হাজারো নোটিফিকেশনের যন্ত্রণা, সাবস্ক্রিপশন কেনার চাপ ও স্ক্রিন আসক্তি থেকে মুক্তি পেতে পুরনো বা ‘রেট্রো’ প্রযুক্তিতে ঝুঁকছে অনেকে। ব্যবহারকারীদের মতে—পুরনো গেম, কনটেন্ট বা সফটওয়্যারের মানও বেশ ভালো। রেট্রো টেকের ধরন ও জনপ্রিয়তা নিয়ে লিখেছেন এস এম তাহমিদওল্ড ইজ গোল্ড—বহুদিন এ প্রবাদবাক্য প্রযুক্তিক্ষেত্রে ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। গত দুই বছরে অনেকটা বদলেছে প্রযুক্তিবিশ্ব। জেনারেশন জেড শুরু করেছে পুরনো প্রযুক্তি ব্যবহার। এটিকে কেউ কেউ ‘ফ্যাড’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
টিকটক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু লাইক পাওয়ার আশায় ‘অ্যাসথেটিক’ পোস্ট তৈরির জন্য এসব ডিভাইস কিনছে জেন জি—এমনটাও উঠেছে গুঞ্জন।
রেট্রো প্রযুক্তি কেন জনপ্রিয়
স্মার্টফোন ও ট্যাবলেট এখন ক্যামেরা, মিউজিক ও ভিডিও প্লেয়ার, গেমিং ডিভাইস, লেখালেখির যন্ত্র, ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যম। কিছু ব্যবহারকারীর মতে, এক ডিভাইসে সব ফিচার থাকায় কোনো ফিচারই ঠিকমতো কাজে লাগে না। তাদের দাবি, আলাদা মিউজিক প্লেয়ার ব্যবহার করলে গান শোনায় আগ্রহ বাড়ে, লেখালেখির যন্ত্রে ইন্টারনেট না থাকলে নোটিফিকেশনের প্রভাবে মনোযোগ নষ্ট হয় না।
ডিজিটাল ক্যামেরা কাজে লাগিয়ে দ্রুত ছবি তোলা যায়, ছবির মধ্যে মাধুর্য বেশি থাকে। পুরনো গেমগুলোর ডিজাইন সহজবোধ্য হওয়ায় খেলে মজা পাওয়া যায় বেশি, এমনটাই বলে তারা। ডিভাইসগুলোতে অ্যাপ ও হাজারো নোটিফিকেশনের অনুপস্থিতিই এই ব্যবহারকারীদের কাছে মূল আকর্ষণ।
ফিরেছে পুরনো প্লেয়ার
বিগত বছরগুলোতে মিউজিক বা ‘এমপি৩’ প্লেয়ারের বিক্রি বেড়েছে।
স্ট্রিমিংয়ের যুগেও বিশ্বে লাখ লাখ ব্যবহারকারী ডাউনলোড করে প্লেয়ারে লোড করে গান শুনছে। এই ব্যবহারকারীদের ভাষ্য, স্ট্রিমিংয়ের তুলনায় সিডি থেকে কপি করা গান বা হাই-ফিডেলিটি ট্র্যাক ডাউনলোড করে শুনলে উচ্চমানের সাউন্ড পাওয়া যায়। তুলনামূলক নতুন সব ব্র্যান্ড যেমন—ফিও বা হিবি-এর পাশাপাশি সনিও এখনো মিউজিক প্লেয়ার তৈরি করছে। এসব প্লেয়ারের দামও কম নয়, তিন হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে বহনযোগ্য ভিডিও প্লেয়ার এমন জনপ্রিয়তা পায়নি।
সিডি, ক্যাসেট ও ভিনাইল রেকর্ড প্লেয়ারের কাটতিও নতুন করে বেড়েছে, তবে সেগুলো অতটা জনপ্রিয় নয়। এ ধরনের পুরনো ফরম্যাটের প্লেয়ার বুড়োরাই বেশি কিনে থাকে।
জনপ্রিয় ই-ইংক ডিভাইস
