বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার অভিবাসন বাড়ানো এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। তবে কার্যকর নীতিনির্ধারণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়-গন্তব্য দেশের নীতি ও কাঠামো কীভাবে অভিবাসীদের আয় ও রেমিট্যান্স আচরণকে প্রভাবিত করে।
আমার গবেষণা, ‘Impact of the destination state on migrants remittances’, এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। এখানে আমি দেখিয়েছি, রেমিট্যান্স কেবল অভিবাসীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা পারিবারিক দায়বদ্ধতার ফল নয়; বরং গন্তব্য দেশের আইন, শ্রমবাজার ও অভিবাসননীতির মাধ্যমে এটি কাঠামোগতভাবে গঠিত হয়। এ উপলব্ধি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে বোঝা যায়-কোন দেশে, কী ধরনের কাজের জন্য, কীভাবে মানুষ পাঠানো হচ্ছে-এসব সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত রেমিট্যান্সের পরিমাণ নির্ধারণ করে।
অভিবাসন কৌশলের পুনর্বিবেচনা
আমাদের অভিবাসন কৌশল নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে হবে। এতদিন আমরা মূলত কতজন বিদেশে যাচ্ছে, সেটিকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসাবে দেখেছি। কিন্তু সব অভিবাসন সমান নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে যারা স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পায়, তারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রেমিট্যান্স কম পাঠায়। কারণ তাদের পরিবারও ধীরে ধীরে সেই দেশে চলে যায় এবং তাদের আর্থিক দায়বদ্ধতা স্থানীয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশে অস্থায়ী শ্রমিকরা, যারা পরিবার নিয়ে যেতে পারে না এবং নির্দিষ্ট সময় পরে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়, তারা তাদের আয়ের বড় অংশ দেশে পাঠায়। আবার জাপানের মতো দেশে, যেখানে অভিবাসীরা এক ধরনের অনিশ্চিত আইনি অবস্থানে থাকে, সেখানে তারা আরও বেশি এবং দ্রুত রেমিট্যান্স পাঠাতে পারে। এ বাস্তবতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়-অভিবাসনের ধরন ও গন্তব্য দেশের নীতি অনুযায়ী রেমিট্যান্সের ধরন পরিবর্তিত হয়।
গন্তব্য দেশ নির্বাচনে কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি
এ প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য গন্তব্য দেশ নির্বাচন করতে হবে অত্যন্ত কৌশলগতভাবে। এমন দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যেখানে অভিবাসন মূলত অস্থায়ী, পরিবার নিয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত এবং নির্দিষ্ট সময় পর দেশে ফিরে আসতে হয়। এ ধরনের নীতিমালা অভিবাসীদের তাদের আয়ের বড় অংশ দেশে পাঠাতে উৎসাহিত করে। জিসিসি দেশগুলো-যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব বা কাতার-এ মডেলের একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ। তবে শুধু এ অঞ্চলের ওপর নির্ভর করে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপের কিছু উদীয়মান শ্রমবাজারেও আমাদের নজর দিতে হবে, যেখানে একই ধরনের অস্থায়ী শ্রম অভিবাসন ব্যবস্থা রয়েছে।
একইসঙ্গে, এমন দেশ খুঁজে বের করতে হবে, যেখানে আয়ের সুযোগ বেশি; কিন্তু অবস্থান সীমিত। জাপানের ক্ষেত্রে যেমন দেখা যায়, অভিবাসীরা স্বল্প সময়ে উচ্চ আয় করতে পারে এবং সেই আয়ের বড় অংশ দেশে পাঠায়। তাই শুধু শ্রমের চাহিদা নয়, বরং মজুরি কাঠামো, আইনি সীমাবদ্ধতা এবং অবস্থানের সময়সীমা-এ তিনটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করে গন্তব্য দেশ নির্বাচন করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন; যেখানে প্রতিটি দেশের অভিবাসন নীতি, শ্রমবাজারের সুযোগ এবং আইন প্রয়োগের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করা হবে।
উপযুক্ত কাজ নির্বাচন ও শ্রমবাজার কৌশল
গন্তব্য দেশ নির্বাচনের পাশাপাশি কোন ধরনের কাজের জন্য শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিম্ন দক্ষতার শ্রমিকরা, বিশেষ করে যারা কঠিন ও অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করে, তারা প্রায়ই তাদের আয়ের বড় অংশ দেশে পাঠায়, কারণ তাদের খরচ কম এবং পরিবারের ওপর নির্ভরতা বেশি। তবে এর অর্থ এই নয়, আমাদের শুধু নিম্ন দক্ষতার শ্রমিক পাঠানো উচিত। বরং এ খাতে বিদ্যমান সমস্যাগুলো-যেমন, কম মজুরি, বেতন না পাওয়া, উচ্চ নিয়োগ খরচ-এসব দূর করতে হবে, যাতে শ্রমিকদের প্রকৃত আয় বাড়ে এবং তারা আরও বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে পারে।
