দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব। ভাইরাসজনিত এই ব্যাধির জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে শতাধিক এর মধ্যেই মারা গেছে। এই রোগের টিকা যখন আবিষ্কার হয়নি, সে সময় পৃথিবীতে প্রতিবছর প্রায় তিন কোটি মানুষ হাম আক্রান্ত হতো এবং মারা যেত ২৬ লাখের বেশি। টিকা আবিষ্কারের পর এই সংখ্যা অনেকাংশে কমে গেলেও শুধু ২০২৪ সালেই বিশ্বজুড়ে মারা যায় ৯৫ হাজার শিশু।
সুতরাং হাম নিয়ে হেলাফেলার সুযোগ নেই।
জটিলতার শঙ্কা যাদের বেশি
শতকরা ৩০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে হাম-পরবর্তী জটিলতা দেখা দেয়। প্রতি হাজারে এক থেকে তিনজন রোগী মারাত্মক জটিলতায় আক্রান্ত হয়। যাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনা (ইমিউনিটি) দুর্বল তাদের জন্য এটি বেশি বিপজ্জনক।
সাধারণত পাঁচ বছরের কম বয়সী এবং ২০ বছরের বেশি বয়সী রোগীদের জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এর মধ্যে রয়েছে—
► ডায়াবেটিক রোগী
► গর্ভবতী মা
► ক্যান্সার রোগী
► অপুষ্টিতে ভুগছে যারা, এবং
► এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি।
হাম থেকে নিউমোনিয়া
হামে মৃত্যুর অন্যতম কারণ নিউমোনিয়া এবং এনসেফালাইটিস। ফুসফুসে মারাত্মক ক্ষতি করে হাম।
কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা ও রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে বুঝতে হবে নিউমোনিয়া দেখা দিয়েছে। হামের প্রভাবের পাশাপাশি হামের কারণে রোগ প্রতিরোধে ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণেও হতে পারে নিউমোনিয়া। প্রতি ২০ জনে একজন হাম রোগীর নিউমোনিয়া হয়ে থাকে।
মস্তিষ্কে প্রদাহ
হাম থেকে মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফেলাইটিস হয়ে থাকে। তীব্র মাথা ব্যথা, আচরণগত পরিবর্তন, বমি, খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া—এসব এনসেফালাইটিসের লক্ষণ।
হাম হওয়ার এক থেকে ছয় মাস পরও এটি দেখা দিতে পারে। একে বলা হয় সাব-একিউট স্ক্লেরোজিং প্যানেনসেফেলাইটিস। প্রতি ৬০০ জনে [এক থেকে ১৫ মাস বয়সী] একজনের এমনটি হতে পারে।
চোখের ক্ষতি
হাম থেকে চোখের কর্নিয়ায় আলসার হতে পারে। চোখে তীব্র ব্যথা, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসা কর্নিয়ার আলসারের প্রধান লক্ষণ। আলসার থেকে হতে পারে স্কার। এমনকি কর্নিয়া ছিদ্র হয়ে যেতে পারে। হতে পারে অন্ধত্ব। যদি কারো ভিটামিন-এ ঘাটতি থাকে তাদের চোখের জটিলতা হয় মারাত্মক।
গর্ভাবস্থায় জটিলতা
গর্ভবতী মায়েরা হামে আক্রান্ত হলে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। এসব রোগীদের মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। সময়ের আগেই অনেকের বাচ্চার জন্ম হয়ে যেতে পারে (প্রিম্যাচিউর বার্থ)। নবজাতকের ওজন কম হতে পারে। গর্ভে শিশুর মৃত্যুও হতে পারে। প্রসবের কাছাকাছি সময়ে হাম হলে নবজাতকেরও হতে পারে জন্মগত হাম, যা মারাত্মক।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পর্যুদস্ত
দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে হাম। দেহে কোনো প্রকার জীবাণুর সংক্রমণ হলে বিদ্যমান অ্যান্টিবডিগুলো সেটিকে ধ্বংস করে দেয়। এতে পুরো শরীরে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায় না। প্রতিবার দেহে নতুন জীবাণু সংক্রমণ হলে সে তথ্য আমাদের শরীরের এক ধরনের কোষে সংরক্ষিত থাকে, যার নাম মেমোরি লিম্ফোসাইট। হাম ভাইরাস আক্রমণে এসব মেমোরি লিম্ফোসাইট সরাসরি নষ্ট হয়ে যায়। ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আবারও নতুন করে জীবাণু চিনতে হয়। এ অবস্থাকে বলা হয় ইমিউন অ্যামনেশিয়া। হাম আক্রমণের পর দুই বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে এই অবস্থা। ফলে এ সময় দেহে জীবাণু আক্রমণ বৃদ্ধি পায়। যারা হামের টিকা দিয়েছে তাদের এমনটি হয় না।
প্রতিরোধে করণীয়
টিকার মাধ্যমে হাম প্রতিরোধ করা যায়। ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ থেকে ১৮ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ সম্পন্ন করতে হয়। প্রচলিত এমএমআর টিকা নেওয়ার মাধ্যমে হামের পাশাপাশি আরো দুটি রোগও প্রতিরোধ করা যায়—মাম্পস ও রুবেলা। সংক্রমণ এড়াতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অবশ্যই আইসোলেশনে রাখতে হবে। রোগীর পরিচর্যাকারীদের নিয়মিত হাত ধোয়া জরুরি। রোগীর ব্যবহার্য থালা-বাসন, গ্লাস-মগ, তোয়ালে-গামছা অন্যদের ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না।
লেখক : অ্যাডভাইজার, স্পেশালিস্ট মেডিসিন (এন্ডোক্রাইনোলজি),
সিএমএইচ, ঢাকা।
চেম্বার : আল রাজি হাসপাতাল