Home সম্পাদকীয়সংকটে সংযম, কৃচ্ছ্রসাধনে শক্তি

সংকটে সংযম, কৃচ্ছ্রসাধনে শক্তি

Muktochinta Online
০ comments views

রাষ্ট্রীয় কৃচ্ছ্রসাধন (austerity) মূলত এমন এক অর্থনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান, যেখানে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র সম্মিলিতভাবে অপচয় কমিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যয়ের দিকে মনোনিবেশ করে। গত ৫ এপ্রিল সরকার একটি নীতি ঘোষণা করেছে, যা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বাস্তবভিত্তিক।

সংকটের সময় কৃচ্ছ্রসাধন শুধু অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখে না, বরং জাতির মানসিক দৃঢ়তাও বৃদ্ধি করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে জাতি সংকটে কৃচ্ছ্রসাধন শিখেছে, সে জাতিই পরবর্তীকালে শক্তিশালীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে। কৃচ্ছ্রসাধন মানে শুধু ব্যয় কমানো নয়; বরং এটি একটি মানসিকতা, যেখানে প্রতিটি সম্পদকে মূল্যায়ন করা হয় এবং ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

মোল্লা নাসিরুদ্দিনের একটি মজার অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ গল্প এখানে প্রাসঙ্গিক। একবার তিনি গ্রামের লোকদের দাওয়াত দিলেন। সবাই ভেবেছিল, নিশ্চয়ই বড়সড় ভোজ হবে। কিন্তু যখন তারা খেতে বসল, তখন দেখা গেল খাবার খুবই সামান্য। অতিথিরা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল-‘হুজুর, এত কম খাবার কেন?’ নাসিরুদ্দিন মুচকি হেসে বললেন, ‘আজ আমি তোমাদের অভাবের স্বাদ শেখাতে চাই। কারণ যেদিন সত্যিই অভাব আসবে, সেদিন যেন তোমরা আতঙ্কিত না হও।’ তিনি আরও বললেন, ‘যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কমে অভ্যস্ত, সে কখনোই হঠাৎ অভাবে ভেঙে পড়ে না।’

অতিথিরা প্রথমে অস্বস্তিবোধ করলেও পরে উপলব্ধি করল-এটি শুধু একটি দাওয়াত নয়, বরং জীবনের একটি বাস্তব শিক্ষা। এ গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কৃচ্ছ্রসাধন কেবল অর্থের বিষয় নয়; এটি মানসিক প্রস্তুতিরও বিষয়।

প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ আকবর আলি খান তার লেখায় বারবার উল্লেখ করেছেন, আমাদের সমাজে ‘অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের সংস্কৃতি’ একটি বড় সমস্যা। তিনি দেখিয়েছেন, উন্নয়ন মানেই বড় বড় অবকাঠামো নয়; বরং সুশাসন, সঠিক পরিকল্পনা এবং ব্যয়ের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তার বিশ্লেষণে দেখা যায়, একটি দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে রাষ্ট্রকে যেমন অপচয় কমাতে হবে, তেমনি জনগণকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। তিনি উদাহরণ দিয়েছেন, যে পরিবার আয়ের তুলনায় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেই পরিবারই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল থাকে; একই নিয়ম রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দুর্যোগ, মহামারি ও যুদ্ধের সময় কৃচ্ছ্রসাধনের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনে ‘rationing system’ চালু হয়েছিল, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্য, জ্বালানি ও পোশাক পেত। ধনী-গরিব সবাই একই নিয়ম মেনে চলত। এটি ছিল এক অসাধারণ সামাজিক সংহতির নিদর্শন। জাপানে ভূমিকম্প বা সুনামির পর মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে সীমিত সম্পদ গ্রহণ করে, কেউ অতিরিক্ত নেয় না। এটি তাদের সামাজিক কৃচ্ছ্রতার প্রতিফলন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ইউরোপ ও এশিয়ার বহু দেশ অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমিয়ে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে এবং জনগণও জীবনযাত্রায় সংযম এনেছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে-কৃচ্ছ্রসাধন শুধু অর্থনৈতিক নীতি নয়, এটি একটি সামাজিক চুক্তি, যেখানে সবাই সম্মিলিতভাবে সংকট মোকাবিলা করে।

