৫ই আগস্ট ২০২৪, দিনটি ছিল অগ্নিঝরা রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের এক নীরব সাক্ষী। এরপরই দেশের ক্রিকেটের মসনদ নিয়ে শুরু হয় এক নজিরবিহীন নাটক। পরিবর্তনের প্রবল হাওয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) অন্দরে যে চরম অস্থিরতা শুরু হয়েছিল, তার চূড়ান্ত পরিণতি আসলে কী হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর ধোঁয়াশা। অল্প সময়ের ব্যবধানে হোম অব ক্রিকেটের ক্ষমতাধর চেয়ারে বসেছেন তিনজন ভিন্ন মুখ। আর এই তিনজনই বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক। দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে চলা নাজমুল হাসান পাপনের সাম্রাজ্যের পতনের পর শুরু হয় নতুন যুগের পথচলা। বিসিবি’র ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো সাবেক অধিনায়ক হিসেবে ফারুক আহমেদ সভাপতির দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। তবে সংস্কারের কঠিন পথে হাঁটা এই সাবেক অধিনায়কের মেয়াদ খুব একটা দীর্ঘ হয়নি। মাত্র ৮ মাসে অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর পরিচালকদের অনাস্থার মুখে তাকে বাধ্য হয়ে বিদায় নিতে হয়। এরপর বিসিবি’র দায়িত্ব পান আরেক সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল। তার অধীনে হওয়া বিতর্কিত নির্বাচন দেশের ক্রিকেটকে গভীর অনিশ্চয়তার এক অন্ধকূপে ঠেলে দেয়। শেষ পর্যন্ত জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) গঠিত তদন্ত কমিটির অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে বোর্ড ভেঙে দেয়া হয়। এরপরই দৃশ্যপটে আসেন আরেক নায়ক। দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে কনিষ্ঠ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সাবেক অধিনায়ক ও দেশসেরা ওপেনার তামিম ইকবাল। ফারুক থেকে শুরু করে বুলবুল এবং সবশেষ তামিম- ধারাবাহিকভাবে তিনজন সাবেক অধিনায়কের বোর্ডের শীর্ষ পদে বসার এই বিষয়টিকে রূপক অর্থে ‘ক্যাপ্টেনস কার্ড’ বলাই যায়। বিসিবি’র এই পালাবদলের প্রতিটি বাঁক যেন হার মানায় কোনো টানটান উত্তেজনার রোমাঞ্চকর উপন্যাসকেও। এখন বড় প্রশ্ন হলো, ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ পথচলা ঠিক কোন দিকে এগোবে। খুব কাছ থেকে ক্রিকেটের এই উত্থান-পতন দেখেছেন ক্রিকইনফোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি মোহাম্মদ ইসাম। দৈনিক মানবজমিনকে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না ফারুক বা বুলবুলের কাছ থেকে তামিমের কিছু শেখার আছে। কারণ তিনি সেই পথে হাঁটবেন না, যে পথে আগের দুজন হেঁটেছেন। আমরা জানি ফারুক ও বুলবুল যখন ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি ছিলেন, তখন তারা সম্পূর্ণভাবে সাবেক স্পোর্টস অ্যাডভাইজারের (আসিফ মাহমুদ) কথায় চলতেন। এমনকি দু’জনই এই পদের মোহে নিজেদের চরিত্র পর্যন্ত বদলে ফেলেছিলেন। এটাও সত্যি তামিমের ওপরও সরকারের চাপ থাকবে, কারণ বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডে রাজনীতির প্রভাব থাকবেই।’ ফারুকের করুণ বিদায়ের পর গল্পের দ্বিতীয় অধ্যায়ে বুলবুল অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান হয়ে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় সভাপতি হন। তবে এই পদে তিনি বেশি দিন থাকতে পারেননি। ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও জালিয়াতির অভিযোগে সরকারি তদন্তে অকাট্য প্রমাণ মেলার পর গত ৭ই এপ্রিল, এনএসসি এক ঝটকায় নির্বাচিত পর্ষদ ভেঙে দেয়। সরকার মনোনীত ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটির প্রধান হন তামিম। আগামী তিন মাসের মধ্যে বিসিবি’র জটিল নির্বাচন আয়োজনই এখন এই কমিটির মূল চ্যালেঞ্জ। তবে তার কমিটিতে তিন মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতার ছেলে এবং এক সংসদ সদস্যের স্ত্রীর অন্তর্ভূক্তি নিয়ে চারদিকে বিস্তর সমালোচনা চলছে। এ বিষয়ে ইসাম বলেন, ‘বাস্তব কথা হলো এই উপমহাদেশে রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া ক্রিকেট চালানো বড়ই কঠিন। নাজমুল হাসান পাপন বা লোটাস কামালের সময়ও রাজনৈতিক প্রভাব ছিল, কিন্তু তারা রাজনৈতিক এবং ক্রিকেটীয়- উভয় দিকই দারুণভাবে সামলে ক্রিকেটের উন্নতিও করেছেন। বর্তমান অ্যাডহক কমিটিতে যারা আছেন, তারা সবাই রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য। তাদের অনেক নতুন আইডিয়া আছে। আমাদের উচিত তাদের অন্তত একটি সুযোগ দেওয়া। সাবের হোসেন চৌধুরী যখন ১৯৯৬ টেস্ট স্ট্যাটাস চেয়েছিলেন, তখন অনেকেই হাসাহাসি করেছিল, কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই তা অর্জিত হয়েছিল।’ বুলবুলের মেয়াদের নির্বাচনী অনিয়মের প্রতিবাদে ঢাকার ৫০টি ক্লাব লীগ বর্জনের ঘোষণা দিলে ঘরোয়া ক্রিকেটে এক ভয়াবহ স্থবিরতা নেমে আসে। সেই চরম সংকটে ক্লাবগুলোর সঙ্গে একাট্টা ছিলেন তামিম নিজেও। তবে সভাপতি হওয়ার পর এই জটিলতা নিরসনে তামিম নিজেই ক্লাব মালিকদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসেছেন। তার হস্তক্ষেপে দ্রুতই মাঠে গড়াচ্ছে ঘরোয়া ক্রিকেট। পাশাপাশি তার সামনে পাহাড়সম বড় চ্যালেঞ্জ হলো ফারুক ও বুলবুলের সময় আন্তর্জাতিকভাবে সৃষ্ট ভাবমূর্তি সংকট কাটানো। ইসাম বলেন, ‘বারবার সভাপতি পরিবর্তনে আন্তর্জাতিকভাবে অনেক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাছেও বিষয়টি মোটেও ভালোভাবে দেখা হচ্ছে না। তবে তামিমের একটি বড় সুবিধা হলো বিশ্বজুড়ে তার তারকাখ্যাতি ও পরিচিতি। বড় বড় আন্তর্জাতিক মিডিয়া এখন তামিমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাচ্ছে। তামিম যদি আইসিসি এবং বিসিসিআইয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন, তবে সেটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য অনেক ভালো হবে।’ অতীতের সব অমানিশা কাটিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন নতুন পথে হাঁটার স্বপ্ন দেখছে। তবে শেষ প্রশ্নটি রয়েই যায় ফারুক ও বুলবুল যেখানে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের বিদায় ছিল লজ্জা ও হতাশার, তামিম কি সেখানে পারবেন? ইসামের কণ্ঠে বিশ্বাস, ‘তারা যা করতে পারেননি, তামিম হয়তো সেটি পারবেন। কারণ তিনি শুধু একজন ভালো ক্রিকেটারই নন, একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন। মাঠের ভেতরের এবং বাইরের উভয় পরিবেশ সম্পর্কেই তার চমৎকার ধারণা আছে। তাই আমি প্রবলভাবে আশাবাদী যে তামিমের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ক্রিকেট আরও এগিয়ে যাবে।’
ফারুক, বুলবুল তামিম- এরপর!
বিসিবি সভাপতি পদে ‘ক্যাপ্টেনস কার্ড’
১৫
previous post