মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের অষ্টম দিনে ইরান–এর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা আরও তীব্র হয়েছে। তবে হামলার মুখেও অনড় অবস্থান বজায় রেখে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান। দেশটির নেতৃত্ব স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, কোনো পরিস্থিতিতেই আত্মসমর্পণ করবে না ইরান এবং নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে।
তবে ট্রাম্পের বক্তব্য সরাসরি নাকচ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ইরান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও “জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠী”র উসকানিমূলক ও আগ্রাসী যুদ্ধের মুখে রয়েছে। তাঁর ভাষায়, “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের ধারণা নিছক দিবাস্বপ্ন। ইরানের শত্রুদের উচিত এই কল্পনা থেকে সরে আসা।”
পেজেশকিয়ান আরও বলেন, প্রতিবেশী কোনো দেশ থেকে ইরানে হামলা না হলে সেসব দেশের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালাবে না তেহরান। একই সঙ্গে ইতোমধ্যে যেসব দেশে হামলার প্রভাব পড়েছে, তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশও করেন তিনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিকমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হামলার হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হবে এবং আরও কিছু শীর্ষ নেতাকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল–এর লাগাতার হামলার চাপেই ইরান নাকি মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের কাছে ক্ষমা চেয়েছে এবং তাদের ওপর হামলা না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর আগেও তিনি ঘোষণা দেন— “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা নয়।”
ইরানের সামরিক বাহিনীও জানিয়েছে, তারা প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে। ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি)–এর খতম আল-আম্বিয়া সদর দপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, এসব দেশের বিরুদ্ধে হামলার কোনো ইচ্ছা নেই। তবে যদি সেসব দেশ থেকে শত্রুতাপূর্ণ কর্মকাণ্ড চালানো হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থকে লক্ষ্য করে স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে শক্তিশালী পাল্টা আঘাত হানা হবে।
যুদ্ধের অষ্টম দিনে রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইসরায়েলি বাহিনীর দাবি, রাতভর ৮০টি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে প্রায় ২৩০টি বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। লক্ষ্যবস্তু ছিল আইআরজিসির সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার ও ভূগর্ভস্থ উৎপাদনকেন্দ্র।
হামলার পর তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দর এলাকায় দীর্ঘ সময় ধোঁয়া দেখা যায়। ইসরায়েলের দাবি, এই বিমানবন্দরটি আইআরজিসির কুদস বাহিনী ব্যবহার করে। তারা আরও দাবি করেছে, হামলায় ওই বাহিনীর ১৬টি যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে।
ফ্লোরিডায় এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে “বিস্ময়কর সাফল্য” অর্জন করেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মার্কিন বাহিনী ইতোমধ্যে ৪২টি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করেছে এবং দেশটির বিমানবাহিনী ও যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের ক্ষতি করেছে।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির কাছে একটি পানি শোধনাগার ধ্বংস করেছে, যেখান থেকে প্রায় ৩০টি গ্রামে পানি সরবরাহ করা হতো। তিনি এ ঘটনাকে “স্পষ্ট অপরাধ” হিসেবে উল্লেখ করেন।
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া হামলায় এখন পর্যন্ত ৬,৬৬৮টি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৫,৫৩৫টি আবাসিক ভবন, ১,০৪১টি বাণিজ্যিক স্থাপনা, ১৪টি চিকিৎসাকেন্দ্র, ৬৬টি বিদ্যালয় এবং রেড ক্রিসেন্টের ১৩টি স্থাপনা।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইরানে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে এবং নিহতদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক। চলমান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের আরও ১২টি দেশে সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে। এসব দেশে অন্তত ২৯ জন নিহত হয়েছেন। তেহরানে নিহত দুই বছরের শিশু জয়নাব সাহেবির দাফন ঘিরে মর্মস্পর্শী দৃশ্য দেখা যায়। শিশুটির কফিনে একটি পুতুল রাখা হয় এবং স্বজনদের আহাজারিতে শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
হামলার জবাবে ইরানের বাহিনী ইসরায়েল ও অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর এটি ছিল তাদের ২৬তম ধাপের হামলা। এতে হাইপারসনিক ‘ফাতাহ’ এবং ব্যালিস্টিক ‘ইমাদ’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ইসরায়েলের তেল আবিব ও জেরুজালেম–এ বড় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন।
ইরানের হামলায় সউদী আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল ধাফরা বিমানঘাঁটি এবং কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। দুবাই বিমানবন্দরের কাছেও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেশী লেবানন–এও সংঘর্ষ চলছে। ইসরায়েলি বাহিনী হিজবুল্লাহর অবস্থানে হামলা চালালে জবাবে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় রকেট হামলার দাবি করেছে। লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৩৩৯ জন নিহত ও ১,০২৩ জন আহত হয়েছেন।
সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়ছে। আরব লিগ পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠক ডেকেছে। একই সঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার–এর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন।
এদিকে যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে লন্ডন–এ বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। মার্কিন দূতাবাসের সামনে অনুষ্ঠিত ওই বিক্ষোভে পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষ অংশ নেন। সব মিলিয়ে চলমান সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। তবে তীব্র হামলার মুখেও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে না গিয়ে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার বার্তা দিচ্ছে ইরান। তথ্যসূত্র : আল-জাজিরা