কৃচ্ছ্রসাধনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মানসিক প্রস্তুতি। যখন একটি জাতি বুঝতে পারে, সম্পদ সীমিত, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই সৃজনশীল হয়ে ওঠে। বিকল্প উপায় খোঁজে, অপচয় কমায় এবং নতুন নতুন উদ্ভাবনে মনোযোগ দেয়। এ মানসিকতা অর্থনীতিকে শুধু স্থিতিশীলই করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে আরও শক্তিশালী করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, অনেক উন্নত দেশ জ্বালানি সংকটের সময় নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকেছে, যা পরবর্তীকালে তাদের জন্য টেকসই সমাধান হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এছাড়া, কৃচ্ছ্রসাধন সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায়ও ভূমিকা রাখে। যখন রাষ্ট্র অপচয় কমিয়ে সঠিক খাতে ব্যয় করে, তখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব হয়। ফলে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীও উন্নয়নের সুফল পায়। কৃচ্ছ্রসাধন তাই শুধু অর্থ সাশ্রয়ের বিষয় নয়; এটি ন্যায়সংগত বণ্টন নিশ্চিত করার একটি কার্যকর পদ্ধতিও।

বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয়ের চাপ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন-এসবের প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও স্পষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে সাধারণ বাজার পর্যন্ত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির একটি চাপ লক্ষ করা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু সরকারের নীতিমালা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জনগণের মানসিক পরিবর্তন। অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমানো, দেশীয় পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো এবং সঞ্চয়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া-এসব অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

রাষ্ট্রকেও এ সময়ে কঠোর, কিন্তু বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প স্থগিত রাখা, প্রশাসনিক ব্যয় কমানো, দুর্নীতি দমন এবং উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। একইসঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে নতুন প্রজন্ম সংকটকে ভয় না পেয়ে তা মোকাবিলা করার মানসিকতা অর্জন করে। একটি দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজ গড়ে তুলতে পারলেই কৃচ্ছ্রসাধন কার্যকর হবে এবং দেশ সঠিক পথে এগিয়ে যাবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, অপচয় কমানো মানে জীবনযাত্রার মান কমানো নয়; বরং এটি একটি সচেতন ও টেকসই জীবনধারার দিকে অগ্রসর হওয়া। উদাহরণস্বরূপ, অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো, গণপরিবহণ ব্যবহারে উৎসাহিত হওয়া, দেশীয় পণ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ানো-এসব ছোট ছোট পদক্ষেপ সম্মিলিতভাবে একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। একইসঙ্গে এ নীতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। তারা শিখবে-কীভাবে সীমিত সম্পদের মধ্যেও উন্নয়নের পথ খুঁজে নেওয়া যায়, কীভাবে সংকটকে ভয় না পেয়ে তা মোকাবিলা করতে হয়। রাষ্ট্র যদি এ নীতিকে ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে এবং জনগণ যদি তা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে, তাহলে এটি দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও আত্মনির্ভরশীল করে তুলবে। এ প্রক্রিয়ায় আমাদের সবারই ভূমিকা রয়েছে-সরকার, প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ। কারণ একটি জাতির উন্নয়ন কেবল নীতিনির্ধারকদের হাতে নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে প্রত্যেক নাগরিকের সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের ওপর। তাই আজকের এ কৃচ্ছ্রসাধনের আহ্বানকে আমরা যদি একটি জাতীয় আন্দোলনে রূপান্তরিত করতে পারি, তাহলে তা শুধু বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে না, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলবে।

সংকট মানুষকে সংযম শেখায়, আর সংযম জাতিকে টিকিয়ে রাখে। কৃচ্ছ্রসাধন শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি একটি মানসিক ও নৈতিক শক্তি। সম্মিলিত সচেতনতাই পারে বাংলাদেশকে স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ পথে এগিয়ে নিতে।

ড. মো. রুহুল আমিন সরকার : অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি, ঢাকা

You may also like

Leave a Comment