Home 2nd Featuredএত জ্বালানি যায় কোথায়?

এত জ্বালানি যায় কোথায়?

পেট্রোল-অকটেনের দাম নিয়ে জামায়াতের ‘সস্তা রাজনীতি’ :: ভারতের এক রুপি বাংলাদেশের ১.৩৩ টাকা; গতকাল দিল্লিতে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হয়েছে ৯৩.৮৭ রুপি দরে যা বাংলাদেশের মুদ্রায় ১২৪.৮৭ টাকা। প্রতি লিটার পেট্রোল বিক্রি হয়েছে ১০২.৬১ রুপি দরে যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩৬.৩৯ টাকা। অথচ বাংলাদেশের ডিজেলের নতুন দাম ১১৫ টাকা; পেট্রোলের নতুন দাম ১৩৫ টাকা

Muktochinta Online
০ comments views

অবশেষে জ্বালানির দাম সমন্বয় করল সরকার। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ইরান হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দেয়। এতে প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহে। বিশ্ববাজারে দামও বাড়ে জ্বালানি তেলের। একপর্যায়ে অপরিশোধিত তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা হলেও কেউ বলতে পারছে না কবে শেষ হচ্ছে এ যুদ্ধ। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে ভারত জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে। শ্রীলঙ্কায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। ভারতের বাজার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গতকাল দিল্লিতে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হয়েছে ৯৩.৮৭ রুপি দরে যা বাংলাদেশের মুদ্রায় ১২৪.৮৭ টাকা (এক রুপি=১.৩৩ টাকা)। প্রতি লিটার পেট্রোল বিক্রি হয়েছে ১০২.৬১ রুপি দরে যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩৬.৩৯ টাকা। অথচ বাংলাদেশের ডিজেলের নতুন দাম ১১৫ টাকা; পেট্রোলের নতুন দাম ১৩৫ টাকা।

কিন্তু নতুন সরকার এত দিন জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করেনি। ভারতে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ থেকে সে দেশে জ্বালানি পাচার হচ্ছিল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করেছে সরকার। তবে পেট্রোল, অকটেনের দাম বাড়ানো হলেও কৃষি সেচের কথা মাথায় রেখে ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছে নামেমাত্র। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকার দাম বাড়িয়েছে; অথচ জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াত বাস্তবতা না বোঝার ভান করে সস্তা বাহবা নিতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ করছে। দলটির আমির জ্বালানির দাম বাড়ানোর বিরুদ্ধে এমন সব বক্তব্য দিচ্ছেন তিনি যেন বৈশ্বিক সংকট সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম সমন্বয় করা ছাড়া সরকারের গতন্তর ছিল না। জ্বালানি পাচার ঠেকাতে আশপাশের জ্বালানির দামের সঙ্গে সমম্বয় করা উচিত। পাশাপাশি জ্বালানির সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের দামও সমন্বয় থাকা উচিত। অতি প্রয়োজনীয় এসব পণ্যে ভর্তুকি না দিয়ে বৈশ্বিক দামের সঙ্গে সঙ্গতি রাখা হলে এক দিনে পাচার ও কালোবাজারি কমবে; অন্যদিকে ভোক্তারা খরচে সাশ্রয়ী হবেন। বৈশ্বিক এ সংসট মোকাবিলায় সরকারের পাশে বিরোধী দলের থাকা উচিত। কিন্তু ভোক্তাদের বাস্তবতা না বুঝিয়ে বিরোধী রাজনীতির নামে জামায়াত-এনসিপি মানুষকে উসকে দিচ্ছে। জামায়াতের নেতাদের এমন সস্তা বাহবা পাওয়ার রাজনীতি দায়িত্বশীলতার পর্যায়ে পড়ে না। তবে সিলেট গ্যাসক্ষেত্রের ১০ নম্বর কূপ খনন করে প্রথম স্তরে যে তেলের সন্ধান পাওয়া গেছে; পরীক্ষামূলকভাবে প্রতি ঘণ্টায় ৩৫ ব্যারেল (১৫৯ লিটার) তেলের প্রবাহ পাওয়া গেছে। সরকারের দায়িত্বশীলরা আগামীতে জ্বালানির চাহিদার কথা বিবেচনা করে এখনই সেটি উত্তোলনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে পারে।
একাধিক মন্ত্রী জানিয়েছেন এবং গোয়েন্দা তথ্য বলছে, বৈশ্বিক সংকট পরিস্থিতিতে দেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তেল মজুদের কারণে পাম্পগুলোতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে একদিকে, অন্যদিকে ভারতে পাচার করা হচ্ছে। আবার রাজধানীতে তেলপাম্পগুলোতে শত শত গাড়ি চালকের লাইন দেখিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করছেন জামায়াত ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী-লীগের নেতাকর্মীরা বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। ‘প্যানিক বায়িং’ ও মজুদপ্রবণতার কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে।

