বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে মাঠ থেকে রাজসিক বিদায় নেয়ার ঘটনা বিরল। দীর্ঘদিনের আক্ষেপ ঘুচিয়ে গতকাল মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে রচিত হলো তেমনই এক অভাবনীয় মুহূর্ত। বাংলাদেশ বনাম নিউজিল্যান্ডের দ্বিতীয় ওয়ানডে ম্যাচের আগে জাতীয় দলের পেসার রুবেল হোসেনকে দেয়া হলো আবেগঘন সংবর্ধনা। ২০২১ এর পয়লা এপ্রিল নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেই দেশের হয়ে সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিলেন তিনি। এই পেসারের বিদায়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বর্তমান সভাপতি তামিম ইকবাল এই বিশেষ আয়োজনের নেপথ্যে ছিলেন। এমন দৃশ্য দেখে সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন আবেগাপ্লুত। তিনি বলেন, ‘খেলতে খেলতে বিদায় নেওয়াটাই সবচেয়ে ভালো।
মাঠ থেকে বিদায় নিতে পারাটা একজন ক্রিকেটারের জন্য অবশ্যই ভালো লাগার বিষয়। তবে সবচেয়ে সার্থক বিদায় হলো যখন কেউ প্রতিযোগিতামূলক খেলার মধ্যে থেকে অবসর নেয়। খেলার মাঠ থেকে বিদায় নেয়ার এই সংস্কৃতিটা চালু হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’ বাশারের এই আক্ষেপ অমূলক নয়। কারণ, দেশের ক্রিকেটের অন্যতম সেরা তারকা হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজে এমন বিদায় পাননি। রুবেলের এই সম্মাননা তাই দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আগামী প্রজন্মের সব তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য বিশাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। বিসিবি’র বর্তমান সভাপতি তামিম নিজেও আনুষ্ঠানিক বিদায়ের সুযোগ পাননি। আকরাম খান কিংবা মিনহাজুল আবেদীন নান্নুর মতো কিংবদন্তিরা নীরবেই বিদায় নিয়েছিলেন। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ বাদে মাশরাফি বিন মুর্তজা বা মুশফিকুর রহীমের মতো শীর্ষ ক্রিকেট তারকারা রাজসিক বিদায়ের স্বাদ পাননি। তাই রুবেলের সম্মাননা দেশের ক্রিকেটে সত্যিই এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। গতকাল বিদায়ী অনুষ্ঠানে ছেলে আয়ানকে নিয়ে মাঠে আসেন এই পেসার। দুই দলের খেলোয়াড় এবং বোর্ড কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তাকে একটি বিশেষ ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
সতীর্থদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি প্রেসবক্সেও আসেন। সেখানে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের সময় লাজুক হাসিতে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি তো কথা ভালো বলতে পারি না।’ ক্যারিয়ারের বড় একটা সময় ক্যামেরার ফ্ল্যাশ থেকে নিজেকে আড়ালে রাখতেই পছন্দ করতেন তিনি। দলের কঠিন সময়ে বল হাতে জ্বলে উঠলেও প্রচারের আলোয় আসা তার স্বভাববিরুদ্ধ ছিল। সেই মানুষটিই গতকাল শেরেবাংলার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে সব মিলিয়ে ১৫৯ ম্যাচ খেলেছেন এই গতির তারকা। টেস্ট, ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে তার ঝুলিতে রয়েছে ১৯৩টি মূল্যবান উইকেট। অভিষেক ম্যাচেই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চার উইকেট নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। তবে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি এসেছিল বিশ্বকাপের মঞ্চে। অ্যাডিলেডের মাঠে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পরপর দুই বলে দুই উইকেট নিয়ে দেশকে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে তোলার মূল রূপকার ছিলেন তিনি।
সতীর্থ তাসকিন আহমেদ গতকাল সেই ঐতিহাসিক স্মৃতির কথাই বারবার রোমন্থন করছিলেন। লাসিথ মালিঙ্গার মতো অদ্ভুত বোলিং অ্যাকশনের কারণে তাকে অনেকেই ‘বাংলাদেশের মালিঙ্গা’ বলে ডাকতেন। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকসহ ছয় উইকেট নেয়ার অসামান্য কীর্তিও রয়েছে তার নামের পাশে। গতকাল আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি সোজা চলে যান শেরেবাংলার ২২ গজের কাছে। পরম মমতায় ছুঁয়ে দেখেন পিচ। ঠিক যেন শচীন টেন্ডুলকারের সেই বিখ্যাত বিদায়বেলার প্রতিচ্ছবি। সাবেক দলনেতা বাশার মনে করেন, দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এমন সংস্কৃতি নিয়মিত হওয়া প্রয়োজন। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, তাদের সময়ে এমন রীতির প্রচলন একেবারেই ছিল না।
মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ কিংবা আব্দুর রাজ্জাক, শাহরিয়ার নাফীসের মতো কয়েকজন বাদে বেশিরভাগ তারকাই এমন সম্মান পাননি। এমনকি খালেদ মাসুদ পাইলটের মতো নির্ভরতার প্রতীকও অভিমানে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। এই হতাশার চিত্র দেশের ক্রিকেটে নিয়মিত ঘটনা। তাসকিন কিংবা মোস্তাফিজুর রহমানের মতো তরুণ পেসারদের আগমনে রুবেল ধীরে ধীরে মূল একাদশ থেকে ছিটকে পড়েন। অনেক সময় ভালো পারফর্ম করেও তাকে টিম কম্বিনেশনের কারণে ডাগআউটে বসে থাকতে হয়েছে। এরপরও যখনই দলের ব্রেক থ্রু প্রয়োজন হয়েছে, অধিনায়কের পরম আস্থার প্রতীক হিসেবে তিনি বল হাতে জ্বলে উঠেছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বিদায় নিলেও ঘরোয়া লীগে নিয়মিত দেখা যাবে তাকে। তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের এই আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। বাশার যেমনটা বলেছিলেন, খেলোয়াড়দের মাঠ থেকে বিদায় নেয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। রুবেলের এই বিদায়ী মুহূর্তটি প্রমাণ করে যে, সঠিক সম্মান পেলে একজন ক্রিকেটারের অর্জনগুলো মহিমান্বিত হয়।