Home স্বাস্থ্যহাম নিয়ে জানা-অজানা

হাম নিয়ে জানা-অজানা

Muktochinta Online
০ comments ১৪ views

হাম অন্যতম বিপজ্জনক একটি রোগ। মার্চের মধ্যভাগ থেকে বাংলাদেশে আশঙ্কাজনক হারে ছড়াতে শুরু করেছে এটি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার ৮০০-এরও বেশি রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ৯৪ জনেরও বেশি।

এর মধ্যে শিশুর সংখ্যাই বেশি। হামকে সাধারণ জ্বর বা চর্মরোগ বলে অবজ্ঞা করেন অনেকে, যা একেবারেই ভুল। সঠিক সময়ে হামের চিকিৎসা না করলে এটি শিশুর জীবন কেড়ে নিতে পারে।

হামের প্রাথমিক লক্ষণ

উচ্চমাত্রার জ্বর দিয়ে শুরু। এর সঙ্গে যোগ হয় কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং অনবরত নাক দিয়ে পানি পড়া। জ্বরের চার দিনের মাথায় কান বা গলার নিচের ত্বকে দেখা দেয় লালচে র‌্যাশ বা দানা। মুখমণ্ডলের গণ্ডী পেরিয়ে এটি দ্রুত সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

হাম কতটা ছোঁয়াচে? কেমন জটিলতা সৃষ্টি করে?

হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাল রোগ। এটি মূলত শ্বাসনালির মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে ভেঙে দেয়। এর ফলে পরবর্তী সময়ে নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া, কান পাকা, মুখে ঘা এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহও (এনসেফালাইটিস) হতে পারে। শরীরের ভিটামিন ‘এ’ কমে যাওয়ার ফলে চোখের শুষ্কতা থেকে শুরু করে অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে।

র‌্যাশ ও জ্বর হলেই কি হাম?

জ্বরের সঙ্গে র‌্যাশ দেখা দিলেই সেটি হাম নয়। জার্মান হাম (রুবেলা), ভাইরাল একজ্যান্থেম (ভাইরাসজনিত র‌্যাশ), ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়াতেও এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

যদি তিনটি উপসর্গ একত্রে দেখা দেয় [উচ্চমাত্রার জ্বর, চোখ লাল হওয়া এবং গলা বা কপালে র‌্যাশ], সে ক্ষেত্রে হাম হওয়ার আশঙ্কা বেশি। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া র‌্যাশ আক্রান্ত প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে আটজন হামে আক্রান্ত। বাকি দুজনের দেহে পাওয়া যাচ্ছে জার্মান হাম বা রুবেলা।

হামের পরীক্ষা

IgM অ্যান্টিবডি টেস্টের মাধ্যমে শরীরে সক্রিয় হামের সংক্রমণ আছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়। দেহে হামের উপসর্গ দেখা না দিলেও আরটি-পিসিআর (RT-PCR) টেস্টের মাধ্যমে নাক, গলা বা প্রস্রাবের নমুনা থেকে ভাইরাস শনাক্ত করা যায়।

ঝুঁকিতে কারা

♦ মায়ের বুকের দুধ না পাওয়া শিশু।

♦ হামের টিকা না নেওয়া পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

♦ অপুষ্টিতে ভুগছে যারা, বিশেষ করে ভিটামিন-এ এর অভাবে ভোগা শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

♦ গর্ভবতী নারী।

♦ দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অধিকারী শিশু।

♦ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী শিশুরা।

অভিভাবকদের করণীয়

♦ দেহে র‌্যাশ দেখা দেওয়ার দিন থেকে অন্তত পাঁচ দিন পর পর্যন্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা বা ‘আইসোলেশনে’ রাখুন।

♦ পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত তরল পান করান।

♦ জ্বর বা র‌্যাশ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

কখন হাসপাতালে নেওয়া জরুরি

নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে শিশুকে দ্রুত হাসপাতালে নিন—