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বর্তমানে ভর্তুকি, ঋণ ও দুর্নীতির গভীর চক্রে আটকে পড়েছে। অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উচ্চ ব্যয়, আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি, ডলারের সংকট, ভর্তুকির চাপ এবং দুর্বল সুশাসনের কারণে খাতটি আর্থিক ও কাঠামোগতভাবে মারাত্মক চাপে রয়েছে। যার বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হচ্ছে। জনগণের দুর্ভোগ কমাতে সরকার প্রতিদিন জ্বালানি তেলে ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। দাম বৃদ্ধি করেও তা আবারো ভর্তুকি দিতে হবে।

জানতে চাইলে পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি নাজমুল হক বলেন, সরকার যে হারে তেল দিচ্ছেÑ তা আগের চাহিদা অনুযায়ী। কিন্তু এখন গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে। ফলে এক দিনের তেল কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেক পাম্প নিয়মিত তেল পাচ্ছে না। সে কারণে আমাদের চাপ পড়ছে।

জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ে সরকারি সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে জামায়াত। দলটির মতে, এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন করে দুর্ভোগ ডেকে আনবে এবং এটি তাদের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দেবে। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এ উদ্বেগ ও প্রতিবাদে বলেন, এ ধরনের খাতওয়ারি মূল্যবৃদ্ধি দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরকারের এই গণবিরোধী সিদ্ধান্তে আমি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং প্রতিবাদ জানাচ্ছি। জামায়াতের এমন বিবৃতি যেন ‘অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ হয় না’ প্রবাদের বিপরীত। গোটা বিশ্বে জ্বালানি সংকটে পণ্যটির দাম হুহু করে বাড়ছে। কিন্তু উট পাখির মতো বালুতে মুখ লুকিয়ে শুধু বিরোধিতার জন্য জ্বালানি ইস্যুতে মানুষকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার রগরগা রাজনীতি করছে। ভোক্তাদের সরকারের বিরুদ্ধে উসকাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করেছে সরকার। নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী ডিজেল প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বেড়ে ১১৫ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা ও প্রতি লিটারে ২০ টাকা বেড়ে অকটেন ১৪০ টাকা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ১৯ এপ্রিল রাত ১২টার পর থেকে কার্যকর করা হয়েছে। এর আগে আমদানি ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকটের মধ্যেও এপ্রিল মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। আগে যেভাবে জ্বালানি তেল পাম্পগুলোতে দেয়া হয়েছিল বর্তমান সরকারের আমলে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। তবে এসব তেল কোথায় যাচ্ছে তা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ক্ষতিয়ে দেয়া উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি বিভাগ থেকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানকে পাঠানো অফিস আদেশে জানানো হয়, ভোক্তা পর্যায়ে ডিজেলের বর্তমান মূল্য প্রতি লিটার ১০০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা ও কেরোসিন ১১২ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এদিকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের বাজারে দাম নির্ধারণ করায় সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতি। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করলে বাংলাদেশে ডিজেলের দাম ২০০ টাকা লিটার করা উচিত ছিল। কারণ করোনা সময় আওয়ামী লীগ সরকার ডিজেলের দাম বৃদ্ধি করে ১১৪ টাকা করেছিল। এ সরকার ডিজিলে মাত্র ১১৫ টাকা করেছে। যা এক টাকা বৃদ্ধি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি চাহিদা তৈরি হয়েছে। অথচ সরবরাহ এতদিন দেয়া হচ্ছিল গত বছরের গড় হিসেবে। ফলে বাড়তি চাহিদা পূরণ না হওয়ায় বাজারে সংকট তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে এখন জেলা প্রশাসনের সহায়তায় পাম্পভিত্তিক নতুন বরাদ্দ নির্ধারণ করা হচ্ছে, যাতে প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। এদিকে রাজধানীর তেল পাম্পগুলোতে শত শত গাড়িচালকের লাইন দেখিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করছেন জামায়াত ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। তবে দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, দাম বৃদ্ধির ফলে চলতি সপ্তাহের মধ্যে পাম্পগুলোতে তেলের জন্য আর লাইন ধরে থাকতে হবে না। স্বাভাবিকভাবে বছরে চাহিদা ৪ থেকে ৫ শতাংশ বাড়ে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত কেনাকাটার কারণে এবার চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ বাড়িয়ে বাজার স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

ভারতে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েই চলছে। গত শনিবার পেট্রোল ও ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে বেড়েছে ৮০ পয়সা। এ নিয়ে গত ১২ দিনে প্রতি লিটারে বেড়েছে সাত রুপি ২০ পয়সা। দিল্লিতে গতকাল প্রতি লিটার পেট্রোল বিক্রি হয়েছে ১০১ রুপি ৮১ পয়সায়। গতকাল বিক্রি হচ্ছে ১০২ রুপি ৬১ পয়সায় (১০০ রুপি বাংলাদেশের প্রায় ১৩৩ টাকা)। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৯৩ রুপি সাত পয়সা থেকে বেড়ে ৯৩ রুপি ৮৭ পয়সা হয়েছে বলে রাজ্যের খুচরা জ্বালানি বিক্রেতাদের মূল্যতালিকা। জ্বালানি তেলের দামের সমন্বয় হার সংশোধনে সাড়ে চার মাসের দীর্ঘ বিরতির পর গত ২২ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ১০ বার দাম বেড়েছে। ভারতীয় তেল শোধনাগারগুলো ইরান থেকে কেনা জ্বালানি তেলের মূল্য চীনের মুদ্রা ইউয়ান দিয়ে পরিশোধ করছে। ভারতের আইসিআইসিআই ব্যাংকের মাধ্যমে এসব লেনদেন করা হচ্ছে। ভারতে পেট্রোল-ডিজেল পাচার রোধে সরকার দাম সমন্বয় করেছে। দেশের বিভিন্ন সীমান্তের চোরাপথ দিয়ে ভারতে জ্বালানি তেল পাচার রোধে টহল জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি। ইতোমধ্যে সীমান্ত এলাকায় জনবল বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি তল্লাশি করা হচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি জ্বালানি খাতে নতুন অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘœ, মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ ঝুঁকিতে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়ছে। এই বাস্তবতায় জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন জ্বালানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি পাচার ও মজুদদারের কথা স্বীকার করেছেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেছেন, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারির কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের গড় দরের তুলনায় ১-২৯ মার্চ সময়ে দাম ৯৮ শতাংশ বেড়েছে, অকটেনের বেড়েছে ২৬ শতাংশ। সরকার জনগণের স্বার্থে উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি দিচ্ছে। এই দুটি জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে মার্চ-জুন প্রান্তিকে মোট ভর্তুকির প্রয়োজন হবে ডিজেলের ক্ষেত্রে ১৫ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা ও অকটেনের ক্ষেত্রে ৬৩৬ কোটি টাকা, মোট ১৬ হাজার ৪৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া পেট্রোবাংলার মাধ্যমে এলএনজি আমদানির জন্য এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ১৫ হাজার ৭৭ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হবে। কৃত্রিম সংকট নিরসনে ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। সারা দেশে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং বিপিসি কর্তৃক ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। অবৈধ মজুদকারীদের ধরতে সারা দেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহে। বিশ্ববাজারে দামও বাড়ে জ্বালানি তেলের। একপর্যায়ে অপরিশোধিত তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যুদ্ধ শুরুর আগে যা ছিল ৮০ ডলারের আশপাশে। গত শুক্রবার জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার ঘোষণা দেয় ইরান। এতে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ৯০ ডলারের আশপাশে নেমে আসে। তবে ইরান গতকাল আবার হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা দেয়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ডিজেল ৮৮ ডলার ব্যারেল তা থেকে বাড়িয়ে বর্তমান দায়িছে ১৬৪ ডলারে। যা ১৪২ শতাংশত বৃদ্ধি পেয়েছে। অকটেনের ৭৮ ডলার থেকে ১১৯ ডলার ব্যারেলপ্রতি বেড়েছে। যা ৭২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জেট ফুয়েল ৮৯ ডলার থেকে ২০১ ডলার বেড়েছে। যা বর্তমানে ১৪৩ শতাংশ আন্তর্জাতিক বাজারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিজেলের চাহিদা প্রায় চার লাখ টন। বর্তমানে ডিজেলের মজুদ আছে প্রায় এক লাখ দুই হাজার টন। ডিজেল নিয়ে আসা আরো চারটি জাহাজে এক লাখ টনের বেশি মজুদ যুক্ত হচ্ছে। এর বাইরে আরো ৮০ হাজার টন ডিজেল মজুদ রয়েছে। যা জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে। ইতোমধ্যেই জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়া চলছে।