বই পড়ার জন্য ই-ইংক ডিভাইসের জনপ্রিয়তা প্রায় এক যুগের। তবে হাতে লিখে নোট নেওয়ার জন্য ই-ইংক ডিভাইসের জনপ্রিয়তা খুব বেশিদিনের নয়। ট্যাবলেটের বদলে ই-ইংক ব্যবহারের বেশ কয়েকটি সুবিধা আছে। এর মধ্যে ব্যাটারি লাইফ, অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ ও সফটওয়্যার ফিচার না থাকা এবং চোখের জন্য আরামদায়ক ডিসপ্লে ফিচারগুলো প্রধানতম। বুক্স, কিনডল বা রিমারকেবল ব্র্যান্ডের ডিভাইসগুলোর দামও বেশ চড়া, ৩০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ঠিক পুরনো প্রযুক্তির না হলেও ডিজিটাল ডিটক্স বা সাদা-কালো কাগজে লেখালেখি করার ‘রেট্রো’ অভিজ্ঞতার জন্যই এসব ডিভাইস জনপ্রিয়।
ডিজিটাল ক্যামেরার কদর বেড়েছে
ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের কল্যাণে তরুণ প্রজন্মের কাছে এখন পুরনো ধাঁচের ছবি ও ভিডিও জনপ্রিয়। আধুনিক স্মার্টফোনের ছবি অতিরিক্ত শার্প আর কালারফুল, যা দেখতে প্রায় অবাস্তব মনে হয়। পাশাপাশি অ্যানড্রয়েড বা আইফোনের ক্যামেরার অ্যালগরিদমও ছবি এবং ভিডিওর কালার ও শার্পনেস বদলে দেয়, ফলে বাস্তবসম্মত দৃশ্য ধারণ করা বেশ কঠিন। সব মিলিয়ে পুরনো প্রযুক্তির সিসিডি বা সিএমওএস সেন্সরযুক্ত পয়েন্ট অ্যান্ড শুট (পিএনএস) ক্যামেরার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। বিশ্ববাজারে ব্যবহৃত ও রিফারবিশড ক্যামেরার দাম বেড়েছে প্রায় দেড় থেকে দুই গুণ।
ইমুলেশন কনসোলের বাজারমাত
২০-৩০ বছরের পুরনো ভিডিও গেমগুলোর ডিজাইন বেশ সহজ-সরল। এখন গেমের মধ্যে হাজারো ধরনের নতুন গেমপ্লে সিস্টেম থাকলেও গেমারদের দাবি, পুরনো গেমের মজা নতুন গেমে পাওয়া যায় না। এ বক্তব্য অনেকে নস্টালজিয়া বলে উড়িয়ে দিলেও, কিশোর-তরুণদের মধ্যে তাদের জন্মেরও আগে প্রকাশিত গেমের প্রতি ভালোবাসা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এসব গেম খেলার জন্য পুরনো কনসোলের পাশাপাশি ইমুলেশনভিত্তিক নতুন ডিভাইসও বাজারে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ইমুলেটর এমন একটি সফটওয়্যার, যার মাধ্যমে নতুন ডিভাইসে পুরনো কনসোলের গেম খেলা যায়। অ্যানবারনিক ও রেট্রেয়েডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক ইমুলেটর কনসোল বাজারে আনছে, সেসব বিক্রিও হচ্ছে দেদার। পুরনো কনসোল রিফারবিশ করার বাজারও বেশ চালু। নিনটেন্ডো এবং সনির পুরনো প্রজন্মের গেম কনসোলগুলোর দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
রেট্রো প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা
পুরনো ক্যামেরায় আধুনিক মানের ছবি পাওয়া যায় না। পাইরেসি ছাড়া গানের ফাইল জোগাড় করাও বেশ কঠিন। রেট্রো গেমিংয়ের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, গেমের জন্য পাইরেসি সাইটকেই ভরসা করছে ব্যবহারকারীরা। পুরনো বা পুরনো ধাঁচের রেট্রো ডিভাইস থেকে ফাইল ট্রান্সফার করাও বড় চ্যালেঞ্জ। বাস্তবতা হচ্ছে, রেট্রো ডিভাইস ব্যবহারের জন্য কিছু ঝক্কি পোহাতেই হবে। পাইরেসি ছাড়া কনটেন্ট জোগাড় করাও বেশ কঠিন।