একেএম শামসুদ্দিন
সম্প্রতি টেকনাফ সফরকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মানব পাচার ও মাদক নির্মূলে অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন। দিনটি ছিল বাংলা বছরের প্রথম দিন। ১৪ এপ্রিল টেকনাফের এজহার বালিকা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে কৃষক কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দানকালে তিনি এ অভিযানের কথা বলেন। এর আগে অনুষ্ঠানের শুরুতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বক্তব্য দেওয়ার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাদক আমাদের দেশে ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। মাদকসেবন এমন হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, দেশের যুবসমাজকে মারাত্মকভাবে বিপথগামী করে তুলছে। অবৈধ পথে মানব পাচারও বেড়েছে। কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়া উপকূলসহ দেশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় মানব পাচার ও মাদক নির্মূলে শিগ্গিরই অভিযান চালানো হবে। এ ব্যাপারে সরকার কঠিন অবস্থান নিয়েছে। তিনি মানব পাচার বন্ধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। টেকনাফ, উখিয়া ও কক্সবাজারের কিছু এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব এলাকা দিয়ে মানব পাচার রোধে কর্তব্যরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। যেসব পয়েন্ট ব্যবহার করে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়, সেগুলো চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে অভিযান পরিচালনা হবে। মানব পাচার বন্ধে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও তিনি ঘোষণা দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মুখে মানব পাচার ও মাদক নির্মূলে অভিযানের কথা শুনে কয়েক বছর আগের আরও একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা মনে পড়ে গেল। তিনি হলেন শেখ হাসিনার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। আসাদুজ্জামান খান কামালও একই সুরে মানব ও মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর ঘোষণা দিয়েছিলেন। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে টেকনাফ পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে শতাধিক ইয়াবা পাচারকারীর আত্মসমর্পণের এক অনুষ্ঠানে অনুরূপ ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেসময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত কক্সবাজারের ১ হাজার ১৫১ জন ইয়াবা পাচারকারীর মধ্যে ১০২ জন আত্মসমর্পণ করেছিল। সেসময় সরকারি ওই তালিকার ইয়াবা পাচারের শীর্ষ গডফাদার হিসাবে চিহ্নিত ৭৩ জনের মধ্যে ৩০ জন আত্মসমর্পণ করেছিল। ঘটা করে আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠান করার পর কথিত অপরাধের মাত্রা কিছুটা স্তিমিত হলেও বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। এরপর ২০২০ সালের জুলাই পর্যন্ত কক্সবাজার-টেকনাফে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে যা হয়েছে, তা বর্ণনাতীত। পরবর্তীকালে মানব পাচার ও মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নিয়ে সংসদে এক প্রশ্নোত্তরপর্বে আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছিলেন, মাদক পাচার প্রতিরোধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অধীন টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলার সমন্বয়ে ‘টেকনাফ বিশেষ জোন’ স্থাপন করা হয়েছে। ক্রাইম ডেটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিডিএমএস) সফটওয়্যারের মাধ্যমে মানব পাচারকারীদের তথ্যভান্ডার সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সীমান্তে মাদকদ্রব্যের চোরাচালান প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানিয়েছিলেন, বিজিবি, কোস্ট গার্ডসহ সব সংস্থার সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মানব পাচার ও মাদকের মতো গুরুতর ও সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধ ও দমনে তার সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। চোরাচালানের অন্যতম রুট টেকনাফে মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য একজন যোগ্য পুলিশ অফিসারও খোঁজা হয়েছিল। কর্মদক্ষতা বিবেচনায় পুলিশ পরিদর্শক প্রদীপ কুমার দাশকেই আওয়ামী লীগ সরকার বেছে নিয়েছিল সেসময়।
কথিত আছে, প্রদীপ কুমার দাশ ১ কোটি টাকার বিনিময়ে টেকনাফ থানার ওসি হিসাবে বদলি আদেশ বাগিয়ে নিয়েছিলেন। রোহিঙ্গা শরণার্থী, মাদক, মানব পাচারসহ জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা টেকনাফ। এ এলাকা দিয়ে হাজার কোটি টাকার অবৈধ দ্রব্যাদি পাচার হয়ে থাকে। স্বর্ণ চোরাচালানের আন্তর্জাতিক রুটও হলো এ টেকনাফ। থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারতে পাচার হয় এসব স্বর্ণ। এ এলাকায় রোহিঙ্গা পুনর্বাসন ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বেশি সময় ব্যয় এবং ইয়াবাসহ মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করায় স্বর্ণ পাচারকারী সিন্ডিকেট দিব্বি আরামে পাচার কাজ চালিয়ে গেছে। তবে এ অবৈধ পাচার ওই এলাকায় দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃষ্টি এড়িয়ে হয়েছে, এ কথা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে চোরাচালানকারীরা এ ব্যবসা চালিয়ে গেছেন। উল্লিখিত অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে ভাগবাঁটোয়ারা হয় বলে কথিত আছে। এ কারণে টেকনাফ থানার ওসি পদে কে বদলি হবেন-না-হবেন, সে সিদ্ধান্ত সর্বোচ্চ মহল থেকেই হয়ে থাকে। ওসি প্রদীপের বেলায়ও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
