মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থা এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সংকট বাড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বৃদ্ধি পেলে আগামী ডিসেম্বর নাগাদ দেশের মূল্যস্ফীতির হার ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এই পূর্বাভাস সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর দুর্ভোগ নেমে আসার এক সতর্কবার্তা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, যুদ্ধের প্রভাবে যদি জ্বালানি তেলের দাম প্রথম দুই প্রান্তিকে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং সেই সঙ্গে ডলারের বিপরীতে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন ঘটে, তাহলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ৮ থেকে ৯ শতাংশের ঘরে থাকলেও এর নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যেই নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস তুলেছে। যদি এটি ১২ শতাংশ অতিক্রম করে, তাহলে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার আরও বাইরে চলে যাবে। এর ফলে কেবল খাদ্য নিরাপত্তাই বিঘ্নিত হবে না, সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান এবং দেশের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এদিকে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দারিদ্র্যের হার আরও বাড়বে। প্রায় ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ধরনের পূর্বাভাস আমলে নেওয়া জরুরি। কারণ মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট। জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি খরচ মেটাতে গিয়ে যদি রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, তাহলে মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা আরও বাড়বে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে এখনই দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, ডলারের বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি, বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে কঠোর তদারকি প্রয়োজন। ভূ-রাজনৈতিক সংকটের ওপর আমাদের হাত নেই।
তবে অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা রোধ করার বিষয়টি রয়েছে আমাদের হাতেই। সরকারের উচিত হবে সামাজিক সুরক্ষা বলয় বাড়িয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানো এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সব ধরনের অনিয়ম রোধে আপসহীন হওয়া। সময় থাকতে সঠিক পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সরকারের পক্ষে কঠিন হতে পারে।