এএফসি নারী এশিয়ান কাপের ‘বি’ গ্রুপে নিজেদের শেষ ম্যাচে উজবেকিস্তানকে হারিয়ে শেষ আটে খেলার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে চায় বাংলাদেশ। স্বপ্নপূরণে আজ উজবেকদের মুখোমুখি হবে লাল-সবুজরা। পার্থের রেক্টাঙ্গুলার স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় বিকাল ৩টায় শুরু হবে ম্যাচটি। টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্বে এখনও জয়ের দেখা পায়নি বাংলাদেশ ও উজবেকিস্তান। দু’টি করে ম্যাচ খেলে দু’দলই হেরেছে। তাই গ্রুপের শেষ ম্যাচে যারা জিতবে তাদের তিন গ্রুপের সেরা তৃতীয় হয়ে পরের রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এ সুযোগটি হাতছাড়া করতে চাইছে না বাংলাদেশ দল। তাই উজবেকদের বিপক্ষে জয়ের লক্ষ্যে নিয়েই আজ মাঠে নামবে লাল-সবুজের মেয়েরা। গতকাল পার্থে ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি না বললেও আকার-ইঙ্গিতে এমনটাই জানান বাংলাদেশ অধিনায়ক আফিদা খন্দকার। অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের বনেদি শহর পার্থ। চারদিকে সুনসান নীরবতা, মাঝদুপুরেও পাখির কলতান স্পষ্ট শোনা যায়। শহরের ব্যস্ততার মাঝেও পার্থ রেক্টাঙ্গুলার স্টেডিয়ামের সামনে যেন অন্যরকম এক শান্ত পরিবেশ। প্রকৃতির এই নিস্তব্ধতা স্টেডিয়ামটিকে আলাদা সৌন্দর্য দিয়েছে। সেই নীরবতার মাঝেই ইতিহাসের একটি ভেন্যুতে নামতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দল। বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য এই ভেন্যুর একটি বিশেষ স্মৃতিও আছে। ২০১৫ সালে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে এখানে খেলেছিল জামাল ভূঁইয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ পুরুষ জাতীয় দল। সেই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৫-০ গোলে হেরেছিল বাংলাদেশ। প্রায় এক যুগ পর একই স্টেডিয়ামে নতুন ইতিহাস লেখার সম্ভাবনা নিয়ে মাঠে নামছেন আফিদা খন্দকাররা।
শনিবার পার্থে পৌঁছে হালকা হাঁটাহাঁটি করে সময় কাটিয়েছিল বাংলাদেশ দল। কাল ই অ্যান্ড ডি লিটিস স্টেডিয়ামে প্রায় দেড় ঘণ্টা অনুশীলনে ঘাম ঝরান ঋতুপর্ণা চাকমারা। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে কী কৌশলে নামবে দল, সেটিও বুঝিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের ইংলিশ প্রধান কোচ পিটার জেমস বাটলার। মুখে সরাসরি কেউ না বললেও আকার-ইঙ্গিতে স্পষ্ট উজবেকিস্তানকে হারানোর লক্ষ্য নিয়েই প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। এবারের নারী এশিয়ান কাপে প্রথমবার খেলছে বাংলাদেশের মেয়েরা। তাই লাল-সবুজদের অভিষেক আসরের প্রস্তুতিও হয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার মধ্যে। সিডনিতে ভালো স্টেডিয়াম ও মানসম্পন্ন মাঠে অনুশীলনের সুযোগ পেয়েছেন মারিয়া মান্ডারা। পার্থেও তারা একই সুবিধা পাচ্ছেন। অথচ দেশের বাস্তবতা ভিন্ন, ভালো মানের মাঠের অভাব এখনো বাংলাদেশের ফুটবলারদের বড় সমস্যা। বিশ্বকাপের ভেন্যুতে তাই শুধু একটি ম্যাচ নয়- পার্থে বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের সামনে রয়েছে নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর আরেকটি বড় মঞ্চ। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জয় পেলে এশিয়ান কাপে প্রথম জয়ের স্বাদ পাওয়ার পাশাপাশি কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্নও জাগতে পারে। প্রতিপক্ষ ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে অনেক এগিয়ে থাকলেও লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নামবে বাংলাদেশ। কাল সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ অধিনায়ক আফিদা খন্দকার বলেন, ‘আমি প্রথম দিন থেকেই বলে আসছি, আমাদের যদি দেশের মাঠগুলো ভালো থাকে, তাহলে আমরা আরও ভালো অনুশীলন করতে পারবো। আমাদের দেশে একটি ভালো মাঠ খুব প্রয়োজন।’ তিনি যোগ করেন,‘গ্রুপের শেষ ম্যাচে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে নিজেদের সেরাটাই মাঠে ঢেলে দিতে হবে। আশাকরছি আমরা তা পারবো।’
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ কোচ বাটলারকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল উজবেকদের বিপক্ষে জয়ের বিষয়ে কতটা সিরিয়াস তার দল। সরাসরি জবাব না দিয়ে তিনি বলেন,‘আমি মনে করি যেভাবে খেলার চেষ্টা করছি, সে বিষয়ে আমাদের ইতিবাচক থাকতে হবে। মেয়েরা ভুল করবে, কিন্তু তারা নতুন কিছু করার চেষ্টা করবে- যতক্ষণ তারা গেমপ্ল্যান অনুযায়ী খেলছে এবং আমাদের কাজের ধরণ বা নিয়মগুলো মেনে চলছে। আমাদের মিতব্যয়ী হতে হবে এবং দৃষ্টিভঙ্গিতে বাস্তববাদী থাকতে হবে। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো হার বা জিত যাই হোক না কেন তারা যেভাবে অংশগ্রহণ করছে, কঠোর পরিশ্রম করছে এবং নিজেদের সামলে নিচ্ছে, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ নিজ দলের মেয়েদের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট এই ইংলিশ কোচ। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই মেয়েরা যেভাবে কাজগুলো করছে তা অবশ্যই সম্মানের যোগ্য। তারা একটি চমৎকার টুর্নামেন্ট কাটিয়েছে। এই টুর্নামেন্ট থেকে আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো মেয়েদের পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে উৎসাহিত করা। তারা এখান থেকে যা শিখবে, দেশে ফিরে তা কাজে লাগাতে পারবে- এটাই ভবিষ্যতে তাদের অনেক দূর নিয়ে যাবে।’
উজবেকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ দল কেমন খেলবে? এ প্রশ্নে বাটলারের উত্তর,‘আগামীকাল (আজ) আমরা নিজেদের স্টাইলের খেলা খেলতে মাঠে নামবো। যখন প্রয়োজন হবে তখন আমরা রক্ষণ সামলাব, তবে আমরা প্ল্রেসিং এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার দিকেও নজর দেব।’ উজবেকদের বিপক্ষে দলের ভাগ্য পরিবর্তনের ব্যাপারে আশাবাদী বাটলার, ‘আশা করি আমরা যে প্রস্তুতি নিয়েছি তা আমাদের ভালো অবস্থানে রাখবে। প্রতিটি দিনই শেখার দিন এবং প্রতিটি দিনই এই দলের জন্য শেখার প্রক্রিয়ার অংশ। আমরা পরবর্তী ম্যাচে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে মাঠে নামব। একইসঙ্গে আমরা জানি এটি সহজ হবে না।’ ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের চেয়ে ৬৩ ধাপ এগিয়ে উজবেকিস্তান। র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ যেখানে ১১২তম স্থানে রয়েছে সেখানে উজবেকিস্তানের অবস্থান ৪৯। তারপরও প্রতিপক্ষ যতই শক্তিশালী হোক না কেন, এই ম্যাচের জন্য বাংলাদেশ দল সেরাটা দিয়ে লড়াই করবে বলে জানান বাটলার,‘এই ম্যাচটি অনেকটা ‘ইঁদুর-বেড়াল’ লড়াইয়ের মতো হতে পারে। উভয় দলই হয়তো শুরুতে কিছুটা সতর্কভাবে এগোবে। কিন্তু আমরা এমন দল নই যারা রক্ষণাত্মকভাবে বসে থাকতে পছন্দ করি-এটি আমাদের ধরণ নয়। আমরা আক্রমণাত্মক মেজাজে খেলতেই পছন্দ করি।’ শারীরিক শক্তির দিক থেকে উজবেকিস্তান দল কিছুটা এগিয়ে থাকলেও গতি ও স্কিলে বাংলাদেশের মেয়েরা কম নয়। তবে এখন মাঠের লড়াইয়ে বাংলাদেশকে তার প্রমাণ দিতে হবে।