হাম বা মিজলস ভাইরাস দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে ধ্বংস করে দেয়। এতে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে সৃষ্টি হয় নানাবিধ জটিলতা। হামের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাবের মধ্যে অন্যতম চোখের ক্ষতি। হামের প্রভাবে চিরতরে অন্ধ হয়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়।
কিভাবে হয় চোখের ক্ষতি
সরাসরি চোখের টিস্যু আক্রমণ করতে পারে হাম ভাইরাস। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিয়ে অন্যান্য জীবাণু সংক্রমণের পথও প্রশস্ত করে দেয়।
♦ ভিটামিন-এ এর অভাব : হাম হলে শরীরে সঞ্চিত ভিটামিন-এ দ্রুত শেষ হয়ে যায়। কর্নিয়ার সুস্থতার জন্য ভিটামিন-এ অপরিহার্য। এর অভাবে কর্নিয়া শুকিয়ে যায় এবং অন্ধত্ব দেখা দেয়।
♦ ভাইরাস আক্রমণ : কর্নিয়া এবং কনজাংটিভাতে প্রদাহ সৃষ্টি করে হামের ভাইরাস ।
♦ ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ : রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অনুপস্থিতিতে সহজে ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয় চোখ। এতে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে।
যেসব জটিলতা হতে পারে
♦ কনজাংটিভাইটিস : হামের অন্যতম উপসর্গ চোখ লাল হয়ে জল পড়া এবং আলোতে তাকালে অস্বস্তি হওয়া। একে সাধারণত ‘চোখ ওঠা’ বলা হয়, যা আদতে কনজাংটিভাইটিস।
♦ কর্নিয়াল আলসার বা ক্ষত : চোখের সঠিক যত্ন নেওয়া না হলে কর্নিয়াতে ঘা বা আলসার হতে পারে। এটি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। সময়মতো চিকিৎসা না করলে কর্নিয়া ফুটো হয়ে যেতে পারে।
♦ জেরোফথালমিয়া : ভিটামিন-এ এর অভাবে চোখ শুকিয়ে যাওয়াকে বলা হয় জেরোফথালমিয়া। রাতকানা রোগ এর প্রথম লক্ষণ, পরবর্তীতে চোখের কর্নিয়া গলে (কেরাটোম্যালাসিয়া) স্থায়ী অন্ধত্ব হতে পারে।
♦ অন্ধত্ব : হামজনিত দাগ চোখের মণির ঠিক মাঝখানে হলে দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চোখের সুরক্ষায় করণীয়
হাম আক্রান্ত ব্যক্তির চোখ বাঁচাতে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি—
♦ ভিটামিন-এ ক্যাপসুল গ্রহণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হাম শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শে উচ্চমাত্রার ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে হাম আক্রান্ত শিশুদের দুই দিনে দুটি ডোজ দেওয়া বাধ্যতামূলক। এটি কর্নিয়ার ক্ষতি রোধ করে।
♦ পরিষ্কার তুলা বা নরম সুতি কাপড় কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে আলতো করে চোখের কোণের পুঁজ পরিষ্কার করতে হবে। একই তুলা বা কাপড় দিয়ে বারবার দুই চোখ মোছা যাবে না।
♦ শিশুকে প্রচুর পরিমাণে বুকের দুধ (যদি শিশু ছোট হয়), ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার (যেমন : গাজর, মিষ্টি কুমড়া, ছোট মাছ, পালং শাক) এবং প্রচুর তরল খাবার দিতে হবে।
♦ হামের সময় চোখ আলো সংবেদনশীল হয়ে থাকে। তাই রোগীকে অন্ধকার বা মৃদু আলো আছে এমন ঘরে রাখা ভালো।
♦ চোখে সংক্রমণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক আই ড্রপ বা অয়েন্টমেন্ট ব্যবহার করতে হবে। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে স্টেরয়েড জাতীয় ড্রপ ব্যবহার করা যাবে না।
♦ চোখ চুলকালে বা অস্বস্তি হলে হাত দিয়ে রগড়ানো যাবে না, এতে কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
♦ চোখে গোলাপজল, দুধ, মধু বা কোনো গাছপালার রস দেওয়া যাবে না। এগুলো সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
প্রতিরোধই শ্রেয়
টিকা নেওয়াই হাম ও হামজনিত অন্ধত্ব প্রতিরোধের একমাত্র স্থায়ী সমাধান। শিশুদের ৯ মাস পূর্ণ হলে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস পূর্ণ হলে দ্বিতীয় ডোজ এমআর টিকা দিতে হবে। এই টিকা হামের ঝুঁকি ৯৫ শতাংশ কমিয়ে দেয়।
লেখক : কনসালট্যান্ট (চক্ষু)
দীন মোহাম্মদ আই হসপিটাল