দেশের জ্বালানির চাহিদা অনুযায়ী, গত ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত গড়ে ডিজেল বিক্রি হয়েছে দিনে ১১ হাজার ১০৭ টন। গত বছরের এপ্রিলে দিনে গড়ে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ১১ হাজার ৮৬২ টন। দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের মধ্যে মূল হলো ডিজেল, যা মোট জ্বালানি তেলের ৬৩ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর সময়মতো জাহাজ আসতে না পারায় কিছুটা টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। গত মাসে ছয়টি ডিজেলের জাহাজ আসতে না পারায় দেড় লাখ টন ডিজেলের মজুদ কমেছে। এর মধ্যে যুদ্ধ নিয়ে আতঙ্কের কারণে বাড়তি জ্বালানি কেনার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এরপর ডিজেলের সরবরাহ কমানো হয়। বিকল্প উৎস থেকে ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নেয় সরকার। গত বছরের মার্চে প্রতিদিন গড়ে অকটেন সরবরাহ করা হয়েছে এক হাজার ১৯৩ টন। যুদ্ধের কারণে চাহিদা বাড়ায় এবার মার্চে দিনে সরবরাহ ২৬ টন বেড়ে হয়েছে এক হাজার ২১৯ টন। এরপর সরবরাহ কমায় বিপিসি। গত বছরের তুলনায় এ মাসে দিনে এখন পর্যন্ত সরবরাহ কমেছে গড়ে ৫৬ টন। আর গত মাসের তুলনায় এ মাসে গড়ে দিনে সরবরাহ কমেছে ৯০ টন। গত ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন ডিপো থেকে গড়ে সরবরাহ হয়েছে এক হাজার ১২৯ টন অকটেন। গত বছরের এপ্রিলে দিনে অকটেন বিক্রি হয়েছে গড়ে এক হাজার ১৮৫ টন। আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশ ডিজেলার দাম ২০০ টাকা হওয়ার কথা। বর্তমান সরকার কৃষকের চিন্তা করে ডিজেলে মাত্র এক টাকা বৃদ্ধি করেছে।

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪ সালের মার্চ থেকে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। সে হিসাবে আগের মাসে আমদানি করা জ্বালানি তেলের খরচ বিবেচনায় নিয়ে প্রতি মাসে নতুন দাম সমন্বয় করা হয়। তবে বিশ্ববাজারে ব্যাপক বাড়লেও এবার এপ্রিলের শুরুতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়নি। এখন মাসের মাঝামাঝি এসে বাড়ানো হলো। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের ইতিহাসে এক লাফে সর্বোচ্চ মূল্য বৃদ্ধি হয় ২০২২ সালের আগস্টে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ডিজেলের দাম সাড়ে ৪২ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করা হয়। যদিও সমালোচনার মুখে একই মাসে পাঁচ টাকা কমানো হয়েছিল দাম। এবার ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ। অন্য জ্বালানি তেলের দামও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অকটেনের দাম ১২০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৪০ টাকা। পেট্রোলের দাম ১১৬ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩৫ টাকা। আর কেরোসিনের দাম ১১২ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩০ টাকা। এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে অকটেনের দাম সর্বোচ্চ ১৩৫ ও পেট্রোলের দাম ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। একই মাসে আবার দাম পাঁচ টাকা কমিয়ে ১৩০ ও ১২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। জ্বালানি তেলের মধ্যে উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জেট ফুয়েল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসি। আর নির্বাহী আদেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম নির্ধারণ করে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ।

জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসির সূত্রে জানা গেছে, দেশে সব মিলে অকটেন মজুদ করার সক্ষমতা আছে ৪৫ হাজার ৮১৯ টন। ১৭ এপ্রিল বিক্রির পর অকটেন মজুদ আছে ২৯ হাজার ৪৮৪ টন, যা বর্তমান সরবরাহ বিবেচনায় ২৫ দিনের মজুদ। গত শুক্রবার ২৫ হাজার টন অকটেন নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জাহাজ এসেছে। এটি খালাস করা হলে সক্ষমতার বেশি হবে মজুদ। দেশীয় উৎস থেকেও প্রতিদিন অকটেন যুক্ত হচ্ছে। দেশে বর্তমানে অকটেনের কোনো ঘাটতি নেই।

