বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত একটি খসড়া প্রস্তাব নাকচ হয়ে গেছে। স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র রাশিয়া ও চীনের ভেটো (Veto) প্রদানের কারণে এই প্রস্তাবটি গৃহীত হতে পারেনি। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল, ২০২৬) নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে নিরাপত্তা পরিষদের এই ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জর্ডানের সহায়তায় বাহরাইন এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিল।ভোটের সমীকরণ নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১১টি রাষ্ট্র প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। যার মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ডেনমার্ক এবং গ্রিসের মতো দেশগুলো। তবে স্থায়ী সদস্য হিসেবে রাশিয়া ও চীন তাদের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে প্রস্তাবটি সরাসরি বাতিল করে দেয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশ পাকিস্তান এবং কলম্বিয়া ভোটদান থেকে বিরত ছিল।
খসড়া প্রস্তাবটিতে দাবি জানানো হয়েছিল যে, ইরান যেন অবিলম্বে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা বন্ধ করে। প্রণালীটি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য সদস্য দেশগুলোকে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। যদিও রাশিয়া ও চীনের আপত্তির মুখে প্রস্তাবটি বেশ কয়েকবার সংশোধন করে এর ভাষা নরম করা হয়েছিল এবং সরাসরি ‘সামরিক শক্তি’ ব্যবহারের উল্লেখ বাদ দেওয়া হয়েছিল, তবুও মস্কো ও বেইজিং তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি।
রাশিয়া ও চীনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই প্রস্তাবটি সংকটের প্রকৃত কারণ সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নীতি দায়ী। বেইজিং ও মস্কো মনে করে, এই ধরনের প্রস্তাব মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের বদলে আরও উসকে দিতে পারে।
উল্লেখ্য যে, ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রেক্ষিতে ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই হরমুজ প্রণালীটি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। প্রণালীটি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে।
এই প্রস্তাবটি ভেটোতে আটকে যাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে একটি চূড়ান্ত সময়সীমা (Deadline) বেঁধে দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রণালীটি খুলে না দিলে ইরানকে চরম পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে।
জাতিসংঘে বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিন রশিদ আল জায়ানি এই ব্যর্থতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “এই প্রস্তাব গৃহীত না হওয়া বিশ্বের কাছে একটি ভুল বার্তা দিল।” আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের এই অচলাবস্থা মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিশ্চিত যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।