Home প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানসৌরশক্তি হতে পারে সমাধান

সৌরশক্তি হতে পারে সমাধান

Muktochinta Online
০ comments ১৫ views

চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে সৃষ্টি হয়েছে চরম অস্থিরতা। জ্বালানিসংকটে দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে নাজেহাল অবস্থা বিরাজ করছে। জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের জন্য জ্বালানি তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানো এখন সময়ের দাবি। এ ক্ষেত্রে সৌর বিদ্যুৎ হতে পারে আদর্শ বিকল্প।

বাড়ি, অফিস এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি পরিবহনেও সৌরবিদ্যুৎ কাজে লাগানো যেতে পারে।

বদলে গেছে সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি

দেড় থেকে দুই দশক আগে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন সৌরবিদ্যুৎ প্যাকেজ সরবরাহ করেছিল। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য বাধ্যতামূলক হওয়ায় অনেকেই স্থাপন করেছিল সৌরবিদ্যুৎ। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার ফলে সেসব সৌরবিদ্যুৎ সিস্টেমগুলোর উৎপাদনক্ষমতা ছিল খুবই কম।

ফলে সমাজে রয়ে গেছে এক প্রচলিত ধারণা, সৌরবিদ্যুৎ তেমন কাজের নয়।

বিগত কয়েক বছরে বদলে গেছে সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি। এখন একটি সাশ্রয়ী মূল্যের সোলার প্যানেল থেকে ৭০০ ওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। বাসা-অফিসে ব্যবহৃত এলইডি লাইটগুলো ১৫-৪৫ ওয়াটের হয়ে থাকে, সিলিং ফ্যানের বিদ্যুৎ চাহিদা ১০০-১২০ ওয়াট।

অর্থাৎ মাত্র একটি প্যানেল দিয়ে মেঘলা দিনেও দুটি লাইট ও একটি ফ্যান চালানো যায়। সৌরবিদ্যুৎ সেটআপের মূল্যও এখন আইপিএস বা জেনারেটরের চেয়ে খুব বেশি নয়।

ব্যবহারের আগে প্রস্তুতি জরুরি

সৌরবিদ্যুৎ সেটআপ করার সময় নতুন ক্রেতারা প্রথমেই প্রশ্ন করে, ‘আমার কয়টি প্যানেল লাগতে পারে?।’ এর বদলে প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘দৈনন্দিন কাজকর্মে কিভাবে আমি বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে পারি।’ সাধারণ ফ্যানের বদলে ব্রাশলেস ডিসি (বিএলডিসি) মোটর প্রযুক্তির ফ্যান ব্যবহার করলে প্রতি ফ্যানে প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যয় কমানো সম্ভব।

এর পাশাপাশি স্বল্প ওয়াটের এলইডি বাতি এবং সোলার হাইব্রিড এসি ব্যবহার করেও বিদ্যুৎ ব্যয় কমানো সম্ভব। উন্নতমানের বৈদ্যুতিক তার এবং সোলার সেটআপে মানসম্মত ডিভাইস ব্যবহার করে বিদ্যুৎ অপচয় কমানো যায়। এতেও বিদ্যুৎ চাহিদা অনেকটাই কমানো সম্ভব। এরপর হিসাব করতে হবে কত ওয়াট-আওয়ার ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ সেটআপ প্রয়োজন এবং সেটি চার্জ করতে কয়টি প্যানেল প্রয়োজন হতে পারে। ব্যয় কমানো আগে, এরপর উৎপাদনের হিসাব-নিকাশ।

বাসা বা অফিসের প্রতিটি ডিভাইসের তালিকা করে, প্রত্যেক ডিভাইসের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওয়াটের হিসাব করে এর সঙ্গে গুণ করতে হবে দৈনিক কত ঘণ্টা ব্যবহার করা হবে ওই সময়। এভাবেই পাওয়া যাবে কত ওয়াট-আওয়ারের সৌরবিদ্যুৎ সেটআপ স্থাপন করা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একটি বিএলডিসি ফ্যান (৩০ ওয়াট), মোট ৪০ ওয়াটের দুই-তিনটি এলইডি বাতি এবং ১০ ওয়াটের ইন্টারনেট রাউটার ব্যবহার করলে ২৪ ঘণ্টায় ৬২০ ওয়াট-আওয়ার বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হবে।

বিদ্যুৎ সংরক্ষণ মূল চ্যালেঞ্জ

সারা দিনের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জমিয়ে রাখা সবচেয়ে কঠিন কাজ। কয়েক বছর আগেও লেড-এসিড প্রযুক্তি ছাড়া অন্য কোনো ধরনের ব্যাটারি বাজারে সহজলভ্য ছিল না। এখনো স্বল্প বাজেটে সোলার সেটআপ করার জন্য লেড-এসিড ব্যাটারি জনপ্রিয়। এ ধরনের ব্যাটারির রয়েছে অনেক সীমাবদ্ধতা। লেড-এসিড ব্যাটারির আকৃতি অনেক বড়, ওজনও বেশি। প্রতিনিয়ত ৫০ শতাংশের বেশি ডিসচার্জ করা হলে এর ধারণক্ষমতা দ্রুত কমে যায়। ফলে দুই-তিন বছর পর পর লেড-এসিড ব্যাটারি পরিবর্তন করতে হয়, পাশাপাশি রয়েছে ব্যাটারির পানি রক্ষণাবেক্ষণের চাপ।