পেট্রোলপাম্প মালিকরা বলছেন, অকটেন ও পেট্রোলের জন্যই মূলত মানুষ ফিলিং স্টেশনে ভিড় করছে। তাই এগুলোর সরবরাহ বাড়ানো জরুরি। অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে সব তেল বিক্রি হয়ে যায়। তবে শুধু পেট্রোলপাম্পে নয়, এজেন্ট, ডিস্ট্রিবিউটর, ডিলারসহ সবাইকে তেল সরবরাহ করতে হবে। না হলে সব গ্রাহকের চাপ পেট্রোলপাম্প সামলাতে পারবে না। বিশেষ করে সব বিক্রয় প্রতিনিধির কাছে ডিজেলের সরবরাহ বাড়াতে হবে।

মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাসে সাধারণত জ্বালানি তেল হিসেবে অকটেন ব্যবহৃত হয়। বছরে সরবরাহ করা মোট জ্বালানি তেলের ৬ শতাংশ অকটেন। গত অর্থবছরে দেশে চার লাখ ১৫ হাজার টন অকটেন বিক্রি হয়। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ দেশেই উৎপাদিত হয়। আর বাকি ৫০ শতাংশ আমদানি করা হয়। মোটরসাইকেলে অকটেনের পাশাপাশি পেট্রোল ব্যবহৃত হয়। পুরোনো ব্যক্তিগত গাড়িতেও কেউ কেউ পেট্রোল ব্যবহার করেন। সিএনজি অটোরিকশা, লেগুনা, ঘাস কাটার যন্ত্র চালাতেও পেট্রোল ব্যবহৃত হয়। দেশে জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৭ শতাংশ পেট্রোল। এটি শতভাগ দেশে উৎপাদিত হয়। তবে কাঁচামাল হিসেবে কনডেনসেট আমদানি করতে হয়। বর্তমানে পেট্রোলের মজুদ আছে ১৮ হাজার ৮৩০ টন। এপ্রিলে গড়ে পেট্রোল বিক্রি করা হয়েছে এক হাজার ২৫৩ টন। গত বছরের এপ্রিলে দিনে গড়ে বিক্রি হয়েছে এক হাজার ৩৭৪ টন। এ বিষয়ে সংগঠনটির সদস্য সচিব মীর আহসান উদ্দিন পারভেজ বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে জ্বালানি তেলের অপ্রয়োজনীয় মজুদ প্রবণতা কমবে এবং বিক্রয় ব্যবস্থায় আরো স্বচ্ছতা আসবে। রোববার জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এ কথা বলেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারির কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। সংসদ সদস্য তার প্রশ্নে অভিযোগ করেন, সরকারিভাবে সংকট নেই বলা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। পাম্পগুলোতে গ্রাহকদের ২০০ টাকার বেশি জ্বালানি দেয়া হচ্ছে না এবং মোটরসাইকেলে বিশেষ চিহ্ন দিয়ে পুনরায় তেল নেয়া প্রতিরোধ করা হচ্ছে। ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, দেশে জ্বালানির কোনো সংকট নেই। গত বছরের মার্চ মাসের তুলনায় চলতি মার্চ ২০২৬ মাসেও সমপরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারির কারণে এই কৃত্রিম পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া জনমনে ভীতি ও অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতা সংকটকে আরো ঘনীভূত করছে। একই সঙ্গে স্পষ্ট করা হয়েছে, পাম্পে মোটরসাইকেলে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল দেয়া বা রঙ লাগানোর বিষয়ে কোনো সরকারি নির্দেশনা নেই। তিনি বলেন, কৃত্রিম সংকট নিরসনে ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। সারা দেশে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং বিপিসি কর্তৃক ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। অবৈধ মজুদকারীদের ধরতে সারা দেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৯ হাজার ১১৬টি অভিযানে তিন হাজার ৫১০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এতে এক কোটি ৫৬ লাখ ৯ হাজার ৬৫০ টাকা অর্থদ- আদায় এবং পাঁচ লাখ ৪২ হাজার লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়েছে। মজুদ ও কালোবাজারি প্রতিরোধে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী বলেন, ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেল বিপণনে অধিকতর স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক ঢাকা মহানগরীর কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে পরীক্ষামূলকভাবে ফুয়েল কার্ড চালু করা হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সফল হলে দেশব্যাপী তা বাস্তবায়ন করা হবে।

You may also like

Leave a Comment