সাইফুল হক
গত ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে ও তাড়াহুড়োর মধ্য দিয়ে এক বিতর্কিত বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করেছে। একটি অনির্বাচিত সরকার ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে কেন গুরুত্বপূর্ণ এ নজিরবিহীন অসম ও অন্যায্য বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করল, তার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। যে চুক্তি বাস্তবায়নে তাদের কোনো দায় নেই, কেন তারা একটি নির্বাচিত সরকারের কাঁধে এরকম একটি ভয়ংকর চুক্তি চাপিয়ে দিয়ে গেল, এ পর্যন্ত তারও কোনো সদুত্তর মেলেনি। জাতীয় নির্বাচনের ডামাডোলে এ চুক্তি নিয়ে বস্তুত জানাশোনা ও আলোচনার তেমন সুযোগ ছিল না। সমালোচনার মুখে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, চুক্তির আগে বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের চুক্তির বিষয়ে অবহিত করে তাদের সম্মতি নেওয়া হয়েছে। জামায়াত এ তথ্যের বিরোধিতা করেছে। বিএনপির দিক থেকে এ বক্তব্য নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
এ চুক্তি সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানা না গেলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (USTR) তাদের ওয়েবসাইটে Agreement on Reciprocal Trade (ART) নামের ৩২ পৃষ্ঠার এ চুক্তিপত্র প্রকাশ করেছে। এ বাণিজ্যচুক্তিতে বড় দাগের যা আছে-বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ ও ১৫ বছরে ১৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি কিনতে হবে। বছরে ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি করতে হবে। সামরিক সরঞ্জামের ক্রয় বৃদ্ধি করতে হবে। কিছু নির্দিষ্ট দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় সীমিত রাখার চেষ্টা করতে হবে।
অশুল্ক বাধা অপসারণে বাংলাদেশকে যা করতে হবে-যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে কোনো কোটা আরোপ করা যাবে না ও তাদের পণ্য আমদানিতে অশুল্ক বাধা দূর করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে না-বাংলাদেশকে এ রকম উদ্যোগ নিতে হবে। শ্রমিকদের সংগঠন করার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আর যুক্তরাষ্ট্র যা করবে-বাংলাদেশের পণ্যে পালটা শুল্ক ২০ থেকে ১৯ শতাংশে কমিয়ে আনবে। যুক্তরাষ্ট্রের সুতা ও তন্তু দিয়ে তৈরি পোশাকে পালটা শুল্ক না বসানোর প্রতিশ্রুতি থাকবে।
এ বাণিজ্যচুক্তি বাস্তবায়নে প্রকৃত প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে বাংলাদেশকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার পাশাপাশি শুল্ক, শ্রম আইন, ডিজিটাল নীতি, কৃষি, বিনিয়োগসহ নানা ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংস্কার করতে হবে। চুক্তিতে বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো পুনর্বিন্যস্ত করার বাধ্যবাধকতার বিষয়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে বছরে গড়ে রপ্তানি করে ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করে ২ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পণ্য। এ ৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা কীভাবে দূর করা যায়, এটি নিয়ে নিশ্চয় যৌক্তিক আলোচনার সুযোগ রয়েছে। সমস্যা এখানে নয়, সমস্যা হচ্ছে বাণিজ্যচুক্তির নামে বাংলাদেশের বিনিয়োগ, ডিজিটাল বাণিজ্য, শিল্প, কৃষি, জ্বালানি, প্রতিরক্ষাসহ বিস্তৃত ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায় ও অন্যায্য হস্তক্ষেপ নিয়ে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশীয় উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানকে প্রদত্ত সুবিধা মার্কিন কোম্পানিকেও দিতে হবে; যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশকেও মেনে চলতে হবে, আমদানি করা মার্কিন কোনো পণ্যের গুণগত মান পরীক্ষা করা যাবে না; যুক্তরাষ্ট্র ব্যতিরেকে নতুন করে বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক প্রযুক্তি ক্রয় করতে পারবে না।
চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত হবে। এ চুক্তি অনুযায়ী, আগে থেকে চালু চুল্লির ক্ষেত্রে সীমিত ছাড় পাওয়া গেলেও ভবিষ্যতে রাশিয়া বা চীনের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। চুক্তির ধারা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় গৃহীত সীমান্ত বা বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞামূলক ব্যবস্থার সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশকেও ‘পরিপূরক বিধিনিষেধের’ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এর অর্থ হচ্ছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অথবা বাণিজ্যিক যুদ্ধে বাংলাদেশকেও তার অনুরূপ অবস্থান গ্রহণ করতে হবে; পরাশক্তির দ্বন্দ্ব-সংঘাতে বাংলাদেশ নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে পারবে না। ‘কিছু নির্দিষ্ট দেশ’ থেকে বাংলাদেশকে সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটা কমাতে হবে, যা আসলে চীনের দিকেই ইঙ্গিত করে।
বিদ্যমান এ চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি দামে গম-আটা, সয়াবিন তেল ইত্যাদি নানা নিত্যপণ্য কিনতে হবে। চুক্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাণিজ্য আরও ‘সহজ ও বিস্তৃত’ করার কথা বলা হয়েছে। মার্কিন শুল্ক ৩৫ থেকে ১৯ শতাংশে নেমে এলেও তাতে আমাদের তেমন কোনো লাভ হয়নি; উলটো নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, শুল্ক কমলেও আমাদের রপ্তানি বাড়েনি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ চুক্তিতে বাস্তবে আমাদের প্রাপ্তির চেয়ে বঞ্চনা অনেক বেশি। এ ধরনের একতরফা চুক্তি কেবল আমাদের আরও বাণিজ্যিক বৈষম্যের দিকেই ঠেলে দেবে।
