মধ্যপ্রাচ্যে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্রকে ওলটপালট করে দিচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ওপর এর আঁচ লাগছে বেশ প্রবলভাবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। অক্টোবরেও এই হার ৪ দশমিক ৯ শতাংশ হওয়ার কথা ছিল। দশমিক ২ শতাংশের এই হ্রাস আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হলেও একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। যদিও এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার সন্তোষজনক এবং এই মন্দার মধ্যেও দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সংগতিপূর্ণ।
তবে দুশ্চিন্তার জায়গাটি হলো মূল্যস্ফীতি। চলতি অর্থবছর শেষে এই হার ৯ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আইএমএফ-এর আশঙ্কা। যদিও সরকারি পরিসংখ্যানে কিছুটা ওঠানামা দেখা যাচ্ছে; কিন্তু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় উচ্চমূল্যের চাপ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। প্রতিবেশী ভারত যখন সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখছে, কিংবা চীন ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো প্রতিকূলতা কাটিয়ে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে নিচ্ছে, তখন আমাদের কেন পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে, তা গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা মানেই জ্বালানি তেলের বাজার অস্থিতিশীল হওয়া এবং বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহণ খরচ বেড়ে যাওয়া। বাংলাদেশ যেহেতু আমদানিনির্ভর একটি দেশ, তাই বৈশ্বিক এই সংকটের প্রভাব আমাদের ওপর সরাসরি পড়ছে। তবে শুধু বাইরের পরিস্থিতির ওপর দায় চাপিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। অভ্যন্তরীণ বাজার তদারকি, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ সচল রাখা এখন সময়ের দাবি।
দেশের প্রবৃদ্ধির হার এশিয়ার অনেক উন্নত অর্থনীতির চেয়ে বেশি হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক। এটি প্রমাণ করে যে আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি এখনো মজবুত। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতির উচ্চহার সেই অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। সরকারকে এখন বেশি গুরুত্ব দিতে হবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায়। বিদেশি ঋণের সঠিক ব্যবহার এবং আমদানিতে বিকল্প উৎস খোঁজা ও দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধিতে জোর দিলে মধ্যপ্রাচ্যের এই ঝড় মোকাবিলা করা সম্ভব। আমরা আশা করি, সরকার ও নীতিনির্ধারক মহল আইএমএফ-এর এই সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দিয়ে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেবে।