Home সম্পাদকীয়বাঙালির নববর্ষ উদযাপন : রূপ-রূপান্তর

বাঙালির নববর্ষ উদযাপন : রূপ-রূপান্তর

Muktochinta Online
০ comments ১১ views

বিশ্বজিৎ ঘোষ

বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। কথায় বলে, বাঙালি আমুদে জাতি, উৎসবপ্রিয় জাতি। উৎসব পেলে সবকিছু ভুলে থাকতে পারে বাঙালি। তবে লক্ষ করলেই দেখা যাবে, এত উৎসবের ভিড়েও ধর্মনিরপেক্ষ মিলিত বাঙালির উৎসবের সংখ্যা খুব বেশি নয়।

কয়টা উৎসব আছে আমাদের, যেখানে সবাই একনিষ্ঠভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে, ধর্মীয় ও সামাজিক দেয়ালের ঊর্ধ্বে উঠে নিষ্ঠভাবে পালন করতে পারে প্রকৃত অংশগ্রহণকারীর ভূমিকা? সবার অংশগ্রহণে মিলিত বাঙালি যে কয়টা অনুষ্ঠানে মুখর হয়ে ওঠে, নববর্ষ উৎসব তার অন্যতম। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাঙালি জনগোষ্ঠী ধর্মীয়-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মিলিতভাবে পালন করে আসছে বাংলা নববর্ষ উৎসব। উত্তরকালে স্বাধীনতা দিবস বা বিজয় দিবসের মতো সর্বজনীন উৎসব পালনের দিন আমরা পেয়েছি বটে, তবে এ ক্ষেত্রে নববর্ষ উৎসব যে ভিন্ন মাত্রাসঞ্চারী, তা লেখাই বাহুল্য।

বাংলা নববর্ষ পালনের ইতিহাস অতি প্রাচীন।

তবে সম্রাট আকবরের শাসনামলে এ ক্ষেত্রে সূচিত হলো ভিন্ন মাত্রা। আকবর প্রবর্তিত নববর্ষ উৎসব ছিল প্রধানত অর্থনৈতিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। কেননা কৃষকের ঘরে এ সময় ফসল থাকে, ফলে তারা সাংবৎসরিক খাজনা ইত্যাদি পরিশোধ করতে পারে। অতীতে নববর্ষের প্রথম দিন থেকেই বাঙালির অর্থনৈতিক জীবনের বাৎসরিক নতুন পথচলা শুরু হতো—এখনো কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রচলিত আছে এই ঐতিহ্য।

সাংবৎসরিক হিসাব-নিকাশ চলে এই দিনে, ব্যবসা-বাণিজ্যের লাভ-ক্ষতি মিলিয়ে দেখা হয় পহেলা বৈশাখে। ব্যবসায়ীদের কাছে এই অনুষ্ঠান ‘হালখাতা’ নামে পরিচিত। হালখাতা অনুষ্ঠান মূলত অর্থনৈতিক চিন্তার ফল। এই অনুষ্ঠান নতুন বছরের হিসাব খোলার এক আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ। হালখাতায় কাজ-কারবারের লেনদেন, বাকি-বকেয়া, জমা-খরচ সবকিছুর হিসাব লিখে রাখার ব্যবস্থা হয়।

দোকানিরা তাঁদের গ্রাহক, পৃষ্ঠপোষক ও শুভার্থীদের দোকানে নিমন্ত্রণ করেন। সবার সঙ্গে দেখা হয়, হয় মিষ্টিমুখ। গ্রাহক পুরনো বকেয়া শোধ করে দেন—শুরু হয় নতুন লেনদেন। নববর্ষে হালখাতার এই অনুষ্ঠান নানা কারণেই এখন পুরনো পরিচয় হারিয়ে ফেলেছে। তবে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য, বোধ করি, এই ঐতিহ্যের আন্তরিক অনুশীলন এখন অতি জরুরি।

