রহণ করতে হতে পারে।
♦ দুশ্চিন্তায় কমে ক্যালসিয়াম শোষণ : অতিরিক্ত মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ ক্যালসিয়াম গ্রহণে বাধা দেয়। শরীরচর্চা কম করলেও কমে ক্যালসিয়াম শোষণের হার। সুতরাং নিয়মিত শরীরচর্চা করুন এবং মানসিক চাপমুক্ত থাকুন।
♦ কার্বনেটেড পানীয় : সোডাযুক্ত কার্বনেটেড পানীয়র মধ্যে আছে ফসফরিক এসিড, যা ক্যালসিয়াম শোষণে বাধা দেয়। নিয়মিত সোডা পান করলে দেহে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হতে পারে। ক্যালসিয়াম ওষুধ গ্রহণ করলে এ ধরনের পানীয় গ্রহণ করা অনুচিত।
♦ খাবার লবণ : লবণে রয়েছে সোডিয়াম। কিডনিতে ক্যালসিয়ামের সঙ্গে এই সোডিয়াম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। ফলে কিডনিপথে বের হয়ে যায় ক্যালসিয়াম। সে কারণে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ করলে শরীর থেকে ক্যালসিয়াম বের হয়ে যাবে।
করণীয়
♦ টক ফল ও দুধ খান বেশি বেশি। দুধের ল্যাকটোজ ও টক ফলের ভিটামিন ‘সি’ ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে।
♦ কিছু ওষুধ ক্যালসিয়াম শোষণে বাধা দেয়। টেট্রাসাইক্লিন কিংবা সিপ্রোফ্লক্সাসিন গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের দুই থেকে চার ঘণ্টা আগে ও পরে ক্যালসিয়াম গ্রহণ করা যাবে না। বেশ কিছু উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের সঙ্গে ক্যালসিয়াম গ্রহণ করা ঠিক নয়। তাই যেকোনো ওষুধের সঙ্গে ক্যালসিয়াম গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
♦ শরীরচর্চা করুন নিয়মিত, মানসিক চাপমুক্ত থাকুন এবং সুষম খাবারদাবার খান।
ক্যালসিয়ামের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
ক্যালসিয়াম সম্পূরক গ্রহণ করলে অ্যাসিডিটি বৃদ্ধি পায় অনেকের। পেটের সমস্যাও দেখা দেয়। ক্যালসিয়াম কার্বনেট ট্যাবলেট অনেক ক্ষেত্রে এসিড বৃদ্ধি করে। এ কারণে যাঁদের পাকস্থলীতে আলসার রয়েছে, তাঁদের জন্য এটা গ্রহণ করা অনুচিত, এসব রোগীর জন্য প্রয়োজন ক্যালসিয়াম সাইট্রেট।
ক্যালসিয়ামের কারণে হতে পারে কোষ্ঠকাঠিন্য। এর সঙ্গে আরো কিছু ওষুধের বিক্রিয়ায় এমনটি ঘটতে পারে। ক্যালসিয়ামের পাশাপাশি ম্যাগনেসিয়াম গ্রহণ করলে কোষ্ঠকাঠিন্যের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়। এই সমস্যার সমাধান করার জন্য অনেক কম্পানি ইদানীং ক্যালসিয়াম ট্যাবলেটে যোগ করছে ম্যাগনেসিয়াম। অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
দীর্ঘদিন ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’ কিংবা ‘এ’ গ্রহণ করার ফলে রক্তে ক্যালসিয়াম বেড়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম জমা হয় কিডনি ও রক্তনালিতে। এর ফলে কিডনিতে পাথর হতে পারে, রক্তনালী সংকুচিত হয়ে পরে।
লেখক : অ্যাডভাইজার স্পেশালিস্ট মেডিসিন (এন্ডোক্রাইনোলজি), সিএমএইচ, ঢাকা
চেম্বার : আল রাজি হাসপাতাল ফার্মগেট, ঢাকা