টেকনাফ থানার ওসি হওয়ার যোগ্যতা পরীক্ষা প্রদীপ আগেই দিয়েছিলেন। টেকনাফ সীমান্ত প্রধান রুট হলেও ৮০ শতাংশ মাদক আসে সাগরপথে। এসব মাদক আবার সাগরপথেই মহেশখালী, বাঁশখালী, কুতুবদিয়া, আনোয়ারা ও কুয়াকাটা দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। প্রদীপ টেকনাফ থানায় বদলি হয়ে আসার আগে মহেশখালী থানার ওসি ছিলেন। সেখানে দায়িত্বে থাকাকালীন মাদক পাচারকারীদের সঙ্গে প্রদীপের সখ্য গড়ে ওঠে। আবার যেসব পাচারকারীর সঙ্গে প্রদীপের বনিবনা হতো না, তাদের ক্রসফায়ারের ফাঁদে ফেলে হত্যা করার রেকর্ডও আছে তার। ক্রসফায়ারের এ দক্ষতাকেই যোগ্যতার মাপকাঠি ধরেই (প্রচার করে) প্রদীপকে টেকনাফ থানায় বদলি করা হয় বলে জানা যায়। টেকনাফ থানার ওসি থাকাকালীন প্রদীপ কীভাবে নরঘাতকে পরিণত হয়েছিলেন, সে কাহিনি সবারই জানা আছে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তার পরিসমাপ্তি ঘটে।
টেকনাফ সীমান্তে ইয়াবা পাচার প্রসঙ্গ আলোচনা হলে মাদকের গডফাদার হিসাবে পরিচিত আবদুর রহমান বদির নাম উচ্চারিত হবে না, তা হয় না। তিনি ইয়াবা বদি নামেও পরিচিত। তার অবশ্য আরও একটি পরিচয় আছে। তিনি আওয়ামী লীগের টিকিটে ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ-সদস্যও ছিলেন। কথিত আছে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল-উভয়েই আবদুর রহমান বদির আশ্রয়দাতা ছিলেন। শেখ হাসিনার শাসনামলে মাদক পাচারে বদির সংশ্লিষ্টতার হাতেনাতে প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পুলিশ তাকে আইনের আওতায় আনাতে সাহস করেনি। শুধু বদি নন, তার ভাইয়েরাও এ কারবারে জড়িত ছিলেন। মাদক কারবার করে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তিনি তার আশ্রয়দাতাদের মাসিক মাসোহারা দিয়ে তাদের আনুকূল্যও কুড়িয়েছেন। সরকারের উঁচু মহলে তার এমন গ্রহণযোগ্যতার কারণে প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাকে ঘাঁটাতে চাইতেন না। বদি পরিবারের এমনই গ্রহণযোগ্যতা ছিল, পরবর্তী দুটি সংসদ নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন না পেলেও আওয়ামী লীগ তার স্ত্রীকে মনোনয়ন দিয়ে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত করেছিল। ক্ষমতাসীন দলের আশ্রয়ে থেকে বদি ও তার পরিবারের দুর্বৃত্তায়নের অনেক কাহিনিই দেশবাসীর জানা আছে।
বাংলাদেশে মাদক পাচার এমনই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে; যা শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। মাদকের এ মরণনেশা যুবসমাজকে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে যাচ্ছে। ফলে এর প্রভাব পড়ছে পরিবার, সমাজ এবং দেশের অর্থনীতিতে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ইয়াবা বদিকে আটক করা হলে মাদক পাচার কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়লেও ধীরে ধীরে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থেকে উখিয়া বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকায় বৃদ্ধি পেয়েছে। মিয়ানমার থেকে ওই অঞ্চলের অন্তত ৩২টি পয়েন্ট দিয়ে বর্তমানে নিয়মিতভাবে ইয়াবা, আইস, হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদক দেশে প্রবেশ করছে। মাদক পাচারের পেছনে নতুন করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যেখানে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও ক্ষমতার বিভিন্ন স্তরের লোকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা হলেও মাদকের প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। এমনই এক পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মানব পাচার ও মাদক নির্মূলে অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন।
বাংলাদেশে মানব পাচার ও মাদক অনুপ্রবেশ অনেক আগে থেকেই হয়ে আসছে। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, তারা সবাই এ পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেন। কিছুদিন তাদের সে প্রচেষ্টা হয়তো অব্যাহত থাকে। তারপর কোথায় যেন সব হারিয়ে যায়! এখন চারদিকে অনুকরণের যে অনুশীলন চলছে, তাতে এ দেশের জনগণের আস্থার জায়গা তৈরি হবে কীভাবে! সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ঘোষণায় জনগণ রোমাঞ্চিত হয়েছে বলে মনে হয় না। শেখ হাসিনার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও অনুরূপ ঘোষণা দিয়েছিলেন। তারপরও তারা এদেশের জনগণকে আবদুর রহমান বদির মতো মাদক গডফাদার উপহার দিয়েছেন। প্রদীপের মতো নরঘাতকের জন্মও হয়েছিল তাদের হাত ধরেই। সরকারের ঘোষণায় জনগণ আস্থা রাখবে তখনই, যখন বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখবে। এদেশের জনগণ ক্ষমতাধরদের জন্য বদির মতো নতুন কোনো ‘ক্যাশ কাউ’ দেখতে চায় না। দ্বিতীয় কোনো ওসি প্রদীপের জন্ম হোক, বাংলাদেশের মানুষ তাও প্রত্যাশা করে না।
একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, কলাম লেখক