চুক্তির অংশ হিসাবে প্রায় আড়াই হাজার বাংলাদেশি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে, আর প্রায় চার হাজার চারশ মার্কিন পণ্য বাংলাদেশে ঢুকতে পারবে। চুক্তির ধারা অনুসারে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দেওয়া খাদ্য ও কৃষিপণ্যের সনদ বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজারে বৈষম্যহীন কিংবা অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার থাকবে। চুক্তির আরেকটি ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশকে শ্রমিক ধর্মঘটের ওপরে থাকা বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে নিতে হবে। ট্রেড ইউনিয়নের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণে জরিমানা বৃদ্ধি করতে হবে। আর দুই বছরের মধ্যে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলো-ইপিজেডকে সাধারণ শ্রম আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
দীর্ঘ চুক্তির নানা ধারার শর্তে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট, এ চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বাংলাদেশের ওপর আপত্তিজনক শর্ত চাপানো হয়েছে। এ চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের নাম যেখানে এসেছে ৫৯ বার, সেখানে বাংলাদেশের নাম এসেছে ২০৫ বার। বস্তুত এ দীর্ঘ চুক্তিনামায় বাংলাদেশকে কী কী করতে হবে, তার বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের চুক্তি এটাই প্রথম। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেছেন, ‘এই চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে।’
চুক্তিতে বড় ধরনের সমস্যায় পড়বে বাংলাদেশ। এ চুক্তি বহাল থাকলে অধিকাংশ দেশ বা আমাদের উন্নয়ন অংশীদাররা বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক চুক্তি করতে চাইবে না। আবার কেউ কেউ চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একতরফা সুবিধা চাইবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে তার ইঙ্গিতও দিয়েছে। বস্তুত এটি কোনোভাবেই মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি নয়।
এটিও অত্যন্ত পরিষ্কার, এ চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন বাণিজ্যিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নীতিমালা উপেক্ষা করা হয়েছে। চুক্তিতে যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ রয়েছে, সেখানে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিমালা মানা হয়নি, আবার যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বেলায় ঠিকই এ বিশ্ব সংস্থার নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এ চুক্তিতে একতরফাভাবে মার্কিন অর্থনীতির নিরাপত্তায় বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
চুক্তির সামগ্রিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এ কথিত বাণিজ্যচুক্তিকে প্রকারান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা ও সামরিক স্বার্থজনিত নীতি-কৌশলের অংশ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। চুক্তিতে এমন সব শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের নীতিগত স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে নিক্ষেপ করতে পারে। বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে গিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা গুরুতরভাবে হুমকির মুখোমুখি করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার কেন এত সঙ্গোপনে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার আগমুহূর্তে বিপজ্জনক এ চুক্তি করতে গেল, তা বিস্ময়কর। চুক্তি স্বাক্ষরে মার্কিন চাপ থাকলে সরকার চুক্তির বিষয়টি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দিতে পারত; তা তারা করেনি। তাদের কী এমন ঠেকা বা মার্কিন প্রশাসনের কোথায়, কার কাছে কী তাদের দায় রয়েছে, তার সুরাহা হওয়ার দরকার ছিল। কোনো স্বাধীন-সার্বভৌম আত্মমর্যাদাপূর্ণ দেশ ও তার জনগণ এ ধরনের অন্যায় ও একপাক্ষিক চুক্তি গ্রহণ করতে পারে কি? প্রকৃতপক্ষে এ চুক্তি করার কোনো এখতিয়ারও অন্তর্বর্তী সরকারের ছিল না। সে কারণে জনমনে এ চুক্তি ও চুক্তির হোতাদের নিয়ে প্রবল সন্দেহ ও অবিশ্বাসের জন্ম হয়েছে।
নতুন সরকারের করণীয় কী হতে পারে
চুক্তিটি ৬০ দিনের নোটিশে বাতিল করার শর্ত আছে। নতুন সরকার সে পথে হাঁটতে পারে। জনগুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুত বর্তমান জাতীয় সংসদে এটি নিয়ে আলোচনা হতে পারে; বাণিজ্যসংক্রান্ত সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার পর এ চুক্তির অন্যায্যতা দেখিয়ে সরকার এ চুক্তি বাতিল করতে পারে। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া যেতে পারে।
আমরা আশা করতে চাই, সরকার অবিলম্বে চুক্তি বাতিলে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজার নিশ্চয় আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তার জন্য পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। সামগ্রিক পর্যালোচনার পর ন্যায্যতা আর সমতার ভিত্তিতে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আমরা আশা করব, নতুন সরকার এ ব্যাপারে জাতীয় স্বার্থ আর জাতীয় নিরাপত্তা বিবেচনায় রেখে পদক্ষেপ নেবে।
সাইফুল হক : সাধারণ সম্পাদক, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি