দেশে জ্বালানি খাতে বর্তমানে যে অস্থিরতা এবং পাম্পগুলোয় দীর্ঘ লাইনের চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা মূলত একটি জটিল ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জের ফল। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ মজুত ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা-এই দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে সাধারণ মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, দেশে জ্বালানি তেলের অভাব নেই, বরং মজুত সক্ষমতার চেয়েও বেশি তেল বর্তমানে বিপিসির হাতে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে জনভোগান্তি লাঘবে সরকারি পরিকল্পনা ও বেসরকারি খাতের সমন্বয় এখন সময়ের দাবি। রোববার যুগান্তরের খবরে প্রকাশ, বিপিসি ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, দেশের ডিপোগুলোয় বর্তমানে ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি অকটেন ও পেট্রোল জমা রয়েছে। মজুত সক্ষমতা ৫৩ হাজার টন হলেও বর্তমানে মজুত আছে প্রায় ৫৫ হাজার টন। কিন্তু এই বিপুল মজুত থাকা সত্ত্বেও পাম্পগুলোয় কেন দীর্ঘ লাইন, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক।\
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর প্রধান কারণ হলো সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহব্যবস্থার সমন্বয়হীনতা। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত তেলবাহী জাহাজ যখন বন্দরে পৌঁছায়, তখন দেশের ভেতরকার ট্যাংকগুলো খালি না থাকলে তেল খালাস করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ যান্ত্রিক ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণেই হয়তো বিপিসিকে সাময়িকভাবে দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে তেল নেওয়া কমিয়ে দিতে হয়েছে। তবে স্থানীয় উৎপাদনকারীদের সক্ষমতাকে কাজে লাগানো সরকারের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৭৫ শতাংশ যেখানে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জোগান দেয়, সেখানে তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখা জাতীয় স্বার্থেই জরুরি। বলা বাহুল্য, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সরবরাহ দিতে না পেরে উৎপাদন বন্ধ করে দেয়, তবে ভবিষ্যতে আমদানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সরকারের নীতি হওয়া উচিত, স্থানীয় উৎপাদনকে সুরক্ষা দিয়ে আমদানির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখা।
আশার কথা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে ইতোমধ্যে পরিস্থিতির ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন, যাতে দ্রুত জনভোগান্তি দূর হয়। এসব উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারলে মজুত সমস্যার সমাধান হবে। তবে রেশনিং ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে যে বিভ্রান্তি বা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে সঠিক ও স্বচ্ছ তথ্য প্রচার করা প্রয়োজন। ডিজেলের ক্ষেত্রে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সংবাদটিও নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমদানিতে যে বাধা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠে চলতি মাসে বিপুল পরিমাণ ডিজেল দেশে আসছে। এটি কৃষি ও পরিবহণ খাতের জন্য বড় সুখবর। এখন প্রয়োজন অকটেন ও পেট্রোলের বিতরণব্যবস্থায় বিদ্যমান ছোটখাটো ত্রুটিগুলো দ্রুত সারিয়ে তোলা।
মনে রাখতে হবে, জ্বালানি তেলের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো ধরনের অব্যবস্থাপনার সুযোগ নেই। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে তাই আরও তৎপর হতে হবে, যাতে ডিপো থেকে পাম্প পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন থাকে। জনগণের ধৈর্য এবং সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দ্রুতই জ্বালানি খাতে স্থিতি ফিরবে-এটাই প্রত্যাশা।