Home Featuredপিতার জন্মভিটায় আপ্লুত প্রধানমন্ত্রী

পিতার জন্মভিটায় আপ্লুত প্রধানমন্ত্রী

Muktochinta Online
০ comments ১৩ views

প্রধানমন্ত্রী হয়ে প্রথমবার নিজ জেলা বগুড়া সফর করেছেন তারেক রহমান। বগুড়া সিটি করপোরেশন উদ্বোধন, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, জনসভায় বক্তব্যসহ দিনব্যাপী নানা ব্যস্ত কর্মসূচির মধ্যেও যান পিতার জন্মভিটায়। স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে নিয়ে বাগবাড়ী গ্রামের সেই পৈতৃক ভবনে যান তিনি। পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ির দেয়াল, উঠান, গাছপালা দেখে আপ্লুত হয়ে পড়েন তারেক রহমান। এরপর স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ির বিভিন্ন ঘর ঘুরে ঘুরে দেখেন। ওই বাড়িতে কিছুসময় কাটিয়ে বেরিয়ে আসেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর গতকালের বগুড়া সফর ছিল কর্মসূচিতে ঠাসা। সোমবার ভোরে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে নিয়ে গুলশানের বাসভবন থেকে বিশেষ বাসযোগে রওনা হন তিনি। বিভিন্ন পয়েন্টে সড়কের দু’ধারে দাঁড়িয়ে বিএনপি’র নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান। পথে পথে মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত সকাল সোয়া ১১টায় তিনি বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে পৌঁছান। সেখানে তিনি বগুড়া জেলা এডভোকেট্স বার সমিতির নবনির্মিত আধুনিক ভবনের নামফলক উন্মোচন করেন। এরপর আদালত চত্বর থেকেই তিনি বগুড়াসহ দেশের ৭টি জেলায় ডিজিটাল বিচার ব্যবস্থার বিপ্লব ঘটিয়ে ‘ই বেইলবন্ড’ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন করেন। এরপর বগুড়াকে সিটি করপোরেশন ঘোষণা করেন। দুপুরে তিনি গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ীতে তার পৈতৃক বাসভবন এলাকায় যান। সেখানে তিনি হাম-রুবেলা টিকা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। পরে ওই এলাকার নশিপুর চৌকিরদহ খাল খনন কাজের উদ্বোধন করেন এবং স্থানীয় ৯১১ জন নারীকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ করেন। তার প্রতিটি কর্মকাণ্ডে স্থানীয় জনগণের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বিকালে আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠের ঐতিহাসিক এই জনসভার শেষে বগুড়া প্রেস ক্লাবের নতুন ভবন এবং বাইতুর রহমান কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ফলক উন্মোচন করেন। এরপর বাসযোগে ঢাকায় ফিরেন তিনি।

আমরা যা বলি, তা করে দেখাই: বগুড়ায় জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের মানুষের সামনে নতুন অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। বিকালে বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন- বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন করা। বিগত ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ মূলত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) আগামী পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার ম্যান্ডেট বা রায় দিয়েছে। তিনি জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেন, সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় দাঁড়িয়ে আমরা যে জুলাই সনদে সই করে এসেছি, সেই সনদের প্রতিটি শব্দ এবং প্রতিটি অক্ষর এক এক করে বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি বলেন- এটি ছাত্র জনতার বিপ্লবের রক্তের ঋণ শোধ করার এক পবিত্র অঙ্গীকার। আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে প্রধানমন্ত্রী যখন মঞ্চে উঠলেন, তখন উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের সেøøাগানে পুরো শহর প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণের শুরুতে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোর কথা স্মরণ করেন যখন এই দেশ থেকে স্বৈরাচারের অবসান ঘটেছিল। তিনি বলেন, বিগত দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের মানুষের কথা বলার অধিকার এবং ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল। স্বৈরাচারী শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে এ দেশের মানুষ যখন দিশাহারা, তখন বাংলাদেশের সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল তিল তিল করে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। সেই সংগ্রামের চূড়ান্ত রূপ আমরা দেখেছি ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট। সেইদিন বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই রাজপথে নেমে এসেছিল বলেই স্বৈরাচার এই পবিত্র মাটি থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। তিনি বলেন, আজ বাংলাদেশের মানুষ আবার তাদের ভোটের অধিকার এবং বাক স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার ভাষণে বিগত দেড় যুগের দুঃশাসনের চিত্র তুলে ধরে বলেন, দেশের মানুষ এতোদিন উন্নয়নের মিথ্যা গল্প শুনেছে। উন্নয়নের নাম করে মেগা প্রজেক্ট বানানো হয়েছে আর সেই মেগা প্রজেক্টের আড়ালে করা হয়েছে মেগা দুর্নীতি। এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষের কষ্টার্জিত লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। মানুষ এই লুণ্ঠনের ইতিহাস ভুলে যায়নি। তিনি বলেন, বিগত ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। যে অধিকার অনেক বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিল, সেই অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে এ দেশের সাধারণ নাগরিকরাই ঠিক করে দিয়েছে আগামী পাঁচ বছর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব কার হাতে থাকবে। তারা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে বিপুল ম্যান্ডেট দিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছে এবং আমরা সেই আস্থার অমর্যাদা করবো না।