♦ শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত শ্বাস নেওয়া।

♦ বারবার বমি বা মারাত্মক দুর্বলতা।

♦ খিঁচুনি বা নিস্তেজ হয়ে পড়া।

♦ চোখের মণি ঘোলাটে হওয়া বা দৃষ্টিতে সমস্যা।

♦ মুখে গভীর ঘা দেখা দেওয়া।

হামের চিকিৎসা

হামের কোনো সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। এর চিকিৎসায় লক্ষণ উপশম এবং জটিলতা প্রতিরোধের ওপর জোর দেওয়া হয়, যেমন—

♦ জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল,

♦ চুলকানি থাকলে অ্যান্টিহিস্টামিন,

♦ রোগীর বয়স অনুযায়ী সঠিক ডোজে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে পর পর দুই দিন।

♦ যদি শিশুর দৃষ্টিতে সমস্যা হয়, কিংবা চোখের মণি ঘোলা লাগে, তাহলে ১৪ দিনের মাথায় আরো একটি ভিটামিন-এ ক্যাপসুল (মোট ৩টি) দিতে হবে।

♦ চোখে বা কানে সংক্রমণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিফাঙ্গাল ড্রপ/ক্রিম ব্যবহার করতে হবে।

♦ নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মুখে বা হাসপাতালে ভর্তি হয়ে শিরাপথে অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

টিকা নেওয়ার পরও কি হাম হয়? 

এখনো অনেক শিশু হামের ‘এমআর’ টিকা পায়নি, আবার একটি মাত্র ডোজ নিয়েছে কেউ কেউ। ফলে টিকাবঞ্চিত এসব শিশুর আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। তারা হামে আক্রান্ত হলে অন্যদের মধ্যেও সেটি ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। অনেক সময় টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের শরীরে আশানুরূপ হাম প্রতিরোধক অ্যান্টিবডি তৈরি না হলে সেও হামে আক্রান্ত হতে পারে।

২০ এপ্রিল, ২০২৬ (সোমবার) থেকে বাংলাদেশে শুরু হচ্ছে হাম-রুবেলার (MR) টিকা ক্যাম্পেইন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই কর্মসূচির আওতায় ছয় মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী প্রায় দুই কোটির বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হবে। আগে টিকা নেওয়া থাকলেও শিশুকে এই ক্যাম্পেইনে অবশ্যই টিকা দিন।

গর্ভবতী নারী ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য পরামর্শ

আগে একবার হাম হয়ে থাকলে শরীরের তার অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে থাকে, সেটি আপনাকে আজীবন সুরক্ষা দেবে। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের কারো যদি আগে হাম না হয়ে থাকে, যদি টিকা না নিয়ে থাকেন বা টিকাদান সম্পর্কে নিশ্চিত না হন, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শে অন্তত একটি এমএমআর টিকা নেওয়া উচিত। বিশেষ করে যাঁদের সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা রয়েছে বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভ্রমণ করবেন, তাঁদের অবশ্যই বুস্টার ডোজ বা কমপক্ষে একটি ডোজ এমএমআর টিকা গ্রহণ করা প্রয়োজন। গর্ভাবস্থায় হামের টিকা নেওয়া সাধারণত নিষিদ্ধ, কারণ এটি ভ্রূণের ক্ষতি করতে পারে। হামের টিকা একটি ‘লাইভ ভ্যাকসিন’, তাই টিকা নেওয়ার আগে নিজের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি চিকিৎসককে জানানো জরুরি।

হামের টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

হামের টিকা (MR/MMR) নেওয়ার পর কিছু হালকা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। এর মধ্যে আছে—

♦ হালকা জ্বর

♦ ইনজেকশনের জায়গায় ব্যথা বা লালচে হওয়া

♦ হালকা র‌্যাশ (ফুসকুড়ি)

♦ সামান্য দুর্বলতা বা অস্বস্তি।

এগুলো সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে সেরে যায়। গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঘটনা বিরল। তাই টিকা নিয়ে অযথা ভয় পাওয়ার কারণ নেই।

লেখক : এমডি (পেডিয়াট্রিক্স), ডিসিএইচ (শিশু স্বাস্থ্য)

সহকারী অধ্যাপক, শিশু বিভাগ

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ

You may also like

Leave a Comment