ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেকার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কোনো অগ্রগতি ছাড়াই সমাপ্ত হয়েছে। ১৯৭৯ সালের পর দেশ দুটির মধ্যে এটিই ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি আলোচনা। টানা ২১ ঘণ্টা ধরে চলা এই আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর তেহরান অভিযোগ করেছে যে, ওয়াশিংটন একটি প্রকৃত শান্তি চুক্তির চেয়ে ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষাকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছে।
ইরানি বিপ্লবের পর একে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুখোমুখি যোগাযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, শেষ পর্যন্ত উভয় প্রতিনিধি দল কোনো রূপরেখা চুক্তি ছাড়াই ফিরে গেছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, কৌশলগত বিষয়ে মতভেদ এবং বাইরের রাজনৈতিক চাপ এই অচলাবস্থার অন্যতম প্রধান কারণ। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পর্দার আড়ালে ক্রমাগত হস্তক্ষেপ এবং একটি উসকানিমূলক ভিডিও বার্তা এই ঐতিহাসিক আলোচনাকে লাইনচ্যুত করতে সাহায্য করেছে।
জে.ডি. ভ্যান্সের কাছে সেই ফোন কল
১৯৭৯ সালের পর দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় এই আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার জন্য ইরানি কর্মকর্তারা সরাসরি নেতানিয়াহুকে দায়ী করেছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, আলোচনার চলাকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্সের মধ্যে একটি ফোনালাপ হয়, যা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান এজেন্ডা থেকে সরিয়ে ইসরায়েলি স্বার্থের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। আরাগচি বলেন, “ওয়াশিংটন আলোচনার টেবিলে তা-ই হাসিল করতে চাচ্ছে, যা তারা যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা সদিচ্ছা নিয়ে এসেছিলাম, কিন্তু সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমরা আপসহীন।”
আলোচনা চলাকালীন নেতানিয়াহু প্রায় ১৩ মিনিটের একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি ইরান এবং দেশটির আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের ওপর সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দেন। ভিডিওতে তিনি বলেন, ইরানের ওপর হামলা চলবে এবং বর্তমানে “ইরান তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে”। তিনি শুধু ইরান নয়, বরং ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনকেও লক্ষ্য করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। নেতানিয়াহুর দাবি ছিল—”ইরান যুদ্ধবিরতির জন্য ভিক্ষা করছে” এবং “আমরা ইরানে ভয়ের সীমা অতিক্রম করেছি।” তার এই মন্তব্যগুলো আলোচনার প্রক্রিয়ার প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়া ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করার দাবি এবং প্রয়োজনে অন্য উপায়ে তা সম্পূর্ণ করার হুমকি যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
আরও দেখুনলেবাননে রক্তক্ষয়ী হামলা
কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করার তৃতীয় এবং সবচেয়ে সমালোচনামূলক পদক্ষেপ ছিল রণক্ষেত্রের পরিস্থিতি। ইরান এই আলোচনার অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে লেবানন পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিলেও, আলোচনার চূড়ান্ত পর্যায়ে দখলদার বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের সিডন অঞ্চলে হামলা জোরদার করে। একে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সামরিকভাবে নস্যাৎ করার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই হামলায় দক্ষিণ লেবাননে অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন।
আলোচনা চলাকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্তব্যও এই ভঙ্গুর আস্থায় আঘাত হেনেছে। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “হয়তো তারা চুক্তি করবে, হয়তো করবে না। তবে মার্কিন দৃষ্টিকোণ থেকে আমরাই জিতছি।” তার এই কথাগুলো থেকে ধারণা করা হয়েছে যে, তিনি আলোচনার ফলাফলের চেয়ে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতেই বেশি আগ্রহী। এমনকি ইসলামাবাদের এই সংকটময় মুহূর্তে ফ্লোরিডায় একটি ইউএফসি কেজ ফাইট প্রতিযোগিতায় তার উপস্থিতি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
আস্থার অভাব ও হরমুজ প্রণালীর চাবিকাঠি
ইরানি প্রতিনিধি দলের প্রধান ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, “আগের দুটি যুদ্ধের কারণে আমরা প্রতিপক্ষের ওপর আস্থা রাখতে পারছি না। তারা ইরানি প্রতিনিধি দলের বিশ্বাস অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।” তিনি আরও জানান, ইরান সামরিক ও কূটনৈতিক—উভয় পথেই নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করবে। অন্যদিকে, ইরানি নেতা মোজতবা খামেনির প্রধান উপদেষ্টা আলি আকবর বেলায়েতি সামাজিক মাধ্যমে এক বার্তায় স্মরণ করিয়ে দেন, “হরমুজ প্রণালীর চাবিকাঠি আমাদের শক্তিশালী হাতেই রয়েছে।”
ইসরায়েলের জ্বালানি মন্ত্রী এলি কোহেনও হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, চুক্তি না হলে ইরানে হামলা চালানো হবে। এছাড়া ইসরায়েলি জেনারেল স্টাফ সেনাবাহিনীকে “ইরানে হামলার জন্য প্রস্তুত” থাকার নির্দেশ দিয়েছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, ইসলামাবাদে মূলত তিনটি প্রধান বিষয়ে জট পাকিয়ে আছে: হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা, ইরানের প্রায় ৯০০ পাউন্ড উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুতের ভবিষ্যৎ এবং জব্দ করা ২৭ বিলিয়ন ডলার ইরানি রাজস্ব ফেরত দেওয়া।
আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী সব জাহাজের ওপর অবরোধ আরোপ করা হবে। ট্রাম্প মার্কিন নৌবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন ইরানকে ট্রানজিট ফি প্রদানকারী যেকোনো জাহাজকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় থামানো হয়। এর জবাবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, কোনো সামরিক জাহাজ হরমুজ প্রণালীর দিকে অগ্রসর হলে তাকে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। সূত্র: ইয়েনি সাফাক