এর পাশাপাশি, বাংলাদেশকে অবশ্যই দক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমবাজারে প্রবেশ বাড়াতে হবে। নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তিগত কাজ এবং সেবা খাত-এসব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ মজুরির সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রে যদিও রেমিট্যান্সের অনুপাত কিছুটা কম হতে পারে, তবে মোট আয়ের পরিমাণ বেশি হওয়ায় সামগ্রিক রেমিট্যান্স বাড়বে। তাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করা জরুরি; যেখানে নিম্ন দক্ষতা ও উচ্চ দক্ষতা-দুই ধরনের শ্রম অভিবাসনই গুরুত্ব পাবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিকল্প অভিবাসন পথ ব্যবহার করা। জাপানের উদাহরণ দেখায়, স্টুডেন্ট ভিসার মতো পথ ব্যবহার করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করা সম্ভব। বাংলাদেশ যদি এ ধরনের বিকল্প পথগুলো চিহ্নিত করতে পারে-যেমন, স্টুডেন্ট-ওয়ার্কার প্রোগ্রাম, ইন্টার্নশিপ বা মৌসুমি কাজ-তাহলে নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে এবং রেমিট্যান্স বাড়বে।
অভিবাসন ব্যয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
অভিবাসন ব্যয় কমানোও একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি লক্ষ্য হওয়া উচিত। বর্তমানে অনেক শ্রমিক উচ্চ সুদের ঋণ নিয়ে বিদেশে যায়, যা তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। যদিও এ চাপ অনেক সময় বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করে, তবে এটি দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই দালাল নিয়ন্ত্রণ, স্বল্প সুদের ঋণ প্রদান এবং সরকারিভাবে শ্রমিক পাঠানোর ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে আরও সক্রিয় হতে হবে। গন্তব্য দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা, কাজের সুযোগ বাড়ানো এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব। একইসঙ্গে রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য ব্যাংকিং ও ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নত করতে হবে, যাতে খরচ কমে এবং আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের ব্যবহার বাড়ে। আমি এ উদ্ধৃত গবেষণায় দেখেছি, অনেক ক্ষেত্রে অভিবাসীরা দ্রুত অর্থ পাঠানোর জন্য অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে। এটি কমাতে হলে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও সাশ্রয়ী করতে হবে।
রেমিট্যান্সের কার্যকর ব্যবহার ও প্রত্যাবর্তন ব্যবস্থাপনা
রেমিট্যান্সের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়াও জরুরি। ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তা কার্যক্রমে রেমিট্যান্স বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা গেলে এটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। একইভাবে যারা বিদেশ থেকে ফিরে আসে, তাদের পুনর্বাসনের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারণ অস্থায়ী অভিবাসন ব্যবস্থায় ফিরে আসা অবশ্যম্ভাবী। এ শ্রমিকদের অর্জিত দক্ষতা যদি দেশের অর্থনীতিতে ব্যবহার করা যায়, তাহলে তা একটি অতিরিক্ত লাভ হিসাবে কাজ করবে।
স্থায়ী ও অস্থায়ী অভিবাসনের ভারসাম্য
সবশেষে, বাংলাদেশকে স্থায়ী ও অস্থায়ী অভিবাসনের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। অস্থায়ী অভিবাসন বেশি রেমিট্যান্স এনে দেয়, কিন্তু স্থায়ী অভিবাসন দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ, জ্ঞান স্থানান্তর এবং প্রবাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তাই এ দুই ধরনের অভিবাসনকে একসঙ্গে বিবেচনা করেই একটি সমন্বিত নীতি গ্রহণ করতে হবে।
সংখ্যার চেয়ে কৌশল গুরুত্বপূর্ণ
সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশ যদি গন্তব্য দেশের নীতিকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে এবং তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অভিবাসন কৌশল গ্রহণ করে, তাহলে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। আমার উদ্ধৃত গবেষণাটি স্পষ্টভাবে দেখায়, রেমিট্যান্স কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা নয়; বরং এটি একটি কাঠামোগত ফলাফল, যা রাষ্ট্রের নীতির মাধ্যমে গঠিত হয়। তাই এখন সময় এসেছে-সংখ্যার দিকে না তাকিয়ে, কৌশলের দিকে মনোযোগ দেওয়ার। শুধু বেশি মানুষ বিদেশে পাঠানো নয়, বরং সঠিক দেশে, সঠিক কাজের জন্য, সঠিক প্রশিক্ষণ দিয়ে মানুষ পাঠানোই হবে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স বৃদ্ধির টেকসই পথ।
ড. হাসান মাহমুদ : সহযোগী অধ্যাপক, নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কাতার