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে রাজনৈতিক সংস্কার এবং ‘ভিশন ২০৩০’ এর পটভূমি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ২০১৬ সালে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন ‘ভিশন ২০৩০’-এর মাধ্যমে দেশের সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তখন স্বৈরাচারের ভয়ে কেউ সংস্কারের নাম নিতে সাহস করেনি। পরবর্তীতে আমরা ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে জনগণের কাছে গিয়েছি। যখন কেউ সাহস করেনি, তখন বিএনপিই স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যাংকিং এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার প্রস্তাব দিয়েছিল। তিনি বলেন, ৫ই আগস্টের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল, সেখানেও আমরা জনগণের পক্ষে আমাদের স্বচ্ছ মতামত দিয়েছি। আমরা লুকোচুরিতে বিশ্বাস করি না। আমরা স্পষ্ট করে জানিয়েছি আমরা কোন কোন বিষয়ে একমত এবং কোথায় আমাদের দ্বিমত রয়েছে।

যুব সমাজের কর্মসংস্থান নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির বিষয়ে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে যাতে স্বল্প খরচে দেশের তরুণ সমাজ বিদেশে সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। আমরা শিগগিরই দেশের মানুষের কাছে এই সুখবর পৌঁছে দেবো। প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার স্থানীয় উন্নয়নের বিষয়ে তার বিশেষ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেললাইন বগুড়াবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি, এই রেললাইন প্রকল্পের কাজ শিগগিরই শুরু হবে। এ ছাড়াও বগুড়ার কৃষিজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করার জন্য স্থানীয় বিমানবন্দরকে কার্গো প্লেন অবতরণের উপযোগী করে গড়ে তোলা হচ্ছে। বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে যেখানে কৃষি প্রকৌশল এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী আবেগের সঙ্গে বলেন, আমি আপনাদেরই সন্তান, আমি আপনাদেরই ভাই। বগুড়ার সন্তান হিসেবে যদি আমি এই উন্নয়নমূলক কাজগুলো করতে পারি, তবে তা আপনাদেরই গৌরব বৃদ্ধি করবে। আপনাদের দোয়া এবং সমর্থনই আমার চলার পথের পাথেয়। তিনি উপস্থিত জনতার কাছে প্রশ্ন করেন, আপনারা কি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং খাল খনন কর্মসূচির বাস্তবায়ন চান? উপস্থিত জনতা সমস্বরে ‘হ্যাঁ’ বলে সমর্থন জানালে তিনি বলেন, এই কাজগুলো করতে হলে আপনাদের সহযোগিতা লাগবে এবং ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন স্বৈরাচার বলেছিল এক মিনিটও শান্তিতে থাকতে দেবে না। আজও সেই একই অপশক্তি আন্দোলনের নাম করে দেশে অশান্তি তৈরির চেষ্টা করছে। সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিবর্গ এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

You may also like

Leave a Comment