বাঙালির নববর্ষ উদযাপন : রূপ-রূপান্তরঅতীতে নববর্ষ উৎসব যে অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ছিল, তার আরেক প্রমাণ এদিনই কৃষক নতুন বছরের কৃষিকাজ শুরু করতেন। হয়তো মাঠ চাষের অনুপযোগী, বৃষ্টির জন্য কৃষক আকাশের দিকে তাকিয়ে, তবু নববর্ষ এলে শুভ সূচনা হিসেবে তিনি মাঠে যান, সামান্য চাষ করে নতুন বছরের কৃষিকাজ শুরু করে দেন। এভাবে দেখলে বলতে হয়, বাংলার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে অতীতে নববর্ষ উৎসব ছিল সরাসরি সম্পর্কিত।

অতীতে, বাংলার সামন্তযুগে, নববর্ষের সঙ্গে ‘পুণ্যাহ’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। এই অনুষ্ঠানে প্রজাসাধারণ জমিদারকে খাজনা পরিশোধ এবং নতুন বছরের খাজনা প্রদানের সূত্রপাত করত। জমিদারতন্ত্রের অবসানের ফলে এই প্রথা এখন উঠে গেছে। তবে এই অনুষ্ঠানের ইতিবাচক দিক সামাজিক মেলামেশা এখনো বর্তমান। গ্রামগঞ্জে জমির বাৎসরিক খাজনা প্রদান করা হয় চৈত্র মাসে। নববর্ষের আগেই খাজনা পরিশোধের এই বিধান গ্রামজীবনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম দিক।

নববর্ষ উৎসবের এই অর্থনৈতিক চারিত্র্য ক্রমে সামাজিক মাত্রা অর্জন করে। নববর্ষ আয়োজনের অর্থনৈতিক দিকগুলোর চেয়ে ধীরে ধীরে সামাজিক বৈশিষ্ট্যগুলো ক্রমে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ ক্ষেত্রে নববর্ষের সময় নানা অঞ্চলে বৈশাখী মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নতুন জামাকাপড় পরা, আত্মীয়-স্বজনকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো—এসব আয়োজনের কথা বলা যায়। এসব অনুষ্ঠান, প্রকৃত প্রস্তাবে, সামাজিক অনুষ্ঠান। এ ক্ষেত্রে বৈশাখী মেলা এবং নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কথা মনে আসে। নববর্ষে বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসে মেলা। বৈশাখ মাসজুড়ে চলে এই আয়োজন। কোথাও বা তিন বা সাত দিনের মেলাও বসে। এসব মেলায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি হয়, বিক্রি হয় নানা ধরনের খেলনা। মেলায় যাত্রা, পুতুলনাচ ও সার্কাস বসে—গ্রামীণ জীবনে দেখা দেয় নতুন উৎসাহ, নবীন উদ্দীপনা। আত্মীয়-স্বজন, পরিচিতজনের সঙ্গে দেখা হয়, তৈরি হয় সামাজিক মেলামেশার বৃহৎ এক বাতাবরণ।

বিভাগোত্তরকালে, পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আমলে, বিশেষ করে ষাটের দশকে এসে নববর্ষ উৎসবের আর্থিক-সামাজিক চারিত্র্যের পরিবর্তন ঘটে—নববর্ষ উৎসব হয়ে ওঠে উপনিবেশবাদবিরোধী সংগ্রামের রাজনৈতিক এক হাতিয়ার। এ ক্ষেত্রে ছায়ানট পালন করে ঐতিহাসিক এক ভূমিকা। নববর্ষ উপলক্ষে রমনার অশ্বত্থমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান আমাদের নববর্ষ উৎসবকে নতুন মাত্রায় অভিষিক্ত করে। ক্রমে ওই আয়োজনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলাদেশে—গ্রামে-গঞ্জে, নগরে-বন্দরে। এদিন দেখা যায় মিলিত বাঙালির সংঘচেতনার শক্তি। ঔপনিবেশিক আমলে যেমন, তেমনি স্বাধীনতা-পরবর্তীকালেও নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের জাতিগত ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হয়। ঔপনিবেশিক শক্তি ভয় পেয়েছে নববর্ষের এই চারিত্র্যবদলে—স্বাধীন বাংলাদেশেও তাদের প্রেতাত্মারা ভয় পায় নববর্ষের এই নতুন শক্তিকে। তাই রমনার অশ্বত্থমূলে তাদের বোমা ফাটাতে হয়, মারতে হয় নিরীহ মানুষকে। নববর্ষ উৎসব বাঙালির কাছে এখন সংঘচেতনায় উদ্দীপ্ত হওয়ার উৎসব, আপন সত্তানুসন্ধানের উৎসব, জাতির ঠিকানা খোঁজার উৎসব। বৈশাখে এসে আমরা পুরনোকে সরিয়ে নতুনকে আবাহন করি—এই ভাবনার চেয়ে উৎসবের রাজনৈতিক চারিত্র্যই এখন নতুন তাৎপর্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ঔপনিবেশিক আমলে পহেলা বৈশাখ উদযাপন ছিল একটি সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। আজকে আবার বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা নিয়ে নববর্ষ উদযাপন করা জরুরি। নববর্ষে মিলিত শক্তি নিয়ে দাঁড়াতে হবে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে, দাঁড়াতে হবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে। বাংলা ভাষা নিয়ে হালে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, প্রমিত ভাষাকে যেভাবে উদ্দেশ্যচালিত তাত্ত্বিক প্রচার করছে ‘সংস্কৃত বাংলা’ বলে, তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।

পহেলা বৈশাখ মানে বাঙালির ঐতিহ্য-অন্বেষা, পহেলা বৈশাখ মানে বাঙালির আপন শিকড়-অন্বেষা। পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপনকে একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে না দেখে দেখতে হবে ঔপনিবেশিক আমলের মতো রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে। বৈশাখের বুকের ভেতরে আছে আগুন—প্রতিরোধের আগুন। শুধু সাংবৎসরিক নববর্ষ উদযাপন নয়, ওই প্রতিরোধের আগুনসম্ভব পহেলা বৈশাখ উদযাপনই হোক এই নববর্ষে আমাদের অঙ্গীকার।

পুঁজিবাদ মানুষকে ইতিবাচক অনেক কিছু দিয়েছে, কিন্তু তার নেতিবাদী চেতনার সবচেয়ে বড় ‘দান’ বিচ্ছিন্নতা ও বিহঙ্গতা। পুঁজিবাদ কিংবা একালের বিশ্বায়ন মানুষকে শুধু বিচ্ছিন্ন করে, ধ্বংস করে মানুষের সঙ্গে মানুষের আন্ত সম্পর্কের মৌল বন্ধন। আত্মরতির পঙ্কে মানুষের সামূহিক বিপন্নতাই যেন পুঁজিবাদের অন্তিম গন্তব্য। এই প্রেক্ষাপটে জরুরি হয়ে ওঠে আমাদের পহেলা বৈশাখ। বাঙালির কাছে পহেলা বৈশাখ মিলনের আহবান নিয়ে আসে, ডাক দেয় বাঙালিকে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-নির্বিশেষে আত্যন্তিক মিলনের। মাটি ও মানুষের সঙ্গে, দেশ ও ভাষার সঙ্গে, স্বপ্ন ও সংগ্রামের সঙ্গে একাত্ম হতে আহবান জানায় নববর্ষের প্রথম ভোর—বিচ্ছিন্নতাপীড়িত মধ্যবিত্ত মানুষকে লোকপুরাণের ফিনিক্স পাখির মতো পুনর্গঠিত হওয়ার আহবান জানায় বৈশাখের প্রথম সকাল। পুঁজিবাদসৃষ্ট মানুষের সঙ্গে মানুষের বিচ্ছিন্নতা কাটাতে চায় নববর্ষ—তার আহবানটা মিলনের, একাত্মতার, সহযোগের, সংহতির এবং সম্প্রীতির। বাংলাদেশের জনগণের মাঝে আছে ফিনিক্স পাখির জেগে ওঠার শক্তি। তারাই এ দেশের অগ্রযাত্রায়, উন্নত ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে, বৈশাখী চেতনা বিস্তারে, শেষ প্রতিরোধ, অন্তিম ভরসা।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়

You may also like

Leave a Comment