বেশির ভাগ সৌরবিদ্যুৎ সেটআপে এখন লিথিয়াম আয়রন ফসফেট প্রযুক্তির ব্যাটারি ব্যবহৃত হচ্ছে। দাম বেশি হলেও লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারিতে নেই লেড-এসিড ব্যাটরির সীমাবদ্ধতা। অল্প জায়গার মধ্যেই কয়েক হাজার ওয়াট-আওয়ার ধারণক্ষমতার সোলার সেটআপ করা যায়, চলে এক দশকেরও বেশি সময়। দ্রুত চার্জিং সুবিধা লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারির একটি বড় গুণ। এক-দেড় ঘণ্টার মধ্যেই ফুল চার্জ করা যায়। ফলে কয়েক ঘণ্টা রোদ পেলেই সিস্টেম চার্জ হয়ে যায়, সারা দিন রোদ ঝলমলে আবহাওয়ার প্রয়োজন হয় না।

সঠিক হার্ডওয়্যার নির্বাচন

খরচ বাঁচাতে কমদামি প্যানেল এবং ইনভার্টার কেনে অনেকে, কাঙ্ক্ষিত ব্যাকআপ থেকে রয়ে যায় বঞ্চিত। সোলার প্যানেল কেনার সময় অন্তত মনোক্রিস্টালাইন পিইআরসি প্যানেল কেনা উচিত, বাজেট থাকলে টপকন প্যানেল ব্যবহার করা যেতে পারে। টপকন প্রযুক্তির প্যানেলের মূল সুবিধা, এটি উচ্চ তাপমাত্রায়ও উৎপাদনক্ষমতা ধরে রাখে। দুই প্রযুক্তির প্যানেলের দামে তফাত ২০ থেকে ৩০ শতাংশ।

সোলার প্যানেলের বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে মজুদ করা এবং এসি কারেন্টে পরিণত করায় কাজ করে ইনভার্টার। যদি বাসায় মূল গ্রিডের বিদ্যুৎ সংযোগ থাকে, তাহলে সৌরবিদ্যুৎ এবং মূল লাইনের বিদ্যুৎ ব্যালান্স করায়ও কাজ করে এটি। ভারী লোড, যেমন—পানির মোটর, ফ্রিজ বা এসির জন্য রয়েছে বিশেষায়িত ইনভার্টার, তাই যাদের ভারী ও হালকা দুই ধরনের লোড প্রয়োজন, তাদের দুটি পৃথক ইনভার্টার ব্যবহার করতে হবে। সব ইনভার্টারের মধ্যে সৌর প্যানেলের আউটপুট শোধনের জন্য ব্যবহৃত এমপিপিটি (ম্যাক্সিমাম পাওয়ার পয়েন্ট ট্র্যাকিং) ডিভাইস থাকে না, সে ক্ষেত্রে আলাদা এমপিপিটিও কেনা প্রয়োজন। সঙ্গে অবশ্যই লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারি যোগ করা উচিত।

সৌরবিদ্যুৎ সেটআপে মানসম্মত মোটা তার ব্যবহার করা জরুরি। সোলার প্যানেল ও ব্যাটারির জন্য ১০ বা ১২ গেজের তামার তার ব্যবহার করতে হবে। অ্যালুমিনিয়াম তার ব্যবহার করা অনুচিত। পাশাপাশি খেয়াল রাখতে হবে যাতে সোলার প্যানেল ও ইনভার্টার/এমপিপিটির দূরত্ব খুব বেশি না হয়।

সম্ভাব্য খরচ

সৌর প্যানেল বা ইনভার্টারের মূল্য অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় সৌরবিদ্যুৎ সেটআপ কেনার ক্ষেত্রে মূল খরচ হবে ব্যাটারিতে। তাই কতটুকু ব্যাটারি প্রয়োজন সেটা জানা অত্যন্ত জরুরি। একক পরিবারের জন্য ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকার মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ সেটআপ করা সম্ভব, তবে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা খরচ করলে ফ্রিজ চালানোর মতো সেটআপ করা যাবে। এসিসহ পুরো বাড়ি চালনার জন্য চার লাখ থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

তবে যারা শুধু লোডশেডিংয়ের সময় ব্যবহারের জন্য সোলার সেটআপ খুঁজছে, তারা হাইব্রিড আইপিএস সিস্টেম কিনতে পারে। বর্তমানে ৭০০-১১০০ভিএ ক্যাপাসিটির আইপিএস ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে, এর সঙ্গে ১২-১৫ হাজার টাকার একটি সোলার প্যানেল যুক্ত করে সম্পূরক চার্জিং সিস্টেম তৈরি করা যেতে পারে। এতে ব্যাকআপ পাওয়া যাবে দুই থেকে তিন ঘণ্টা, চলবে দুই-তিনটি ফ্যান, তিন-ছয়টি লাইট ও ছোটখাটো ইলেকট্রনিকস সামগ্রী। ঘন ঘন লোডশেডিং হলে সোলার প্যানেল থেকেও আইপিএস চার্জ হবে।

বৈদ্যুতিক মোটরচালিত বাহন ব্যবহার

জ্বালানিসংকট মোকাবেলায় অনেকেই এখন বিদ্যুত্চালিত স্কুটার বা গাড়ি কেনায় উৎসাহিত হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে এ ধরনের বাহন চার্জ করা সম্ভব, তবে সে ক্ষেত্রে সেটআপের খরচ অনেক বেড়ে যাবে। বাসায় এসি, ফ্রিজ চালনার পাশাপাশি ইলেকট্রিক স্কুটার চার্জ করতে হলে অন্তত পাঁচ-সাত লাখ টাকার সেটআপ প্রয়োজন, সেডান বা এসইউভি চার্জিংয়ের জন্য বাস্তবসম্মত সেটআপ করা আরো অনেক ব্যয়বহুল। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে একদিন ইভি চার্জিং সক্ষম এমন সৌরবিদ্যুৎ সেটআপের মূল্যও নাগালের মধ্যে হাজির হবে।

You may also like

Leave a Comment