২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদ এক অবিনাশী চেতনার নাম। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এই মেধাবী শিক্ষার্থী যেভাবে দুই হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে পুলিশের উদ্যত বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, তা ছিল এক অন্যায্য ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শোষিত মানুষের সংকল্পের প্রতীক।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই মামলার রায় ঘোষণা করেছেন। ট্রাইব্যুনাল-২-এর রায়ে দুই পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড, তিন কর্মকর্তার যাবজ্জীবন এবং ২৫ জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। আদালত তার পর্যবেক্ষণে আবু সাঈদকে গুলি করা পুলিশ সদস্যদের আচরণকে ‘অমানুষিক’ হিসাবে অভিহিত করেছেন। আমরাও মনে করি, নিরস্ত্র একজন ছাত্রকে যেভাবে কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে, তা যে কোনো সভ্য সমাজের জন্য কলঙ্কজনক।
বলা বাহুল্য, এ রায় বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই রায়ের গভীরতা কেবল দণ্ডাদেশের সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি হুঁশিয়ারি। এ রায়ের মাধ্যমে সুপ্রতিষ্ঠিত হলো, হুকুমের দোহাই দিয়ে বা রাষ্ট্রীয় পোশাকের আড়ালে থেকে সাধারণ নাগরিকের জীবন কেড়ে নিলেও বিচার এড়ানো সম্ভব নয়।
উল্লেখ্য, আবু সাঈদের সেই মহান আত্মত্যাগই ছিল জুলাই আন্দোলনের প্রধান বাঁক বদলের মুহূর্ত। ১৬ জুলাইয়ের সেই হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক ভিডিও যখন মুহূর্তের মধ্যে দেশময় ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের অন্তরে জমা থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এক প্রচণ্ড শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। আবু সাঈদের নিথর দেহের ওই দৃশ্য জাগিয়ে তুলেছিল তারুণ্যের অদম্য স্পর্ধা। এরপর থেকেই আন্দোলন আর কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা এক দফায় অর্থাৎ স্বৈরাচার পতনের গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়।
আবু সাঈদের বুকের রক্ত ছাত্র-জনতাকে রাজপথে দাবি আদায়ে অবিচল থাকার প্রেরণা জুগিয়েছিল, যার চূড়ান্ত পরিণতি আমরা দেখেছি ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে।
এদিকে, রায়ের পর দণ্ডিতদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের পাশাপাশি নিজেদের ‘সরকারের গোলাম’ বলে দাবি করতে দেখা গেছে, যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, একটি পেশাদার বাহিনীকে কীভাবে রাজনৈতিক দাসে পরিণত করা হয়েছিল। ফলে এ রায় একটি বড় সতর্কবার্তা দেয় : কোনো বাহিনীর জন্যই অন্ধ আনুগত্য অপরাধের বৈধতা দিতে পারে না। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা, যাদের কাজ ছিল শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়া, তাদের এ হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা ও দণ্ডপ্রাপ্তি সমাজের জন্য বড় শিক্ষা।
তবে রায় নিয়ে আবু সাঈদের পরিবারের আংশিক অসন্তুষ্টি এবং প্রসিকিউশনের আপিল করার সম্ভাবনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচারের পথে এখনো কিছু পথ বাকি। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, আবু সাঈদ হত্যা মামলার এ রায় কেবল একটি খুনের বিচার নয়, এটি একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পথে প্রথম বলিষ্ঠ ধাপ। এখন পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার করে সাজা কার্যকর করাই হবে শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা প্রদর্শন।