রাজধানী ঢাকার পেট্রোল পাম্পগুলোতে সূর্য ওঠার আগেই গাড়ি, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের লম্বা সারি। চালকরা সবাই একটাই আশায় দাঁড়িয়েছেন জ্বালানি তেল পাবেন। অনেকের এই অপেক্ষা ঘণ্টা পেরিয়ে দিন, আর দিন পেরিয়ে রাতেও গড়াচ্ছে। জ্বালানি তেলের সঙ্কট এখন শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয় এটি ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে মানবিক সঙ্কটে। এতে সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন চাকরিজীবীরা। তেলের জন্য অপেক্ষা করতে করতে তাদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে দেখা গেছে। চাকরিজীবীদের জন্য এই সঙ্কট আরো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে উপস্থিত থাকতে হয়, কাজের চাপ থাকে, আবার পরিবারের দায়িত্বও পালন করতে হয়। কিন্তু তেলের অভাবে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। অনেকেই অফিসে দেরি করে পৌঁছানোর কারণে শাস্তির মুখে পড়ছেন। কেউ কেউ চাকরি হারানোর ভয়েও ভুগছেন। এই পরিস্থিতি কতদিন চলবে, তার উত্তর কেউ জানে না। কিন্তু যারা প্রতিদিন পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়ে দিন-রাত পার করছেন তাদের কাছে প্রতিটি দিনই যেন এক যুদ্ধ।
পেট্রোল, ডিজেল কিংবা অকটেন প্রায় সব ধরনের জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পরিবহন খাতের শ্রমিকরা। বিশেষ করে রাজধানী ও বড় শহরগুলোর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে সকাল থেকেই লম্বা লাইনের দৃশ্য এখন নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তেল না পেয়ে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে মানুষকে। ফলে শুধু ব্যক্তিগত ভোগান্তিই নয়, কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ায় উৎপাদনশীলতায়ও বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।
জ্বালানি সঙ্কটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। বাস, ট্রাক ও পিকআপ চালকদের অনেকেই জানিয়েছেন, তারা নিয়মিত ট্রিপ দিতে পারছেন না। ফলে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে ভাড়া এবং বাজারে দ্রব্যমূল্যের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে। শুধু পরিবহন খাত নয়, জ্বালানি সঙ্কটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও। যারা জেনারেটর ব্যবহার করেন, তাদের জন্য ডিজেল না পাওয়া বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এই সঙ্কটের প্রভাব পড়ছে পরিবারিক জীবনেও। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকায় অন্যান্য দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি সঙ্কটের কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। উৎপাদন কমে যাচ্ছে, পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে। কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া মানে সরাসরি উৎপাদনশীলতার ক্ষতি। হাজার হাজার মানুষ যদি প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে তা জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করে। জ্বালানি তেলের সঙ্কট এখন শুধু একটি সরবরাহ সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কটে রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কর্মঘণ্টা নষ্ট করছে, আয় কমছে, জীবনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। সাধারণ মানুষ এখন শুধু একটি জিনিসই চায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ, যেখানে তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হবে না।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, ভোর থেকেই মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও পণ্যবাহী যানবাহনের দীর্ঘ সারি ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে। কেউ কেউ রাতেই এসে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন, যাতে পরদিন সকালে তেল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সবার ভাগ্যে তেল জোটে না।
বেসরকারি চাকরিজীবী সাইদুল ইসলাম সরকার বলেন, মতিঝিলের একটি পাম্পে ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। অফিসে যাওয়ার কথা ছিল ৯টায়। এখন ১১টা বাজে তেল পাইনি। ফোন করে অফিসে ছুটি নিতে হয়েছে। প্রতিদিন এভাবে হলে চাকরি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।
পিকআপ চালক রবিন বলেন, আমরা আগে দিনে দুই-তিনটা ট্রিপ দিতে পারতাম। এখন একটাও ঠিকমতো দিতে পারি না। তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এতে মালিকের ক্ষতি হচ্ছে, আমাদের আয়ও কমে যাচ্ছে। আমরা শুধু চাই নিয়মিত তেল পাওয়া যাক। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে চাই না। আমাদের সময়েরও মূল্য আছে।
খিলগাঁও এলাকার গৃহিণী মরিয়ম আক্তার বলেন, আমার স্বামী সকাল থেকে তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। বাজার করা, বাচ্চাদের স্কুলে নেওয়া সব কিছুতেই সমস্যা হচ্ছে। সংসারের কাজ এলোমেলো হয়ে গেছে।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, গাড়ি নির্ভর ও বেশি জ্বালানি ব্যবহারকারী শহর থেকে সরে এসে কম জ্বালানি ব্যবহারকারী, স্বল্প দূরত্বভিত্তিক শহর গড়ে তুলতে হবে। গণপরিবহনকেন্দ্রিক উন্নয়ন ও ঘনবসতিপূর্ণ সংক্ষিপ্ত শহর মডেলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যাতায়াতের চাহিদা কমাতে বাসস্থান, কর্মসংস্থান ও প্রয়োজনীয় সেবা কাছাকাছি রাখতে হবে। গণপরিবহনকে জ্বালানি নীতির অংশ করতে মেট্রোরেলসহ গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। অযান্ত্রিক পরিবহন অগ্রাধিকার দিয়ে হাঁটা ও সাইকেল চালানোর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ফুটপাত ও সাইকেল চলাচলের পথকে জ্বালানি অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সড়কবাতিতে সাশ্রয়ী বাতি ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। জ্বালানি সঙ্কট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।